নাঙ্গলকোটে হারিয়ে গেছে খেজুর গাছ ও রস আর

নাঙ্গলকোটে হারিয়ে গেছে খেজুর গাছ ও রস আর
মো:ওমর ফারুক,নাঙ্গলকোট: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নাঙ্গলকোটে হারিয়ে গেছে খেজুর গাছ ও রস । বিলুপ্তির পথে গাছি বাংলার ঐতিহ্য খেজুর রসের পিঠা পায়েস আজ প্রায়ই অপরিচিত আর প্রবীণদের কাছে রসালো অতীত স্মৃতি। অথচ, কনকনে শীতে বাংলার প্রতি ঘরে ঘরে পিঠা পায়েসের উৎসব এক নিত্য ঘটনা ছিল। সমবয়সী কয়েকজন মিলে রাত্রিবেলা রস নিয়ে পায়েস রান্না করে খাওয়া আজ রুপকথার মত। ভাপা পিঠাকে আগুনে তাপ দেয়া লালছে রসে চুবিয়ে খাওয়ার মধুর স্বাদ অতীত সুখস্মৃতি মনে করে দেয়। গাছের মাথা থেকে দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে মধুময় রস সরবরাহ করে বাংঙ্গালির মুখে পৌঁছে দিতেন তারা হলেন গাছী । এদের কর্মকান্ড- বিচিত্র ও বেশ সাজানো। যুগযুগ ধরে রেখেছে বছরের পর বছর। এখন অনেকেই এ পেশা ছেড়ে দিয়েছে। ফলে, আমাদের সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের বড় এক চিহ্ন ধীরে ধীরে নিঃশেষ হওয়ার পথে। এতে শুধু একটা পেশা নয়, একটা ঐতিহ্যেরও মৃত্যু ঘটছে। আশ্বিন মাসের শেষের দিকে গাছীরা খেজুর গাছের রস সরবরাহ প্রক্রিয়া শুরু করে। এই গাছ কাটতে গাছিরা বড় ধারালো দা(ছেনী) ব্যবহার করে। দাটিকে বালু দিয়ে প্রতিদিন ভাল করে কাঠের বিশেষ পাতের উপর ঘঁষতে হয়। এতে দা বেশ ধারালো হয়। বাঁশের সরু নলের অংশকে মাঝ বরাবর কেটে দুইভাগ করা হয়। বাঁশ এর সংযোগস্থল দিয়ে কেটে ছোট ছোট টুকরা করে এক মাথাকে একবারে সরু করা হয় যাতে সহজেই গাছের নরম অংশে প্রবেশ করানো যায়। বাকি অংশ পাইপের মত থাকে, যার উপর দিয়ে গড়িয়ে রস প্রবাহিত হয়ে পাত্রে পড়ে। পাইপ সদৃশ এই বাঁশের অংশকে চুংগি বলা হয়। রস আহরণের জন্য মাটির তৈরী হাঁড়ি সংগ্রহ করা হয়। হাঁড়ির গলায় রশি দিয়ে তোড়া তৈরী করা হয়। বাঁশের পাতের তৈরি বিশেষ ধরণের বাক্স বা ঝুড়ির ব্যবস্থা রাখা হয়। মোটা কাঁছি আর কাঠের তৈরী হাতুড়ি নিয়ে যাত্রা শুরু করে গাছী। সাধারণত গাছের বয়স ৫বছর হলেই খেজুর গাছ থেকে রস আহরণ শুরু হয়। যে গাছগুলো পুরাতন তাদের বিপরীত পাশ থেকে কাটতে হয়। প্রথম দিকের কাজ বেশ জটিল ও সময়সাপেক্ষ। গাছী তার ধারালো বড় দা কিংবা ছেনী দিয়ে গাছের পাতার গোড়া থেকে কাটা শুরু করে। গাছের মাথার উপরের অংশের বেশির ভাগ ডোগা কেটে গাছের ঐ অংশকে ভালভাবে ছেঁটে পরিস্কার করতে হয় । তখন সাদা বর্ণ ধারন করে। বড় গাছে এ কর্ম সম্পাদনের জন্য গাছী তার পা বরাবর গাছ কিংবা বাঁশের টুকরাকে খেজুর গাছের সাথে বেঁধে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা করে। ওখানে দাঁড়িয়ে কোমরে মোটা রশি গাছের সাথে বেঁধে ২৫/৩০ ডিগ্রি কোণে অবস্থান করে সে । দৃশ্যটি বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হলেও দৃষ্টিনন্দন। এইভাবে ১০/১২ দিন রেখে দিলে সাদা অংশ রোদে শুকিয়ে হালকা হলুদ বর্ণ ধারণ করে। গাছী রস সংগ্রহের জন্য যাত্রা শুরু করে তখন। গাছের সংখ্যার উপর নির্ভর করে সে তার সময় ঠিক করে নেয়। সন্ধ্যার আগেই তাকে সকল গাছে হাঁড়ি বসাতে হয়। ঐ দিনে তার প্রয়োজনীয় সকল হাঁড়িগুলোকে এক জায়গায় জড়ো করে কাজ শুরু করে। পরনের লুঙ্গিকে বিশেষভাবে গুছিয়ে কোমরে ঢুলি বা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, বাক্সের পিছনে আংটার সাথে হাঁড়ি ঝুলিয়ে গাছে উঠতে হয়। পা দুটোকে ভালভাবে গাছের সাথে ঠেক দিয়ে কোমরে রশি বেঁধে ঝুলে ধারালো দা বা দিয়ে হলুদাভ অংশ ছেঁটে চুংগির সরু অংশে খানিকটা বাঁকা করে ঢুকিয়ে দেয়। তার দুইপাশে বাঁশের তৈরী সরু টুকরো গাছে প্রবেশ করিয়ে তাদের সাথে হাঁড়ি ঝুলিয়ে দেয়। কুয়াশার তীর্যক আলো ভেদ করে পৌঁছানোর অনেক অগেই রস নামানো শুরু করে গাছী। প্রচন্ড শীতেও লুঙ্গি গুছিয়ে গায়ে পরা চাদরকে এপাশ ওপাশ দিয়ে দ্রুত বেগে রস সংগ্রহ করে। সকল রস আহরণ করে এক স্থানে জড়ো করে। নানাবিধ হাঁড়ি থেকে অল্প কয়েক হাঁড়িতে রস একত্রিত করে। অন্য খালি হাঁড়িগুলোকে পুকুরের পানিতে ভালভাবে পরিস্কার করে রোদ মুখে রেখে বাড়িতে যাত্রা করে । বাঁশের তৈরী বড় অংশের টুকরোর উভয় পাশে সমপরিমাণ হাঁড়ি নিয়ে বাঁশটির মাঝ বরাবর কাঁধে নিয়ে বাড়ি রওয়ানা দেয়। অনেক কষ্ট করে আর ঝুঁকি নিয়ে কাজ শেষ করতে হয় । এত কষ্ট করার পরও গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় গাছিরা বিলুিপ্ত হয়ে যা”্ছ।ে অন্যদিকে খেজুর গাছও হারিয়ে যাচ্ছে ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*