সেতু নির্মানের আশ্বাস দিয়ে রাঙামাটি জেলা পরিষদ তথ্য গোপন করে ফুটব্রীজ নির্মানের অভিযোগ

সেতু নির্মানের আশ্বাস দিয়ে রাঙামাটি জেলা পরিষদ তথ্য গোপন করে ফুটব্রীজ নির্মানের অভিযোগ
ষ্টাফ রিপোর্টার :: সেতু নির্মানে জনসাধারনের সাথে রাঙামাটি জেলা পরিষদের অভিনব কায়দায় তথ্য গোপন করায় স্থানীয়দের মধ্যে থেকে প্রতারনার অভিযোগ উঠেছে।
এ অভিযোগ করেছেন স্বয়ং ভুক্তভোগী উলুছড়া, আলুটিলা, নোয়াআদাম, কাটাছড়ি ও স্বর্গপুর ৫ গ্রামের আদিবাসী জনসাধারনরা। তাদের দীর্ঘদিনের কষ্ট লাঘব হয়ে গ্রামের সাথে সড়ক যোগাযোগ চালু হবে জিবণযাত্রা উন্নয়ন হবে এমনই স্বপ্ন ধারণ করে আদিবাসিদের মনে।
স্থানীয় আদিবাসি বনমুনি চাকমা বলেন, শুনেছি গাড়ি চলাচলের একটি সেতু নির্মান করার জন্য রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ হতে ১ কোটি ৭০ লক্ষ টাকা বরাদ্ধ দেওয়া হয়েছে। সেতু নির্মাণ হলে এলাকার রোগী বহনের জন্য এ্যাম্বুল্যান্স, ফায়ার সার্ভিস এবং মালামাল বহনকারী যানবাহন চলাচল করতে পারবে। কিন্তু রাঙামাটি জেলা পরিষদ গাড়ী চলাচলের উপযোগী সেতু নির্মানের আশ্বাস দিয়ে ১কোটি ৭০ লক্ষ টাকা বরাদ্ধ করার কথা বলে বর্তমানে রাঙামাটি পৌরসভার নির্মানকৃত ১৯২টি সিড়ির নীচে ২০ ফুট দৈর্ঘ্যরে একটি ফুট ব্রীজ (পায়ে হাটার সেতু) নির্মানকাজ শুরু করেছে। ফুটব্রীজের নির্মাণকাজ প্রত্যক্ষ করে ৫ গ্রামের জনসাধারন এই ফুটব্রীজ নির্মান কাজ বন্ধ করে গাড়ী চলাচলের উপযোগী সেতু নির্মাণ করতে সাংবাদিকদের মাধ্যমে রাঙামাটি জেলা পরিষদ কতৃপক্ষকে অনুরোধ জানান।
সরেজমিনে তথ্য অনুসন্ধানে গিয়ে দেখা যায়, সরু ১৯২টি সিড়ির নীচে কয়েককজন শ্রমিক কাজ করছেন। একপাশে ফুটব্রীজে ব্যবহারের জন্য ছোট ছোট পিলার ফেলে রাখা হয়েছে। মূল ফুটব্রীজের কাঠামো তৈরীর জন্য কাজের অংশ হিসেবে দেখা গেল ছোট ছোট মাথা ভাংগা পিলার বসানো হয়েছে। গাড়ী চলাচলের কথা উঠতেই শ্রমিকরা জানান, এটি শুধুমাত্র সিড়ির নীচে ছোট একটি পায়ে হাটার সেতু (ফুটব্রীজ), এটি যানবাহন চলাচল উপযোগী কোন সেতু নয়।
গ্রামবাসীরা জানান, এই সেতু নির্মানের জন্য রাঙামাটি জেলা আনসার এ্যাডজুট্যান্ট কয়েকবার বাঁধা প্রদান করে, সেতু নির্মানের জন্য জায়গা দিতে রাজি ছিলোনা, শেষ মেশ জেলা আনসার এ্যাডজুট্যান্ট এর কার্যালয়ের পিছনে তাদের জায়গার বাহিরের অংশ দিয়ে সেতু নির্মানের জন্য মৌখিক অনুমতি দেন। বছরের পর বছর বিভিন্ন প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরে শেষ পর্যন্ত রাঙামাটি জেলা পরিষদ ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে এই সেতুটি নির্মাণের জন্য ১ কোটি ৭০ লক্ষ টাকা বরাদ্ধ দেয়। কিন্তু টাকার অংক বরাদ্ধ বড় হলেও নির্মাণ করা হচ্ছে ছোট একটি পায়ে চলাচলের ফুটব্রীজ। তাদের