মহিমান্বিত পবিত্র লাইলাতুল কদর ও ধর্মীয় জীবনের শিক্ষা

মহিমান্বিত পবিত্র লাইলাতুল কদর
ও ধর্মীয় জীবনের শিক্ষা

লায়ন ডাঃ বরুণ কুমার আচার্য বলাই

কদর শব্দের অর্থ দুইটি- একটি হলো তাক্দির বা মর্যাদা। অপরটি হলো মর্যাদা বা সম্মান। লাইলাতুল কদর উভয় অর্থ বহন করে। একদিকে এই রাত্রে একটি বছরে মানব সমাজের জন্য আল্লাহ তালার পক্ষ থেকে ফায়সালা এসে থাকে যা বাস্তবায়নের দায়িত্ব ফেরেস্তাদেরকে দেওয়া হয়েছে। অপর দিকে এই সিদ্ধান্তকারী রাতেই আল্লাহ তালা তার প্রিয় শেষ নবীর নেতৃত্বে দুনিয়ার মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন ও হেদায়াতের জন্য মহাগ্রন্থ আল কোরআন নাযিল করেছেন। আল কোরআনের আলোচনা থেকে বুঝা যায় কোরআনের গুরুত্ব, মহত্ব ও কার্যকারীতা বুঝাবার জন্যই আল্লাহ তালা কদরের রাত্রের মহত্ব বুঝাবার চেষ্টা করেছেন। আল্লাহ তালা ঘোষণা করেছেন আমি এই কোরআন কদরের রাত্রে অবতীর্ণ করেছি। তোমরা কি এই রাতের পরিচয় জান? কদরের রাত হাজার মাসের চেয়ে শ্রেষ্টতর। এই রাতে ফেরেস্তাকুল এবং হযরত জিব্রাইল (আঃ) আল্লাহ তালার অনুমতি ক্রমে তার প্রতি নির্দেশ সহ দুনিয়ায় অবতরণ করেন। রাতটি পুরো পুরি শান্তিময় (সুরা কদর)। রাতটি ভোর পযর্ন্ত যে শান্তি ধারা অব্যাহত থাকে এ ছাড়া সুরায়ে দোখানের প্রথম থেকে ৪র্থ আয়াতে ও আল্লাহ তালা রাতের গুরুত্ব ও মহিমা উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তালা বলেন, হা-মীম শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের আমি একে নাযিল করেছি এক বরকতময় রাতে নিশ্চয় আমি সর্তককারী। মানব জাতিকে সতর্ক করা আমার সিদ্ধান্তের অর্ন্তভুক্ত ছিল। এ ছিল সে রাত যে রাতে আমার নির্দেশ প্রতিটি ব্যাপারে হিম্মত পূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়ে থাকে। তোমার রবের পক্ষে থেকে রহমত স্বরূপ একজন রাসুল পাঠানো আমার সিদ্ধান্তের অর্ন্তভুক্ত ছিল। নিঃসন্দেহ তিনি সব কিছু জানেন এবং শুনেন। উভয় সুরাতে কদরের রাতের পরিচয় দেওয়া হয়েছে। তবে কিছু সংখ্যক তফসীর কারক সুরা দোখানকে শবে বরাতের রাতের দিকে ইঙ্গিত করেছেন বেশীর ভাগ তফসীর কারক শবেবরাতের পরিবর্তে লাইলাতুল কদরকেই তারা গ্রহণ করেছেন। কারণ শবে বরাতের গুরুত্ব ও মর্যাদার পক্ষে সহী হাদিসের কোন দলিল পাওয়া যায়না। যা পাওয়া যায় তা অত্যন্ত দুর্বল সনদের। বর্তমান পাক ভারত উপমহাদেশে যে ভাবে শবে বরাতের তাজিম করা হচ্ছে, তাতে করে শবে কদরের মর্যাদা হানি হচ্ছে বলেই অধিকাংশ আলেমদের মতামত। এমনি সাধারণত বেদায়াত প্রতিষ্ঠিত হলে সুন্নত