হালদায় সুফল মিলছে প্রয়োজন সচেতনতা বৃদ্ধি

হালদায় সুফল মিলছে প্রয়োজন সচেতনতা বৃদ্ধি
মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম(রফিক তালুকদার)

দক্ষিণ এশিয়া বিখ্যাত মিঠাপানির নদী ও অন্যতম মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদাকে বাাঁচাতে এবং হালদার ঐতিহ্য ফিরে আনতে প্রশাসনের বহুমুখি প্রদক্ষেপের সুফল মিলছে। গত কয়েক বছর ধরে যেভাবে ডিমের পরিমাণ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছিল হালদা নিয়ে বড়ই শংঙ্কা দেখা দিয়েছিল। এবার বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, সাগরের জোয়ার ও মেঘের গর্জন বিশেষ করে হালদা রক্ষায় প্রশাসনের উদ্যেগসহ সম্মিলিত সমন্বয়ে ২০০৬ সালের পর বেশি ডিম দিল ‘মা’ মাছ। ২০০৬ সালে ৩২ হাজার ৭২৪ কেজি ডিম পাওয়ার পর তা এবার পাওয়া গেল ২২ হাজার ৬৮০ কেজি ডিম। গত বছর তা ছিল মাত্র ১ হাজার ৬৮০ কেজি এবং এর আগের বছর শুধুমাত্র নমুনা থেকে নামকাওয়াস্তে ৭৩৫ কেজি ডিম সংগ্রহ করা হয়েছিল। ১২ বছরে এবার সবচেয়ে বেশি ডিম মিলল দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননক্ষেত্র হালদায়। তাই এ অঞ্চলের ডিম সংগ্রহকারীদের মাঝে খুশির বন্যা বইছে। দেশের অর্থনীতেতে সংগ্রহকৃত ডিম গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এক হিসেবে দেখা যায় প্রায় পৌন চার হাজার কোটি টাকায় আহরিত রেনু বিক্রি হবে। সমৃদ্ধ হবে দেশের মৎস্য খাত।
জনস্রুতি রয়েছে পাহাড়ি অঞ্চলের সালদা গ্রামের সালদা নামক ছড়া থেকে হালদার নামকরন। হালদা নদী পার্বত্য অঞ্চল খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলার ১ নং পাতাছড়া ইউনিয়নের পাহাড়ি ক্রিক থেকে উৎপন্ন হয়ে পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে এ নদীটি ফটিকছড়ি, হাটহাজারী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া,চট্টগ্রাম শহরের চাঁদগাঁও হয়ে পড়েছে ইতিহাস খ্যাত আরেক নদী কর্ণফুলীতে। হালদা নদরি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এ দেশেই উৎপত্তি হয়ে এ দেশেই শেষ হয়েছে। সে হিসেবে এ নদী সম্পূর্নপরুপে আমাদের। প্রায় ১০০ কি.মি.দৈর্ঘের হালদা নদীতে মিলিত হয়েছে ৩৬টি ছড়া। এর মধ্যে খালের সংখ্যা ১৯টি। এটি পৃথিবীর একমাত্র জোয়ার ভাটার নদী যেখানে রুই জাতীয় মাছ ডিম ছাড়ে এবং নিষিক্ত ডিম সংগ্রহ করা হয়। হালদা বাংলাদেশের রুই জাতীয় মাছের একমাত্র বিশুদ্ধ প্রাকৃতিক জিন ব্যাংক। এ প্রাকৃতি জিনপুল বাঁচিয়ে রাখার জন্য হালদা নদীর গুরত্বঅত্যাধিক। দেশের রুই কাতলা,মৃগেল,কালিবাউস সহ সবধরনের কার্প জাতীয় মাছের একমাত্র প্রকৃতিক উৎস হালদা। হালদা নদী কেবল প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ঐতিহ্য নয়,এটি ইউনেস্কোর শর্ত অনুযায়ী বিশ্ব প্রাকৃতিক ঐতিহ্যর যোগ্যতাও রাখে।
