চট্টগ্রামের ইতিহাসে স্মরণীয় মণীষি স্বাধীনতা সংগ্রামী মুহাম্মদ আশরাফ খান

চট্টগ্রামের ইতিহাসে স্মরণীয় মণীষি স্বাধীনতা সংগ্রামী মুহাম্মদ আশরাফ খান
সোহেল মুহাম্মদ ফখরুদ-দীন

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশ্বস্ত সহচর, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, ষাটের দশকের সকল ছাত্র-গণ আন্দোলনের অন্যতম নেতা, চট্টগ্রাম কলেজের প্রাক্তন জিএস, চট্টগ্রাম সিটি কলেজের সাবেক ভিপি, চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামীলীগের সাবেক প্রচার সম্পাদক, ১৯৭১ সালে ২৫মার্চ দিবাগত মধ্যরাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে চট্টগ্রাম নগরে মাইকযোগে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারকারী, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির সাবেক চেয়ারম্যান ও মহাসচিব, চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্রের প্রাক্তন সভাপতি, বর্ষীয়ান জননেতা মুহাম্মদ আশরাফ খান গত ৩ জুন ২০১৮ রবিবার ভোর ৫টায় চট্টগ্রাম নগরীর পাঠানটুলীস্থ খান বাড়ীতে হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে ইন্তেকাল করেছেন। তাঁর মৃত্যুর মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি শুদ্ধপথের রাজনীতিবিদের মহাপ্রয়াণ ঘটল। চট্টগ্রামের ইতিহাসে এই মানুষটি একটি নিজেই ইতিহাস ছিলেন। শুদ্ধ ও সৎ ভাবে জীবন যাপন করতেন। ৬০ দশক থেকে আমৃত্যু দেশ, জাতি ও মানুষের জন্য কাজ করেছেন। এই মহা মানুষের ইন্তেকালে আমরা গভীর ভাবে শোকাহত। ব্যক্তিগত ভাবে ১৯৯৪ সাল থেকে মুহাম্মদ আশরাফ খানের সাথে আমার সম্পর্ক। চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্র, চট্টগ্রাম প্রতœতত্ত্ব আলোকচিত্র মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠায় মুহাম্মদ আশরাফ খান আমাকে সার্বিক সহযোগিতা করেছেন। ইতিহাসের প্রয়োজনে তাঁর এই ঋণ শোধের নয়। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ সমিতির প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মহাসচিব ও সভাপতি মুহাম্মদ আশরাফ খান চট্টগ্রাম নগরীর পাঠানটুলীর ইতিহাস খ্যাত সম্ভান্ত পাঠান বংশে ১৯৪২ ইং সালের ১৯ জানুয়ারী জন্মগ্রহণ করেন। উল্লেখ্য যে, এই পাঠান বংশ হতেই পাঠানটুলী এলাকার নাম করণ করা হয়েছে। ঐতিহাসিকদের মতে প্রাচীন চট্টগ্রামে মগরাজত্বের সময় মুসলমানগণের চট্টগ্রাম বিজয়কালে যে সকল পাঠান বাহিনী এই দেশে আগমন করেন তাঁদের অনেকে এই অঞ্চলে স্থায়ী আবাস স্থাপনে বসবাস করিতে থাকেন তদনুসারে ইহার নাম হয় পাঠানটুলী। তাঁহার পিতা মরহুম আমানত খান (বি.এল) ১৮৯৯ সালের ২৬ জুন জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯১৪ সনে কলিকাতাস্থ স্কটিশ চার্চ কলেজ হইতে বি.এ এবং পরবর্তী কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হইতে বি.এল (বর্তমানে এল.এল.বি) পাশ করেন। নিজ এলাকার জনগণের শিক্ষার সুবিদার্থে তিনি তাঁহার পাঠান পরিবারের অন্যান্যদের সহযোগিতায় ১৯১৪ সনে নিজ গ্রামে পাঠানটুলী খান সাহেব বালক বিদ্যালয় ও পাঠানটুলী খান সাহেব বালিকা বিদ্যালয়, পাঠানটুলী পোষ্ট অফিস ইত্যাদি জনহিতকর প্রতিষ্ঠানসমূহ প্রতিষ্ঠা করেন। আমানত খান ১৯২৪ইং হইতে ১৯২৮ ইং সন পর্যন্ত অবিভক্ত বাংলার বঙ্গীয় আইন পরিষদের নির্বাচিত সদস্য ছিলেন। আমানত খান ১৯২২ সালে কলিকাতাস্থ প্রবাসী চট্টগ্রাম সমিতির সভাপতি ছিলেন।
