কপিলমুনি বায়তুচ্ছালাম জামে মসজিদ : স্বেচ্ছাশ্রমে এগিয়ে চলেছে নির্মাণ কাজ

কপিলমুনি বায়তুচ্ছালাম জামে মসজিদ : স্বেচ্ছাশ্রমে এগিয়ে চলেছে নির্মাণ কাজ
ইমদাদুল হক মিলন, পাইকগাছা (খুলনা) ॥ “আস্সালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল¬াহ”ফজরের নামায শেষে ইমাম সাহেব সালাম ফিরালেও বাড়ি ফেরার ব্যস্ততা ছিল না খুলনার পাইকগাছার কপিলমুনি বায়তুচ্ছালাম জামে মসজিদের মুসল্লিদের। মসজিদ থেকে বেরিয়ে যুবক কিংবা বৃদ্ধ সব বয়সীরা ঝুড়ি-কোদাল হাতে এগিয়ে যাচ্ছেন কপোতাক্ষ তীরবর্তী বাইপাস সড়কের দিকে। দৃষ্টিনন্দন মসজিদের নির্মাণ কাজের শুরু যেখানে। তখনও নির্মাণ কাজের মূল শ্রমিকদের কর্মস্থলে আসতে কয়েক ঘন্টা বাকি। ততক্ষণে কাজ শুরু করেছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার কিছু অপেশাদার শ্রমিক। যেখানে বয়স কিংবা মর্যাদার কোন ভেদাভেদ নেই। এক আল্লাহর সন্তুষ্টি আর দৃষ্টিনন্দন মসজিদ নির্মাণের স্বপ্ন লালন করে তারা মিলেছেন এক কাতারে। এটা মসজিদের মাটি ভরাট কাজের চিত্র। প্রত্যেকের অগোছালো কাজের মাঝেও রয়েছে আত্মতৃপ্তির ঢেকুর। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বিনির্মাণে মুসল¬ীদের ঐক্যবদ্ধ স্বেচ্ছাশ্রমের দৃষ্টিনন্দন চিত্র ক্ষণিকের জন্য হলেও থমকে যায় প্রাতঃকালীণ পথচারীদের পথচলা। কেননা,শুধু নামাজ নয়,নামাজের ঘরের জন্য আজ ওরা ঝুড়ি-কোদাল হাতে কাজ করছেন। জনপ্রতিনিধি, ডাক্তার, শিক্ষক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষরা রয়েছেন সেখানে। আলেম ওলামা আর হাজী সাহেবরা তাদেরকে এ কাজে যুগিয়েছেন অসীম প্রেরণা। ব্যয় বহুল অসাধ্য সাধনে অনুপ্রেরণায় আত্মবিশ্বাসই যেন আজ ওদের মূল পুঁজি।
১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দ। হযরত পীর জাফর আউলিয়ার স্মৃতিঘেরা কপিলমুনি। ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্মৃতি ঘেরা কপোতাক্ষের তীরবর্তী প্রাচীন জনপদ কপিলমুনি তখনো সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বসবাস। মুসলিম সস্প্রদায়ের হাতে গোনা বসতি ছিল,তাও আবার দক্ষিণ জনপদের বানিজ্যিক কেন্দ্র হওয়ার সুবাদে। সঙ্গত কারণে প্রাচীন জনপদের বানিজ্যিক সদর থেকে তখনো মোয়াজ্জিনের মধুর কন্ঠে ভেসে আসে না আজানের ধ্বনি। বাণিজ্যিক প্রয়োজনে দূর-দূরন্ত থেকে আসা মুসলমানদের নামাজ আদায় করতে হতো তাদেরই পানসী নৌকাতে। খর¯্রােতা কপোতাক্ষে নোঙর ফেলেছে সারি সারি পানসী নৌকা। সূর্যের হেলে পড়া দিক বিবেচনায় পানসী নৌকাতে নামাজে দাঁড়িয়েছেন গুটি কয়েক হাঁটুওে (ব্যবসায়ী)। তড়িঘড়ি ওজুটা সেরে জামাতে শরিক হতে জনপদের নিকটবর্তী দু’একজন বাসিন্দার ব্যস্ততাও ছিল চোখে মেলা ভার। তাদেরই একজন আলহাজ্ব মোঃ এরফান আলী মোড়ল (৯২)। প্রতে্যুষে প্রাণের টানে তিনিও এসেছিলেন কপিলমুনি বায়তুচ্ছালাম জামে মসজিদের পূননির্মাণে স্বেচ্ছাশ্রমে মুসলি¬¬দের উৎসাহ দিতে। বয়সের ভারে ন্যুজ সাদা মনের মানুষটি নিজের অজান্তেই নাম লেখান শ্রমিকদের কাতারে। আর এতেই সংশি¬ষ্টদের আতœবিশ্বাস এখন তুঙ্গে।