হালদা নদী এবং নদীর পানির কিছু বৈশিষ্টের জন্য এখানে মাছ ডিম ছাড়তে আসে যা বংলাদেশের অন্যান্য নদী থেকে ভিন্নতর। এ বৈশিষ্টগুলো ভৌত,রসায়নিক ও জৈবিক। ভৌত কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে নদীর বাঁক,অনেকগুলো পাহাড়ি র্ঝণা বা ছড়া প্রতিটি ছড়ার ওজানে এক বা একাদিক বিল,নদীর গভীরতা,কম তাপমাত্রা,তীব্র খরস্রোত,এবং অতি ঘোলাত্ব। রাসায়নিক কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে কম কন্ডাক্টিভিটি,সহনশীল দ্রবীভূত অক্রিজেন ইত্যাদি। জৈবিক কারন গুলো হচ্ছে বর্ষার সময় প্রথম বর্ষণের পর বিল থাকার কারনে এবং দুকুলের বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হয়ে নদীর পানিতে প্রচুর জৈব উৎপাদন মিশ্রণের ফলে পর্র্যাপ্ত খাদ্যের প্রাচুর্য থাকে যা প্রজনন পূর্ব গোনাডের পরিপক্কতায় সাহয্য করে। অনেকগুলো পাহাড়ি র্ঝণা বিধৌত পানিতে প্রচুর ম্যক্রো ও মাইক্রো পুষ্টি উপাদান থাকার ফলে নদীতে পর্যাপ্ত খাদ্যণুর সৃষ্টি হয়। এই সব বৈশিষ্ট্যর কারণে হালদা নদীতে অনূকুল পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে রুই জাতীয় মাছকে বর্ষাকালে মাছকে ডিম ছাড়তে উদ্বুদ্ধ করে যা বাংলাদেশের অন্যান্য নদী থেকে আলাদা। হালদা নদীর বাঁকগুলোকে অক্সেবো বাঁক বলে । এদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল পানির প্রচন্ড ঘূর্ণন যার ফলে গভীর স্থানের সৃষ্টি হয়। স্থানীয়ভাবে গভীর স্থানগুলোকে কুম বা কুয়া বলা হয়। উজান হতে আসা বিভিন্ন পুষ্টি ও অন্যান্য পদার্থ কুমের মধ্যে জমা হয়। ফলে পানি অতি ঘোলা হয়। মা মাছেরা কুমের মধ্যে আশ্রয় নেয় এবং ডিম ছাড়ে।
বছরের বিশেষ সময় বিষেষ আবহাওয়ায়,বিশেষ তাপমাত্রায় ও লবণসহনীয়তায় কার্প জাতীয় মাছ এখানে ডিম ছাড়ে। বিশেষ করে এ উপযুক্ত সময়টা হচ্ছে বৈশাখ জৈষ্ঠ্য মাসে। এ সময় পূর্ণিমা তিথিতে অঝোর বৃষ্টি ও মেঘের গর্জনের সময় মা মাছ ডিম ছাড়ে। ডিম ছাড়ার এ বিশেষ সময়কে স্থানীয়রা জো বলে। এ জো এর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আমবস্যা বা পূর্ণিমা হতে হবে। সে সাথে প্রচন্ড বজ্রপাতসহ বৃষ্টিপাত হতে হবে। এ বৃষ্টিপাত শুধু স্থানীয় ভাবে হলে হবে না। তা নদীর ওজানেও হতে হবে। ফলে নদীতে পাহাড়ি ঢলের সৃষ্টি হয়। এতে পানি অত্যান্ত ঘোলা ও খরস্রোতা হয়ে ফেনাকারে প্রবাহিত হয়। জো এর সর্বশেষ বৈশিষ্ট হল নদীর জোয়ার-ভাটার জন্য অপেক্ষা করা। পূর্ণ জোয়ার শেষে অথবা পূর্ণ ভাটার শেষে পানি যখন স্থির হয় তখনই কেবল মা মাছ ডিম ছাড়ে । মা মাছেরা ডিম ছাড়ার আগে পরীক্ষামূলক ভাবে অল্প ডিম ছাড়ে। ডিমের অনূকুল পরিবেশ না পেলে মা মাছ ডিম নিজের দেহের মধ্যে নষ্ট করে দেয়।