মুহাম্মদ আশরাফ খান- জেনারেল ক্যাপ্টেন- (১৯৫৮-৫৯ ইং) চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল ছাত্র- সংসদ, স্কাউট ট্রুপলিডার- (১৯৫৭-৫৮ ইং) চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল স্কাউট ট্রুপ, ১৯৫৭ সালে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইসলাইল ইব্রাহিম চূন্দ্রি গড় সাহেবের চট্টগ্রাম আগমন উপলক্ষে লাল দিঘী ময়দানে আয়োজিত জনসভায় একমাত্র স্থানীয় বক্তা (মুসলিম ছাত্রলীগের সংগঠক হিসাবে) প্রাজ্ঞল ভাষায় বক্তৃতা করিয়া উপস্থিত জনতার বিপুল সমর্থন লাভ করেন, ১৯৫৮ সালে পাকিস্তান ২য় স্কাউট জাম্বুরীতে কলেজিয়েট স্কুল স্কাউট বাহিনীর অধিনায়ক, ১৯৫৬ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক দেশব্যাপী) শিক্ষা সপ্তাহে উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতার জন্য ২য় পুরস্কার লাভ, ১৯৬১ সালে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট হাইস্কুল হইতে দ্বিতীয় বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষা পাশ ও চট্টগ্রাম সরকারী কলেজে ভর্তি, ১৯৬২ সালে চট্টগ্রামে শহীদ সোহরাওয়াদ্দী মুক্তি আন্দোলন ও শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বাতিল আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা, নির্বাচিত সহ-সম্পাদক ১৯৬৩-৬৪ সালে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ ছাত্র- সংসদ, ১৯৬৪ সালে মাদারে মিল্লাত নির্বাচন প্রচার কমিটির প্রচার সম্পাদক হিসাবে তদানীন্তন পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পক্ষে গঠিত সম্মিলিত বিরোধী দলের প্রার্থী ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে বৃহত্তর চট্টগ্রামে ব্যাপক গণ সংযোগে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন, সাধারণ সম্পাদক (জি এস) ১৯৬৪-৬৫ সালে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদ, সহ-সভাপতি (ভিপি) ১৯৬৬ সালে চট্টগ্রাম সিটি কলেজ ছাত্র সংসদ, ১৯৬৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় বি.এ. পাশ, ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বের প্রতি দৃঢ় আস্থা ও তাঁর ঘোষিত ৬ দফা কর্মসূচির প্রতি আকৃষ্ট হইয়া আওয়ামী লীগে যোগদান করেন, চট্টগ্রাম সিটি আওামী লীগের প্রচার সম্পাদক হিসাবে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন, ১৯৬৬ সালে চট্টগ্রাম শহরে বেবী টেক্সী ও রিক্সা ড্রাইভারদের সংগঠিত করিয়া চট্টগ্রাম বেবী টেক্সী ও রিক্সা ড্রাইভার ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা করেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর টেক্সী ড্রাইভারদের পুর্নবাসনের জন্য চট্টগ্রাম বহুমুখী সমবায় সমিতি গঠন করিয়া অসহায় রিক্সা ও টেক্সী চালকদের জন্য কিস্তিতে সমবায়ের টেক্সী প্রদানে বলিষ্ঠ ভূমিকা গ্রহণ করেন, ১৯৬৬-৬৯ সালে আওয়ামী লীগের দুর্দিনে ৬ দফার আন্দোলনে ও প্রচারে সক্রিয় নেতৃত্ব প্রদান করেন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানকে অভিযুক্ত করায় চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের ব্যাপক সংগ্রামের (৬৯ গণ অভ্যুত্থান সহ) অন্যতম সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে দফার পক্ষে চট্টগ্রাম-ফেনী-নোয়াখালী-রাঙ্গামাটি-রামগড়-কাপ্তাইয়ে ব্যাপক গণসংযোঘ করেন, ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ দিবাগত মধ্য রাত্রে চট্টগ্রাম শহরে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা মাইকযোগে প্রচার করেন, ১৯৭২ সালের মে মাসে পশ্চিম জার্মানীস্থ বিশ্ব গীর্জা পরিষদের আমন্ত্রনে মুহাম্মদ আশরাফ খান পশ্চিম জার্মানী সফর করেন। সেই সময় হামবুর্গ বন্দরে বাংলাদেশ গামী তিনটি জাহাজে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর সাথে অংশ গ্রহণ করেন, ১৯৭৩ সালে চট্টগ্রাম পৌরসভা নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান (বর্তমান ডেপুটি মেয়র) পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী, ১৯৭৭ সালে চট্টগ্রাম পৌরসভা নির্বাচনে চেয়ারম্যান (বর্তমান মেয়র) পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে নির্বাচন করেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সাবেক প্রধান মন্ত্রী মিজানুর রহমান চৌধুরী, স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যান্য নেতবৃন্দ যথা- জনাব সামশুল হক (গাজীপুর), অধ্যাপক ইউছুফ আলী (দিনাজপুর), শাহ্ মোয়াজ্জেম হোসেন, শেখ ফজলুল হক মনি, এনায়েতুর রহমান, কে.এম. ওবাইদুর রহমান, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমদ, ফেরদৌস আহমদ কোরাইশী, কর্ণেল (অবঃ) অলি আহম্মদ বীর বিক্রম, নুরে আলম সিদ্দিকীসহ আরও বহু জনের সাথে মুহাম্মদ আশরাফ খানের হৃদ্দতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল, দেশব্যাপী সড়ক পরিবহণ মালিকদের জাতীয় সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ সমিতি কেন্দ্রীয় মহাসচিব হিসাবে (১৯৮৪ সাল হইতে কার্যকত, ১৯৯৯ সালে ঢাকা-কলিকাতা বাস-সার্ভিস চালুর সরকারি সিদ্ধান্ত ঘোষিত হওয়ার পর বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ সমিতির কেন্দ্রীয় মহাসচিব হিসাবে মুহাম্মদ আশরাফ খান একটি সরকারি প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসাবে ঢাকা হইতে কলিকাতা গামী প্রথম বাসে কলিকাতা গমন করেন এবং বেনাপুল সীমান্ত ও কলিকাতায় সাংবাদিকদের সাথে বাস রুটটির উন্নয়নের ব্যাপারে গঠনমূলক বক্তব্য রাখেন যাহা ভারতীয় সংবাদ পত্র ও প্রচার মাধ্যমে ব্যাপক ভাবে প্রচারিত হয়, দেশের শীর্ষ বাণিজ্য সংগঠন এফ.বি. সি.সি আই এর পরিবহণ সংক্রান্ত উপ-কমিটির কো-চেয়ারম্যান হিসাবে দীর্ঘদিন যাবত দায়িত্ব পালন করেছেন, সদস্য– (১৯৮৮-৯০) ইং চট্টগ্রাম জিলা পরিষদ, আজীবন সদস্য- রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি- চট্টগ্রাম, আজীবন সদস্য- ঢাকাস্থ চট্টগ্রাম, সমিতি, সদস্য- বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা, চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্র, চট্টগ্রাম সাহিত্য পাঠচক্র, মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী গবেষণা পরিষদের প্রাক্তন সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। মুহাম্মদ আশরাফ খান ব্যক্তিগত জীবনে একটি বৃহৎ কৃষি খামার ও ফলের বাগান প্রতিষ্ঠা করেন। পারিবারিক জীবনে মুহাম্মদ আশরাফ খান এক পুত্র ও তিন কন্যার জনক। তাঁর ছেলে মুহাম্মদ রিয়াদ খান। মেয়ে সাহিদা খানম (সম্পা), ফৌজিয়া খানম (রিংকু), তাহমিনা খানম (টিসু)। মুহাম্মদ আশরাফ খানের স্ত্রী ফাতেমা মেহরুন নিসা। তিনি চট্টগ্রাম ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের প্রাক্তন অধ্যাপক ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রাক্তন কমিশনার। ৩ জুন ২০১৮ এই মহা মানুষের প্রয়াণের মাধ্যমে ইতিহাস থেকে সংগ্রাম মুখর একটি নক্ষত্রের পতন গঠল। মহান আল্লাহ তাঁকে জান্নাত বাসী করুক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*