আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে চ্যালেঞ্জ করে ফিরেছে ইয়াবা গডফাদার : সাংবাদিকদের হত্যা ও মামলা হুমকি

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে চ্যালেঞ্জ করে ফিরেছে ইয়াবা গডফাদার : সাংবাদিকদের হত্যা ও মামলা হুমকি
কক্সবাজার প্রতিনিধি ॥ নেশার ভয়ানক ছোবল ক্রেজি ড্রাগ হিসেবে পরিচিত ছোট্ট আকারের এই ইয়াবা বড়ি ব্যবসায় কক্সবাজারের ১১৫১ জন জড়িত। এদের মধ্যে ৬০ জন গডফাদার। ২০১৮ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত ইয়াবাসহ মাদকের গডফাদার ও ব্যবসায়ীদের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়। দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী ৪টি সংস্থা মাদক পাচার ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের তালিকা আপডেটের কাজ করে।
এই তালিকাটি প্রকাশ করা হয় দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় গত ১১ মে ২০১১৮, পরের দিন পরিবর্তন ডটকম, নিউজ কক্সবাজার ডটকম সহ বিভিন্ন অনলাইন পোটাল ও স্থানীয় এবং জাতীয় দৈনিক পত্রিকাগুলোতে ধারাবাহিক ভাবে ইয়াবা ব্যবসায়িদের নিয়ে সংবাদ প্রকাশ পায়। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকা ও অনলাইনে ইয়াবা ব্যবসায়িদের নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হয়। সরকার মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। শ্লোগান হয়ে উঠে এসো যাই যুদ্ধে, মাদকের বিরুদ্ধে।
এ্রই মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কক্সবাজার সহ সারাদেশে অভিযান শুরু হয়। ধরপাকড় ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে বন্দুক যুদ্ধে মারা যান বেশ কিছু ইয়াবা ব্যবসায়ি। গ্রেফতারও করা হয় অনেককে। ইয়াবা ব্যবসায়ি অনেকে গ্রেফতার এড়াতে আত্মগোপনে চলে যায়, কেউ আবার কারাগারে আবার অনেক দেশও ছাড়েন। টেকনাফের পৌর কাউন্সিলর একরাম মারা যাওয়ার পর তার হত্যার ঘটনার ইস্যুতে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান শিথিল হয়ে পড়ে। আস্তে আস্তে ইয়াবা ব্যবসায়ি ও গডফাদারদের বেশির ভাগই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে অনেকটা চ্যালেঞ্জ করে এলাকায় ফিরে শুরু করেন সেই পুরনো ইয়াবা ব্যবসা। অনেকে প্রকাশ্যে ঘুরা ফেরা করেেছ।
দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত সংবাদের সুত্র ধরেই নিউজ কক্সবাজার ডটকম সহ বিভিন্ন দৈনিক ও অনলাইনে ফলাও ভাবে এই ইয়াবা কারবারীদের নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হয়। গত মে মাস থেকে অনেকটা আত্মগোপরে থাকা টেকনাফ উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মৌলভী রফিক উদ্দিন এলাকায় ফিরেই এসেই সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে চরম নাখোশ ও ক্ষদ্ধ হয়ে যান। অভিযান চলাকালে তিনি দেশে আত্মগোপন করেন এবং পরে ওমরাহের নামে বিদেশে পালিয়ে যান বলে অভিযোগ। গত কয়েকদিন আগে গোপনে এলাকায় ফিরে আসেন। প্রকাশে হুঙকার ছাড়েন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে।
এলাকায় ফিরে এসেই আইনশ্ঙ্খৃলা বাহিনীর ব্যাপরে বিষুদগার ও দৈনিক ইত্তেফাকের সিনিয়র সাংবাদিক আবুল খায়ের সহ বেশ কিছু সাংবাদিকদের দেখে নেওয়ার হুমকি এবং হুংকার ছাড়েন। এমন কি অনলাইন নিউজ পোর্টাল কক্সবাজার নিউজ ডটকম এর সাংবাদিক শাহজাহান চৌধুরী শাহীনকে হত্যার হুমকি ছাড়াও ইয়াবা গডফাদার, জঙ্গীর মদদদাতা, রোহিঙ্গা আরএসওদের পৃষ্টপোষকতাকারী,মানবপাচারকারী, মানিলন্ডারিং এ জড়িত ও বিভিন্ন অপরাধে সংশ্লিষ্ট মৌলভী রফিক উদ্দিন তার ফেসবুক ফেইজে অশালিন, মানহানিকর ভাষায় স্ট্যাটাস দিয়ে মামলার হুমকি দিয়েছে। তার সিন্ডিকেটের কিছু ইয়াবা ব্যবসায়ি চক্র প্রতিনিয়ত হুমকি অব্যাহত রেখেছে। এমনকি ইয়াবা ব্যবসায়িদের গডফাদার রফিক উদ্দিন ওই স্ট্যাটাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পর্যন্ত বিষুধগার করার দু:সাহসিকতা দেখিয়েছেন। এই ইয়াবা গডফাদার রফিক উদ্দিন এর ক্ষমতা পেল কোথায়, এটা জনগণের প্রশ্ন।
গত ১১ মে জাতীয় দৈনিক ইত্তেফাকে ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত ১১৫১ জন এবং ৬০ জন গডফাদারের তালিকা চুড়ান্ত ভাবে প্রকাশ করা হয়। দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী ৪টি সংস্থা মাদক পাচার ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের তালিকা আপডেটের কাজ করে।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রতি মাসে মাদকের ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, পুলিশ সদস্য দপ্তর ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সুস্পষ্টভাবে বলেন, কক্সবাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে সারাদেশের ইয়াবার আগ্রাসন নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।