ডিম সংগ্রহের মৌসুমে হালদার দুপাড়ে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। দুপাড়ে সমেবেত হয় দূর দূরান্ত থেকে আসা হাজার হাজা দর্শনার্থীর। অতীত কাল থেকে হালদা নদীতে উৎসবমুখর এ পরিবেশ চলে আসছে। বিশেষ করে স্থানীয় জেলে ও ডিম সংগ্রহকারীদের আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। তারা সারা বছর প্রতীক্ষায় থাকে আননদঘন এ সময়ের জন্য। জানুয়ারী ফেব্র“য়ারী থেকে শুরু হয় ডিম ধরার প্রস্তুতি,এসময় পুকুর তৈরি,কুয়া খনন,নৌকা মেরামত ও পার্টনার সংগ্রহের কাজ চলতে থাকে। মে-জুলাই মাসে ডিম সংগ্রগের পর রেণুর পরিস্পুরণ,পরিচর্যা,পোনা বিক্রয় চলতে থাকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। স্থানীয় ডিম সংগ্রহকারীরা বছরের এ ৭/৮ মাস কর্মব্যস্থতায় দিন অতিবাহিত করে।
দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখা একটি মা মাছের অবদান পর্যালোচনা করলে বুঝা যায় এ হালদা আমাদের জন্য সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত কি আশীর্বাদ স্বরুপ। গভেষকদের মতে একটি কাতলা মাছ তৃতীয় বছর বয়স থেকে পরিপক্কতা লাভ করে ডিম দেওয়া শুরু করে। কাতলা মাছের ডিমের সংখ্যা ১৫ লক্ষ থেকে ৩৫ লক্ষ ( ৫ কেজি থেকে-২০ কেজি ওজন)সুতরাং গড় সংখ্যা ২৫ লক্ষ।
একটি মা মাছ থেকে এক বছরে চার ধাপে আয় করা যায। সে মতে ৫ বছরে অর্থনীতিতে একটি মাত্র মাছের অবদান হিসাব করলে দেখা যায়,মাছটি মোট ১৯ কোটি ৮৪ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা দান করেছে আমাদের অর্থনীতিতে । হালদা নদীতে বিগত ১০ বছর ১৯৯৮ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত প্রাপ্ত রেনুর পরিমাণ হিসাব করলে দেখা যায় গড় রেণু প্্রাপ্তির পরিমাণ ৬০৪.৬৪ কেজি ( পোনার সংখ্যা = ৩০ কোটি ২৩ লক্ষ ২০ হাজার)। একই পদ্বতিতে এক বছরে চার ধাপে জাতীয় অর্থনীতিতে হালদার অবদান প্রায় ৮২১ কোটি ১০ লক্ষ ১১ হাজার ২শত টাকা। যা দেশের মৎস্য উৎপাদনের ৬% । সুতরাং সহজেই বুঝা যায় ডিম সংগ্রহ করে শত শত লোকের জীবিকা অর্জনসহ দেশের অর্থনীতিতে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে হালদা নদী।
এ নদী মিঠা পানির অন্যতম উৎস। কর্ণফুলীকে ভরা মৌসুমে পঞ্চাভাগে পানি সরবারহ করে এ নদী। জোয়ার ভাটার এ নদীর মিঠাপানি কর্ণফুলীর লবণাক্ততাকে সহনীয় পর্যায়ে রেখে জনমানবের কল্যাণ করছে শতাব্দী ধরে। এ নদীর পানিই চট্টগ্রাম ওয়াশার মাধ্যমে শোধন করে নগরবাসীর জন্য সরবারহ করা হয়ে থাকে। যে ২২ কোটি লিটার পানি ওয়াসা সরবারহ করে তার শতকরা ষাট ভাগ হলো হালদার পানি। এ নদীর তীরবর্তী কয়েক লাখ মানুষের যাতায়াত ও চাষাবাদ এবং জল সেচের মধ্য দিয়ে এ নদী এ অঞ্চলের মানুষের সুখ সমৃদ্ধির সাথে শত বছর ধরে। উভয় পাড়ের মানুষের কৃষিকাজ,জীবন-জীবিকা প্রভৃতি মিলিয়ে বছরে প্রায় ১০ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা আয় নদীকে ঘিরে। নদী হিসেবে এককভাবে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখছে হালদা।