সমাজসেবী বয়োবৃদ্ধ আলহাজ্ব মোঃ এরফান আলী মোড়ল জানান,সেদিন মাত্র ১ টাকা সেলামী দিয়ে আধুনিক কপিলমুনির প্রতিষ্ঠাতা রায় সাহেব বিনোদ বিহারী সাধুর ছেলে গোষ্ঠ বিহারী সাধুর নিকট থেকে কপোতাক্ষ পাড়ে জমি ক্রয় করে সেদিন এখানে মসজিদ নির্মানের স্বপ্ন দেখেছিলেন, আলহাজ্ব মৃত কাদের বক্স মুন্সী ও গাজী হারান উল¬াহরা (হারান গাজী)। বাঁশের খুঁটি,হোগলা পাতার বেড়া আর গোলপাতার ছাউনী দিয়ে তৈরি হয় জনপদের ব্যবসায়ী মোকামের প্রথম মসজিদ। প্রতিষ্ঠার পর সেদিন প্রথম জুমার নামাজের ইমামতি করেছিলেন,মুন্সী জসিম উদ্দিন। নগর শ্রীরামপুরের কপিল উদ্দিন সরদারের পর মাত্র আট টাকা বেতনে গোলাবাটির জহর আলী বিশ্বাস ‘আস্সালাতু খয়রুম মিনান নাউম’ ধ্বণিতে ঘুম ভাঙাতো জনপদেও ধর্মপ্রাণ মুসল¬ীদের। পর্যায়ক্রমে কলেবর বৃদ্ধিতে সামিল ছিলেন আলহাজ্ব মোঃ এরফান আলী মোড়ল,পরশউল¬াহ মোড়ল,শেখ আবুল হোসেন ও শেখ আবু তালেব। পরবর্তীতে মসজিদ আধুনিকায়নে এগিয়ে আসেন শেখ আমজাদুর রহমান,আলহাজ্ব মোকছেদ আলী সরদার,আলহাজ্ব নেছার আলী গাজী,আলহাজ্ব ওয়াজেদ আলী হাজরাসহ এলাকার অনেকেই,এমনটি জানান সমাজ সেবক আলহাজ্জ্ব এরফান আলী মোড়ল।
মসজিদ কমিটির বর্তমান কোষাধ্যক্ষ শেখ আঃ ওয়াহিদ ও এইচ এম শফিউল ইসলাম জানান,নির্মাণাধীন মসজিদটি ৫ তলা বিশিষ্ট হবে। সম্পূর্ণ নির্মাণ কাজ শেষ হলে মসজিদে একসাথে দেড় হাজারের অধিক মুসলি¬¬ নামাজ আদায় করতে পারবেন। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত,স্টেইনলেস স্টিল,মার্কারী গ¬াস,আধুনিক টাইলস দ্বারা মসজিদটি হবে আকর্ষণীয় ও দৃষ্টিনন্দন। কাজ শেষ করতে আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪ কোটি টাকা। মসজিদ কমিটির এক উপদেষ্টা জানান,সকলের সহযোগিতায় দূর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে নির্মাণ কাজ। নির্মাণ কাজ শেষ করতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন। সে জন্য তিনি সকলের সহযোগীতা কামনা করেছেন। নির্মাণ কাজের অনুদান পাঠানোর ঠিকানা,কপিলমুনি বায়তুচ্ছালাম জামে মসজিদ,হিসাব নম্বর- ০২০৮১২২০০০০১১১১,ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড,কপিলমুনি শাখা,কপিলমুনি,খুলনা।
ইতিহাস আর ঐতিহ্যের ধারক কপিলমুনি জনপদের প্রাচীণ ও কেন্দ্রীয় মসজিদের নির্মাণ কাজে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের শরীক হওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন মসজিদ কমিটিসহ এলাকার ধর্মপ্রাণ মানুষ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*