বিলুপ্ত হয়ে যায়। সহী হাদিসের আমল কমে গেলে জাল হাদিসের আমল জারী হয়ে যায়। আমাদের এই উপ-মহাদেশে ফরজের চাইতে নফলের গুরুত্ব বেশী, সুন্নাতের চাইতে বেদাত আমল বেশী, সহী হাদিসের পরিবর্তে জাল হাদিসের প্রচলন বেশী, তাওহিদ এর পরিবর্তে শিরিক বেশী। দেওবন্দী আর বেরলবী যে আকীদায় বিশ্বাসী হউক না কেন শিরিক বেদাতের সংমিশ্রণ রয়েছেই। শবে বরাত ও শবে কদরকে সমান গুরুত্ব দেওয়ার কোন সুযোগ নেই কারণ শবে কদরের গুরুত্ব কোরআন স্বীকৃত এবং কোরআন নাযিলের কারণেই লাইলাতুল কদরের মর্যাদা বৃদ্ধ পেয়েছে। কোরআন নাযিলের কারণই রমজান মাসের সম্মান বেশী। আর এই কোরআন নাযিলের মাধ্যমে আল্লাহ তালা মানব জাতির ভাগ্য পরিবর্তন করেছেন। আল্লাহর নবী হযরত রাসুল (সঃ) দুনিয়াতে আবির্ভূত হবার পর থেকেই তার চার পার্শ্বেও পৃথিবীতে মানব জাতিকে নির্যাতিত ও নিপীড়িত হতে দেখেছেন। দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার, খুন খারাবী, কলহ, বিবাদ, দুরাচার, বাভিচার, নারীর জাতির ইজ্জত আবরু ও জীবন বিপন্ন হতে দেখেছেন। অশান্তির আগুনে মানব সমাজকে জলে পুড়ে ভস্ম হতে দেখেছেন। সকল পাপাচার দুরাচার শোষণ নির্যাতন ও অশান্তি দুর করে, শান্তি, সুখের ন্যায় ও ইনসাফ পূর্ণ সমাজ গড়া যায়। এ চিন্তায় তিনি যৌবনে পা দিতেই হিলফুলফুজুল নামে সংগঠন কায়েম করেন। কিন্তু সমাজের কোন পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়নি। এই পর্যায়ের প্রৌঢ়ত্বের সুচনা লগ্নে তিনি লোকালয়ে ছেড়ে হেরা গুহায় গিয়ে ধ্যান মগ্ন হয়েছেন। এই ধ্যান মগ্নের মূল কারণ ছিল মানব সমাজের দুর্বিসহ অবস্থা সম্পর্কে চিন্তা ভাবনার কারণে সৃষ্টি হওয়া হৃদয়ের সীমাহীন পেরেসানী ও অস্থিরতা। এই ধ্যানমগ্নের এক পর্যায়ে জাহেলিয়াতের কবল থেকে মানবতাকে মুক্ত ও মানুষত্বকে উদ্ধার কারার লক্ষ্যে মানুষের জন্য আল্লাহ তায়ালা তার শেষ নবীর উপর সর্বশেষ হেদায়েত নাযিলের সূচনা করেন কদরের রাতে আল-কোরআন নাযিল করেই মানবতার ভাগ্য পরিবর্তন করেছেন। পাশ্ববিকতা ও পৈশাচিকতার মূলোৎপাটন করে মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এই রাতের মর্যাদা সুরা কদরে বলা হয়েছে তুমি কি জান কদরের রাত কোনটি যে রাতে সহস্র মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতম। এখানে সহস্র মাসের ব্যাপারে তফসীর কারকগণ বিভিন্ন মত পোষণ করেছেন। কেউ বলেছেন কয় হাজার বছর হবে তার কোন হিসাব নেই। আবার কেউ বলেছেন সহস্র মাস বলতে তিরাশি বছর চার মাস বুঝানো হয়। এইরাত সম্পর্কে আল্লাহর নবী এরশাদ করেন লাইলাতুল কদরের