এত গুরত্বপূর্ন হওয়া সত্বেও নদীটি আজ বিভিন্নভাবে তার ঐতিহ্য হারাতে বসেছিল নদীটি শুধুমাত্র আমাদের খামখেয়ালীপনায় ও সচেতনাতার অভাবে। দখল দুষণসহ বিভিন্ন সমস্যার সম্মূখিন আজ এ নদীটি। দেশের একমাত্র মিঠা পানির প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদী দূষনের শিকার হচ্ছে চরম ভাবে। তথ্য সূত্রে জানা গেছে,চট্টগ্রাম শহরের ট্যানারী ও বিভিন্ন কলকারখানার বিশাক্ত কালো বর্জ্য ও বিভিন্ন হাটবাজারের ময়লা আবর্জনা হালদায় গিয়ে পড়ছে,এবং ফেলানো হচ্ছে। এতে নদীটি ভরাট হওয়ার পাশাপাশি দুষিত হচ্ছে মারাত্মকভাবে। এ অবস্থা রোধ করা না গেলে অচিরেই এ নদী মৃত নদীতে পরিণত হবে।
সচেতন মহল মনে করেন,এভাবে দূষনের শিকার হলে অচিরেই নদীটির জীববৈচিত্র হুমকির মুখে পড়বে এবং মৃত নদীতে পরিণত হবে।
এ ব্যপারে হালদা বিশেষজ্ঞ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মঞ্জুরুল কিবরীয়া বলেন,ট্যানারী থেকে থেকে যেভাবে দুষিত বর্জ্য হালদা নদীতে পতিত হচ্ছে এতে হালদার জীববৈচিত্র কখনও রক্ষা সম্ভব হবেনা। তিনি বলেন,হালদাকে রক্ষায় এখনই ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। তা না হলে হলে হালদাকে রক্ষা সম্ভব হবেনা।
অবাধে বালু উত্তোলনে চরমক্ষতি সাধিত হচ্ছে হালদার। এলাকা ভিত্তিক সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট বালি পাচারের অবৈধ এ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। ড্রেজিং মেশিন ও স্ক্যবেটর দিয়ে বালু উত্তোলন সম্পূর্ন নিষিদ্ধ হলেও এ আইনের তোয়াক্কা না করে কোন কোন স্পটে চলছে ড্রেজিং মেশিন ও স্ক্যবেটর দিয়ে বালু উত্তোলন ।ফলে ড্রেজিং মেশিন ও স্ক্যবেট বসানো স্থানে সৃষ্টি হচ্ছে বড় বড় গর্তের।এ ছাড়া অবাধে বালি উত্তেলনে নদী খাল নব্যতা হারাচ্ছে। দু পাড় ভেঙ্গে পড়ছে। বালু উত্তোলন করে ওইসব চক্র রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হলেও প্রকৃত অর্থে হালদাকে হত্যা করা হচ্ছে।
নদী পাড়ের ইটভাটা,তামাক চাষ,নৌযান চলাচলে পুড়া তেল,নদীর পাড়ে খোলা পায়খানা,চা বাগানগুলো ও চরে চাষাবাদে অতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগের ফলে নদীতে এসে পড়াসহ আরো বিভিনভাবে হালদা নদী চরম দুষনের শিকার হচ্ছে। হালদার সাথে যুক্ত ১৯টি খালের ১৮টিতে সুইচ গেইট এবং কয়েকটি স্থানে রাবার ড্যাম বসিয়ে পানি প্রবেশে বাধা, ১০০ বছরে কাঁটা হয়েছে ১১ টি বাঁক, তৎসময়ে ভাল লক্ষে বাঁকগুলো কাটা হলেও তা নদীর জন্য হয়েছে ক্ষতিকর। এসব বাঁকের কারণে পানির ঘুর্ণন ও স্রোতের একটি সম্মিলিত প্রভাবে সৃষ্ট তাপমাত্রায় হালদার কুমে থাকা মা মাছ ডিম পাড়তো। এছাড় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব চরমভাবে পড়েছে হালদায়। ফলে দিন দিন হালদার পানিতে বাড়ছে লবানাক্ত।যথাসময়ে বৃষ্টি ও বজ্রপাত হচ্ছেনা।