দাবী সেতু নির্মাণ হলে এ্যাম্বুল্যান্স, ফায়ার সার্ভিস এবং মালামাল বহনকারী যানবাহন চলাচল উপযোগী সেতু নির্মাণ করা হোক। ১ কোটি ৭০ লক্ষ টাকায় যানবাহন চলাচলের উপযোগী সেতু নির্মাণ করা সম্ভব, অথচ ঐ টাকায় নির্মান হচ্ছে ১৯২টি সিড়ির নীচে ফুটব্রীজ। রাঙামাটি জেলা পরিষদ আশ্বাস দিয়ে ঐ এলাকার জনসাধারনের সাথে প্রতারণা করছেন বলে অভিযোগ করে এলাকাবাসীরা বলেন এটা শুধু প্রতারনা নয়, বরঞ্চ ১ কোটি ৭০ লক্ষ টাকার লুটপাট করে ফুটব্রীজ নির্মান করে দায় সারা হচ্ছে।
এই সেতু নির্মানের জন্য রাঙামাটি জেলা আনসার এ্যাডজুট্যান্ট কয়েকবার বাঁধা প্রদানের বিষয়ে রাঙামাটি জেলা কামান্ডেন্ট মোহাম্মদ আবদুল আউয়াল বলেন, আমরা জনস্বার্থেই সরকারি কর্তৃব্য পালন করি। কোন প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে সর্বসাধারণের চলাচলের রাস্তা দেয়ার সুযোগ নাই। আমাদের প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তার বিষয় মাথায় রেখে আমরা স্থানীয় জনসাধারন চলাচলের সেতু নির্মানের জন্য আমাদের কার্যালয়ের পিছনের অংশ দিয়ে করার পরামর্শ দিয়েছি এবং জায়গা দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন বিষয়টি সহজভাবে বুঝার জন্য স্থানীয় ভাবে ১টি ম্যাপ তৈরী করা হয়েছে (ম্যাপের লাল চিহৃত অংশে সেতু করা যাবেনা এবং সাদা চিহৃত অংশে সেতু করা যাবে)। এবিষয়টি বাংলাদেশ আনসার মহাপরিচালক,২৪ পদাতিক ডিভিশনের এরিয়া কমান্ডার, রাঙামাটি ৩০৫ পদাতিক ব্রিগেড কমান্ডার ও রাঙামাটি জেলা প্রশাসকসহ সবাই জানেন। আমাদের ম্যাপের ভিতর দিয়ে আমরা বলেছি, এভাবে সেতু বা সড়ক নির্মান হলে আমার কোন আপত্তি নাই।
১ কোটি ৭০ লক্ষ টাকায় পায়ে হাটার সেতু নির্মাণ বিষয়ে বাতির নীচে অন্ধকারে থাকা উলুছড়া গ্রামের মায়াদেবী চাকমা ও মধুসুদন চাকমা বলেন, গাড়ি চলাচলের মত সড়ক চাই, ১৯২টি সিড়ি ওঠানামা করে আমাদের চলাচল করা সম্ভব না, যে পথে সাধারন মানুুষ চলাচল করতে হিমসীম খায় সে পথে সাধারন মানুষ রোগী নিয়ে কি করে হাসপাতালে যাবে ? এছাড়াও আমাদের বাজারে পণ্যদ্রব্য আনা নেওয়া করা লাগে, কিভাবে স¤ভব হয় এতগুলো সিড়ি বেয়ে মাথায় বোঝা নিয়ে ওঠতে, আমরা ফুট ব্রীজ চাই না, গাড়ী চলাচল উপযোগী সেতু চাই।
উলুছড়া এলাকার কারবারী রবিধন চাকমা বলেন, আমরা শুনেছি এই ব্রীজের ঠিকাদার রাঙামাটি জেলা আওয়ামিলীগের সেক্রেটারী ও রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য মো. মুছা মাতব্বর এর ভাই ব্রীজ নির্মান নিয়ে বড়াবাড়ি হলে কাজ বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেন, ব্রীজ নির্মান নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হলে ৫ গ্রামের আদিবাসিরা কষ্ট পাবে।