পূর্ণময় রজনীটা কেবলমাত্র আমার উম্মতেরাই প্রাপ্ত। আর কেহ নই (বোখারী-দুররে মনসুর) তাহার কারণ সম্বন্ধে বিভিন্ন হাদিসে বিভিন্ন মত রহিয়াছে। এক হাদিসে আছে যে পূর্ববর্তী যুগের দীর্ঘায়ু ব্যক্তিগণ বহু বছর এবাদত করিয়া আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করেছেন। শেষ নবীর উম্মতের বয়স কম হওয়াতে আল্লাহ সোবহানাহু তালা লাইলাতুল কদর নাযিল করে আমাদেরকে ধন্য করেছেন। যদি কেহ ভাগ্য বলে লাইলাতুল কদরের অন্তত একটি রাত প্রাপ্ত হয় তবে তিরাশি বছর চার মাস পূর্ণ এবাদত বা তদপেক্ষা বেশী পরিমাণ সওয়াব অর্জন করতে পারবেন। অন্য এক হাদিসে বর্ণিত আছে একদা এক সময় হুজুর (সঃ) বনী ইসরাইলের এক ব্যক্তির সহস্র মাসের জিহাদের কথা উল্লেখ করেন। ইহা শুনিয়া কম বয়সের সাহাবারা দুঃখ প্রকাশ করেন। এমতাবস্থায় আল্লাহ পাক সূরা কদর নাযিল করিয়া লাইলাতুল কদরের সংবাদ দিয়ে তাহার প্রতিকার করেন। মোয়াত্তা ইমাম মালেক ও (তফসীরে মাজহারী)। আর এক বর্ণনায় জানা যায় যে বনী ইসরাইলের চার জন নবী যথা হযরত আইয়ুব (আ), হযরত জাকরিয়া (আ), হযরত হাজকীল (আ) ও হযরত ইউশা (আ) প্রত্যেকেই আশি বছর আল্লাহর এবাদতে মশগুল ছিলেন। তাহারা একবালি পরিমাণও পাপ করেনি এই ঘটনা শুনিয়া সাহাবাগণ স্তম্ভিত হইলেন ঠিক সেই মুহূর্তে জিব্রাইল (আঃ) সুরা কদর সহ অবতীর্ণ হন। এছাড়া আরো বহু রাওয়াত পাওয়া যায়। শবে কদরে আমাদের জন্য আল্লাহর বড় নিয়ামত আমরা এই নেয়ামত পেয়েছি রাসুল (সঃ) এবং আল-কোরআনের কারণে।
শবে কদরের ফজিলত: কদরের ফজিলত সম্পর্কে আল্লাহর নবী বলেন: যে ব্যাক্তি শবে কদরের রাত্রে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা রেখে সওয়াবের আশায় এবাদত করে আল্লাহ তার পূর্বকৃত সকল পাপ ক্ষমা করে দিবেন (বোখারী ও মুসলিম)। হযরত নবী করিম (সঃ) রমজান মাস উপস্থিত হইলে বলিতেন যে, এই মাসে সহস্র মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠতম একটি রজনী আছে যে ব্যাক্তি এই রজনীর সদ্ধ্যবহার করিতে অবহেলা করিয়াছেন সে যেন সকল মঙ্গল ও পুণ্য হতে বঞ্চিত রহিয়াছে সে হতভাগা নয় কি? যে এত বড় নিয়ামতকে বিসর্জন দেয় (ইবনে মাজা)। হযরত নবী করিম (সঃ) বলেছেন তোমরা রমজানের শেষে (১০) দশ দিনের যে কোন বেজোড় রাত্রে শবে কদর তালাশ কর (বোখারী ও মেশকাত)। শবে কদরের সঠিক তারিখ সর্ম্পকে আলেমদের বিভিন্ন উক্তি রয়েছে আল্লামা ইবনে হাজর আসকালানী ফতহুল বারীর মধ্যে ৪৬ টি প্রমাণসহ পেশ করেছেন শবে কদর শেষ (১০) দশ দিনের বোজাড় রাতে ইমাম মালেক, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল এবং সুফিয়ান সওরী এর মতে শবে কদর নির্দিষ্ট কোন তারিখে হয়না বরং শেষ দশকের রাত্রিগুলোর মধ্যে ঘূর্ণায়মান হতে থাকে। ইমাম শাফেয়ীর মতে ২১ রাতে শবে কদর হয় (ফতহুল বারী)। ইমাম আজম আবু হানিফা (রাঃ) এবং জমহুর ওলামাদের মতে ২৭ রমজানের সাতাশতম রজনী শবে কদর সংগঠিত হয় (তাফসীরে খাজেন ও কুরতবী)। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রঃ) দৃঢ়তার সাথে বলেছেন ২৭শে রমজানেই শবে কদর (তফসীরে কবির)। সকল ওলামায়ে কেরামদের মতামত উক্তি ও যুক্তির সারমর্ম হলো: শবে কদর শেষ দশকের বেজোড় রাত্রে সংগঠিত হতে পারে। রমজান মাসকে মূলত তিন ভাগে ভাগ করেছেন।
১ম রহমত, ২য় বরকত, ৩য় মাগফিরাত বা নাজাত। নাজাত যেহেতু শেষ ভাগে সেহেতু শবে কদরও শেষ দশকে পাওয়া যাবে। রাসুল (সঃ) শবে কদর তালাশ করার জন্য প্রতি বছর মসজিদে এতেকাফ থাকিতেন। আমাদেরকে এই পুণ্যময় রজনী শবে কদর তালাশ করে নিুে বর্ণিত আমলগুলি করা দরকার।
১. নামায পড়া, বোখারী শরীফে বর্ণিত আছে যে ব্যাক্তি এইরাত্রে দণ্ডায়মান হয় আল্লাহ তার সকল গুনাহ মাফ করে দেন। ২. কোরআন অধ্যয়ন: যেহেতু এই রাত্রে আল-কোরআন নাযিল হয়েছে সেহেতু বেশী বেশী করে অর্থসহ কোরআন শরীফ পড়া দরকার। কারণ নফল এবাদতের মধ্যে কোরআন অধ্যয়ন সর্ব উত্তম এবাদত (আল-হাদিস)। ৩. জিকির, তাসবীহ, তাহলিল, দুরুদ ও অন্যান্য নফল এবাদতে মগ্ন থাকা। তবে সতর্ক থাকা দরকার যে, জিকির ও তসবীহ একান্ত ব্যক্তিগত এবাদত। জিকিরের ও দরুদের মজলিশে বসা বা হালকায়ে জিকির সহী হাদিসে প্রমাণিত নয়, তাই প্রচলিত জিকির মাহফিল করা বেদয়াত। কদরের রাত্রে এবাদতের নামে বেদয়াতে লিপ্ত হওয়া যায় না। ৪. আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি ও তওবা এস্তেগফার করা। ৫. দান খায়রাত করা: আল্লাহর নবী এই রাত্রে বেশী করে দান খয়রাত, সদকাহ করতেন। তাই আমাদেরকেও বেশী করে দান সদকাহ করা দরকার। ৬. কবর জিয়ারত: হাদিস শরীফে আছে রাসুল (সাঃ) কদরের রাত্রে মাঝামাঝি সময় কবরস্থানে গমন করতেন এবং কবর বাসীর জন্য দোয়া করতেন। ৭. দুরুদ পাঠ: এই সম্মানিত রাত্রে আল্লাহর নবীর উপর বেশী করে দুরুদ শরীফ পড়া। ৮. আল কোরআনকে জীবনের সর্বক্ষেত্রে মেনে চলার শপথ গ্রহণ করা। এই কদরের রাত্রে আল্লাহ পাক সোবাহানাহু তায়ালা মানব জাতির ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য সর্বশেষ ঐশী বাণী ও হেদায়েত গ্রন্থ আল-কোরআন নাজিল করেছেন।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও মরমী গবেষক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*