প্রাকৃতিক ও মানব সৃষ্ট এসব কারনে দিন দিন হ্রাস পাচ্ছিল মা মাছের ডিম দেওয়া। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় ১৯৪৫ সালে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ডিম ছাড়ে ৩২ কোটি ৬০ লাখ কেজি,১৯৪৬ সালে ৫৪ কোটি ৪০ লাখ কেজি পর্যন্ত। ২০১২ সালের মা মাছ ডিম ছাড়ার পরিমাণ ছিল ২১ হাজার ২৪০ কেজি। তা থেকে সংগ্রহিত রেনুর পরিমান ছিল ৩৫৪ কেজি। ২০১৩ সালে কমে দাড়ায় ৪ হাজার ২০০ কেজি। তা থেকে সংগ্রহিত রেণুর পরিমাণ ৭০ কেজি। ২০১৪ সালে বেড়ে ১৬ হাজার ৫০০ কেজি। রেণুর পরিমাণ ২৭৫ কেজি। ২০১৫ সালে কমে দাড়ায় ১ হাজার ৬৮০ কেজি। রেণুর পরিমাণ ৪৭ কেজি। ২০১৬ সালে তেমন ডিম পর্যন্ত দেয়নি মা মাছ। সংগ্রহিত রেণুর পরিমাণ দাড়ায় ১২ কেজি। ২০১৭ সালের এপ্রিলে ডিম সংগ্রহের পরিমাণ ১ হাজার ৬৮০ কেজি। এভাবে দিন দিন কমছে মাছের রেণু।
এদিকে গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৮টি ডলফিন মারা যায়। অবশেষে প্রশাসন গ্রহন করে কঠোর প্রদক্ষেপ ও নানামুখি তৎপরতা। যেমন বাড়ানো হয়েছে নজরদারি। নজরদারি বেড়ে যাওয়ায় যেসব কারণে হালদা দূষণ হচ্ছিল তা বন্ধ হয়ে গেছে। রাবার ড্যামের আয়তন কমানো হয়েছে। নদীর উভয় তীরে পাহারার ব্যবস’া করা হয়েছে যাতে কেউ মা মাছ ধরতে না পারে। শিল্প কারখানা থেকে দূষিত বর্জ্য নিক্ষেপ বন্ধ হয়েছে, ড্রেজার চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। বালু মহলের ইজারা বাতিলসহ আরো নানা উদ্যেগ গ্রহন করা হয়। এসব উদ্যেগ ও প্রদক্ষেপই হালদায় এবার বেশি ডিম পাওয়ার জন্য মুখ্য কারণ হিসেবে দেখছেন হালদা গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরীয়া। এছাড়া ডলফিনের মৃত্যু তো হালদার জন্য আশীর্বাদ হিসেবে দেখছেন তিনি। কারণ ডলফিন মারা যাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে সরাসরি হালদা নিয়ে মনিটরিং করা হয়েছে। এতে হালদার দূষণ ফ্যাক্টরগুলো নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ড্রেজার চলাচলে নিয়ন্ত্রণ, হালদার মুখ পরিস্কার রাখা, রাবার ড্যামের সাইজ কমিয়ে আনার মতো সিদ্ধান্তগুলো তখন হয়েছে। আর তা হালদার জন্য সুখবর বয়ে এনেছে, আজকের ডিমের প্রাপ্তি এরই প্রতিফলন।
গত শতকের পঞ্জাশ দশকে দেশেস মোট চাহিদার ৭০ ভাগ পূরণ করত হালদা নদীর পোনা। অতীতে মলা,কাতালা,চেপচেলা,মৃগেল,দারকিনা,রুই,কালিকাউস,ঘনিয়া,ভাজন,বাটা,কটি,তিতপুঁটি,জাতপুঁটি,তেরী পুঁটি,লেইজ্জা দারকিনা,বালিতোরা,বোয়ালী পাবদা,মধু পাবদা,কোরাল,সইল্লা বা নোনা টেংরা,গুলশা টেংরা,বুজুরী টেংরা,আইর,শিলং,কাজলী,বাচা,গাউরা,বাতাসী,দুই প্রজাতির মাছ বা কাঁটা ফলি,চিতল,কেসকী,চাপিলা,চিরিং,বেলে,ডাহুক,তিন প্রজাতির ফাসা,দুই প্রজাতির ফলে,নারী বা পুতুল,দুই প্রজাতির দারী,লাল চেওয়া,সাদা চেওয়া,বদু বাইদা কুলি,কালো মোরাবাইলা,কাটা মোরাবাইলা,প্রজাতির খংসী,দুই প্রজাতির কুকুর জীবসহ হালদা নদীতে ৭২ প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। ইতোমধ্যে ৭২ প্রজাতির মাছের ১৫ প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বিলুপ্ত হওয়ার পথে আরো অনেক প্রজাতি।