এছাড়া সাবা বৌদ্ধ বিহারের আবাসিক ভিক্ষু শাসন রক্ষী বলেন, দিনরাত চলাফেরা করতে হয়, আমাদের অনেক অসুবিধা হয় এরপর ওখানে এতগুলো সিড়ি বেয়ে নিচে নেমে রোগী আনা নেওয়া অসম্ভব বিষয়, তাই আমাদের গাড়ী চলাচল যোগ্য সেতু দেওয়া হোক, ফুট ব্রীজ দরকার নাই।
আলুটিলা গ্রামের বনমুনি চাকমা বলেন, ব্রীজ নির্মানের জন্য ১ কোটি ৭০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, আমরা চাইছি গাড়ি চলাচলের মত ব্রীজ হোক, ফুট ব্রীজ নয়। এই টাকা দিয়ে আমরা ফুট ব্রীজ চাই না, ছড়ার এপার হতে ওপার পর্যন্ত লম্বা একটা ব্রীজ চাই, যাতে করে এ্যাম্বুল্যান্স এবং ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি চলাচল করতে পারে।
উলুছড়ার নয়ন চাকমা তার স্ত্রীকে নিয়ে আনারস বহনকরা কালিন বলেন, অসুস্থ রোগী আর বাজারজাত করার জন্য মাথায় বহন করে আনারস, আম, কাঠাল ইত্যাদি মৌসুমী ফল আনা নেওয়া করতে হয়, এতগুলো সিড়ি বেয়ে মাথায় বোঝা নিয়ে ওঠতে আমাদের অনেক কষ্ট হয়, পায়ে হাঁটার রাস্তা হলে হবে না অন্তত এ্যাম্বুল্যান্স আর মালামাল বহণ করার জন্য সিএনজি চলাচল করতে পারে এমন ব্রীজ চাই।
উলুছড়া গ্রামের কান্যারাম চাকমা ক্ষোভ করে বলেন, সেতুর অভাবে কাঁধে করে গর্ভবতী রোগী হাসপাতালে নেওয়ার সময় রাস্তায় বাচ্চা প্রসব করার উদাহরণও এই গ্রামে রয়েছে অথচ এত বছর পর এই সেতুটি নির্মানের জন্য সরকারী মোটা অংকের টাকা বরাদ্ধ হয়েও দুর্নীতির কারণে সব লোপাট হচ্ছে। আমাদের ফুটব্রীজ দরকার নাই। আমরা ফুটব্রিজ চাই না।
আলুটিলা গ্রামের ভেদ ভেদী জুনিয়র হাই স্কুলের ছাত্রী স্বপ্না চাকমা ও সুষ্মিতা চাকমা বলেন, আমরা রাঙামাটি জেলা পরিষদের ফুটব্রীজ চাই না। যানবাহন চলাচলের জন্য পূর্ণাঙ্গ ১টি ব্রীজ চাই।
উলুছড়া গ্রামের দয়াময় চাকমা বলেন, জেলা পরিষদের ইঞ্জিনিয়ার আমাদের বলেছে, এ সেতুর দীর্ঘ হবে ২৭৭ ফুট এবং প্রস্থ হবে ৮ ফুট। কিন্তু জেলা পরিষদ কি কারণে এই সেতু নির্মানে তথ্য গোপন করছে ? বিষয়টি গোজামিল মনে হচ্ছে, এখন শুনছি, ফুটব্রীজ হবে। আমরা ফুটব্রীজ চাই না। তাছাড়া এ সেতু বা ফুটব্রীজ নির্মানের বিষয়ে রাঙামাটি জেলা পরিষদের উচিত হবে সকল তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করা। জেলা পরিষদ সঠিক তথ্য না জানানোর কারণে স্থানীয় অদিবাসিদের মনে বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। জনমনের বিভ্রান্তি ছড়ানোর আগে জেলা পরিষদ তার দায়িত্ব পালন করার অনুরোধ জানান তিনি।