জানা গেছে, ইয়াবার ৬০ জন গডফাদার আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করেন এবং ইয়াবা পাচারের রুটগুলো সুরক্ষিত রাখতে ভূমিকা রাখছেন। সব জায়গায় তাদের প্রভাব রয়েছে। কেউ গ্রেফতার হলে তার জামিনও তারা পাইয়ে দেন। এই গডফাদারের মাধ্যমেই দেশে আসে ইয়াবা। এই গডফাদারের মাধ্যমে কোটি কোটি ডলারের মাধ্যমে পেমেন্ট মিয়ানমারে পাঠানো হয়। গডফাদারের তালিকায় ওয়ার্ড থেকে সংসদ সদস্য পর্যন্ত জনপ্রতিনিধি আছেন। তবে নতুন তালিকায় একজন আলোচিত গডফাদারের নাম বাদ পড়েছে। তার পুরো পরিবার ব্যবসায় জড়িত। কক্সবাজার থেকে নৌপথে দক্ষিণাঞ্চলে পিরোজপুর, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, ঢাকা, খুলনার মংলা বন্দর, নোয়াখালী যায় ইয়াবা। এছাড়া স্থল পথেও ইয়াবা দেশের বিভিন্ন যাচ্ছে পৌঁছে যায়।
প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, কক্সবাজারে মোট ৮টি থানার মধ্যে টেকনাফে ৯১২ জন ইয়াবা ব্যবসায়ী আছেন। এছাড়া কক্সবাজার সদর থানায় ৪৩ জন, রামুতে ৩৪ জন, কুতুবদিয়ায় ৪৮ জন, উখিয়ায় ৭ জন, মহেশখালীতে ৩০ জন এবং পেকুয়ায় ২২ জন ইয়াবা ব্যবসায়ী রয়েছেন। মূলত টেকনাফে পরিবারকেন্দ্রিকভাবে ইয়াবা ব্যবসা চলছে। মা-বাবা, স্ত্রীসহ অনেক পরিবারের প্রায় সবাই ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত। প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, এদিকে মাদক ব্যবসায় জড়িত অধিকাংশের নামে ১০/১৫টি মামলা রয়েছে। কিন্তু ৬৫ ভাগ আসামি জামিনে থেকে দেদারসে ইয়াবা ব্যবসা করে যাচ্ছেন। বাকিদের মধ্যে কেউ পলাতক আবার কেউ গ্রেফতার হননি। উল্লেখযোগ্য ব্যবসায়ীদের মধ্যে রয়েছেন টেকনাফ উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আহমেদ, ভাইস চেয়ারম্যান মাওলানা রফিক উদ্দিন ও তার ভাই বাহারছড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাওলানা আজিজ উদ্দিন, টেকনাফ সদর ইউপি চেয়ারম্যান শাহজাহান মিয়া প্রমুখ। এদের মধ্যে মাওলানা আজিজ উদ্দিন ও তার ভাই রফিক উদ্দিন এবং শাহজাহান মিয়া নৌপথ নিয়ন্ত্রণ করেন। বড় চালান আসে সাগর পথে।
দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সরকার প্রধান থেকে শুরু করে দেশের সব আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ইয়াবা প্রতিরোধে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করলেও অধিকাংশ গডফাদার ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় দিন দিন ইয়াবা সরবরাহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। কক্সবাজারের কোথাও না কোথাও প্রতিদিন ইয়াবার বড় বড় চালান ধরা পড়ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিজিবি এসব চালানের সাথে যাদের গ্রেফতার করছে তারা বহনকারী। কিন্তু নেপথ্যেই থেকে যাচ্ছে ইয়াবা নামক মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত এই গডফাদাররা। এসব গডফাদাররা দীর্ঘদিন ধরে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, বরাবরই গডফাদাররা রক্ষা পাওয়ায় দেশে ইয়াবা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহীনি কিংবা মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক শ্রেণীর কর্মকর্তা কক্সবাজার জেলায় ইয়াবা পাচারকারীদের সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া যায়। ব্যবসায়ী জড়িত কর্মকর্তাদের মোটা অঙ্কের উৎকোচ দিয়ে থাকে। অপরদিকে চট্টগ্রাম রেঞ্জ কিংবা কক্সবাজার জেলা প্রশাসন ও থানাসমূহে বদলি হয়ে আসতে অধিকাংশ কর্মকর্তাকে মোটা অঙ্কের উৎকোচ দিতে হয়। এই সকল প্রশাসনের সঙ্গে ৬০ গডফাদারদের সখ্যতা রয়েছে। ওই সব প্রশাসন কিংবা থানায় এক বছর চাকরি করলে তার দুই পুরুষের আর অর্থের প্রয়োজন হয় না। এমন বক্তব্য বিভিন্ন কর্মকর্তাদের মুখে শোনা যায়। শহর কিংবা গ্রাম দেশের এমন কোন জায়গা নেই যেখানে ইয়াবা পাওয়া যায় না। ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত গডফাদাররা ধরা না পড়ায় এর বিস্তার রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে একাধিকবার ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত গডফাদারের নতুন নতুন তালিকা তৈরি করা হলেও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয় অপারেশন কার্যক্রম নেই। এরই মধ্যে কক্সবাজারে ইয়াবা ব্যবসায়ের সঙ্গে যুক্ত ৬০ জন গডফাদারের তালিকা রয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় র‌্যাব, পুলিশ, মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর, কোস্টগার্ড, বিজিবি ও গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়ে ইয়াবা গডফাদারের তালিকা তৈরি করা হয়।
সাংবাদিকদের হুমকি দেয়ায় এই ইয়াবা গডফাদার মৌলভী রফিক উদ্দিনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছেন বলে জানান, সাংবাদিক শাহজাহান চৌধুরী শাহীন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*