তবে সুখবর এই যে,অনেক দেরিতে হলেও সরকার হালদাকে পরিবেশগত সংকটপন্ন এলাকা (ইসি এ ) ষোষণা করতে যাচ্ছে। পরিবেশগত যদি কোন এলাকার অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন হয় তখন পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তখন সে এলাকাকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণার জন্য সুপারিশ করা হয়। ইসি এ ঘোষিত হলে সংশ্লিষ্ট এলাকাটিকে রক্ষায় অনেকগুলো আইন হয়। সে আইনগুলো মেনে চললে এলাকটি রক্ষা হয়।
মঞ্জুরল কিবরীয়া বলেন, হালদাকে ইসিএ ঘোষণা দীর্ঘদিনের দাবী ছিল। দিন দিন মা মাছের পরিমাণ কমে যাচ্ছে । একই সাথে কমে যাচ্ছে ডিমের পরিমাণ। মাছের অন্যতম প্রজনন কেন্দ্র হালদা ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। ইসিএ ঘোষণা হলে বিধি অনুযায়ী হয়তো নদীটি তার নিজস্ব রুপ ফিরে পাবে। আর কোথাও ইসি এ লংঘন হলেও সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া বিধান রয়েছে।
শুধু ইসিএ ঘোষণা নয় এ নদীটি রক্ষায় নেওয়া হোক কার্যকর ব্যবস্থাপন পরিকল্পনা । সম্মিলিত পরিকল্পনায় রক্ষা করা হোক হালদাকে। তবে সব কিছুর মূলে আমাদের সচেতনাতা। সৃষ্টি করা হোক জনসচেতনাতা। তাহলেই হালদা রক্ষা হবে । এছাড়া হালদাকে জাতীয় নদী হিসেবে ঘোষণার জন্য দীর্ঘদিন ধরে দাবী জানিয়ে আসছে চট্টগ্রামবাসী। হালদাকে নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণায়রত জনাব মনজুরুল কিবরিয়াও হালদাকে জাতীয় নদী হিসেবে ঘোষনার যুক্তিগত এ নদীর বৈশিষ্টগুলো তুলে ধরছেন বিভিন্নভাবে। তিনি জনসচেতনাতা বৃদ্ধিতেও নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। হালদা নিয়ে আগ্রহীদের তিনি বিভিন্নভাবে সহযোগীতা করে যাচ্ছেন। আরো অনেকেই আছেন হালদাকে নিয়ে ভাবছেন। সকলের নাম হয়ত তুলে ধরতে পারছিনা বলে দুঃখিত। তবুও যেন হালদাকে নিয়ে ভাবার,লেখার,প্রচারের,গবেষনার মানুষ বড়ই অপ্রতুল্য। যার দরুন হয়ত এ হালদার যথাযথ প্রাপ্য ও হালদাকে রক্ষার প্রয়োজনীয় উদ্যেগ আজো গ্রহন করা যাচ্ছেনা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি অনুরোদ করব যতই দ্রুত সম্ভব হালদা নদীর বৈশিষ্টগুলো এবং জাতীয় অর্থনীতিতে ভূমিকার রাখার গুরুত্বগুলো যথাযথ অনুধাবন করে হালদাকে জাতীয় নদী ঘোষণার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক। তাহলে হইতো এ নদীটি রক্ষা হবে এবং বৈচিত্রময় এ নদীটি আর্ন্তজাতীক স্বীকৃতিও পাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*