১ কোটি ৭০ লক্ষ টাকায় ২০ফুট দৈর্ঘ্যরে পায়ে হাটার সেতু (ফুটব্রীজ) নির্মাণ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে গত ১ জুলাই সরকারী অফিস চলাকালিন সময়ে রাঙামাটি জেলা পরিষদের নির্বাহী প্রকোশলী কাজী আবদুস সামাদ এর কার্যালয়ে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। ২য় দিন ২ জুলাই সোমবার সরকারী অফিস চলাকালিন সময়ে রাঙামাটি জেলা পরিষদের নির্বাহী প্রকোশলী কাজী আবদুস সামাদ এর কার্যালয়ে গিয়ে তাকে পাওয়া গেলে তিনি তার অফিস কক্ষে গুটিকয়েক ঠিকাদারদের নিয়ে ব্যস্ত আছেন। ভেদ ভেদী আনসার ক্যাম্পের পিছন দিয়ে উলুছড়া, আলুটিলা, নোয়াআদাম, কাটাছড়ি ও স্বর্গপুর ৫ গ্রামের জন্য সেতু নির্মানের বিষয়ে জানতে চাইলে রাঙামাটি জেলা পরিষদের নির্বাহী প্রকোশলী কাজী আবদুস সামাদ এই সেতুর বিষয়ে কোন কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, এবিষয়ে আমি কিছু জানিনা, তুমি রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বৃষকেতু চাকমার কাছে যাও। রাঙামাটি জেলা পরিষদের নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব পালন করে রাঙামাটি জেলা পরিষদের সেতু নির্মাণ বিষয়ে কিছু না জানার প্রশ্নে তিনি বলেন, আমি যা জানি তা আপনাকে বলা যাবেনা, নিষেধ রয়েছে। তবে কার নিষেধ বিস্তারিত জানাতে মুখ খুলতে রাজি নয় নির্বাহী প্রকৌশলী কাজী আবদুস সামাদ। রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের অধিনে নির্মান ও রক্ষনা-বেক্ষণ কাজ তদারকি করা যার প্রধান দায়িত্ব সেই নির্বাহী প্রকোশলী সেতু নির্মানের বিষয়ে কোন ধরনের সৎ-উত্তর দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় রহস্যের জ্বট বাঁধল। এই জ্বট খোলার দায়িত্ব কার জনমনে প্রশ্ন।
এবিষয়ে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বৃষকেতু চাকমার কার্যালয়ে গিয়ে জানা গেল, তিনি রাজধানী ঢাকায় আছেন। চেয়ারম্যান বৃষকেতু চাকমার মুঠোফোন নং : ০১৮৪৩৩১৯৮৯ এই নাম্বারে বার বার যোগযোগ করে তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার কোন ব্যক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য রাঙামাটি সদর উপজেলার ৯নং ওয়ার্ড এর উলুছড়া, আলুটিলা, নোয়াআদাম, কাটাছড়ি ও স্বর্গপুর এই ৫ গ্রামের জনসাধারনের দীর্ঘ ৪৭ বছরের দাবী এবং এসকল গ্রামের অধিবাসীদের জীবনযাত্রা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্যে রাঙামাটি শহরের সাথে সংযোগ স্থাপনে ভেদভেদি জেলা আনসার এ্যাডজুট্যান্ট কার্যালয়ের পিছনে রাঙামাটি চট্টগ্রাম সড়কের উত্তর প্রান্তে কর্ণফুলি হ্রদে একটি সেতু নির্মানের জন্য রাঙামাটি জেলা পরিষদ থেকে ১ কোটি ৭০ লক্ষ টাকা বরাদ্ধ হয়। কিন্তু ঐ গ্রামগুলির জনসাধারনকে গাড়ী চলাচল উপযোগী সেতু দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তাদের চোখের সামনে ধোকা দেওয়া হচ্ছে। ১ কোটি ৭০ লক্ষ টাকায় দেওয়া হচ্ছে মাত্র ২০ ফুট দৈর্ঘর একটি পায়ে হাটার ফুটব্রীজ। # ভিডিওসহ দেখতে নীচের লিংকে ক্লিক করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*