শিশুদের নতুন ঠিকানা চল মাইজভাণ্ডারে যাই

শিশুদের নতুন ঠিকানা চল মাইজভাণ্ডারে যাই
লায়ন ডা. বরুণ কুমার আচার্য বলাই : কখনো কখনো এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন জীবনকে বিষাক্ত মনে হয়। তখন মানুষ অলি-আউলিয়াদের দ্বারস্থ হয়। সান্নিধ্যে যেতে চেষ্টা করে। অলি আল্লাহদের স্রষ্টা ভীরুতার প্রশ্নে আপোষ নেই। এঁরা লোভ লালসা থেকে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে। জীবনকে সুন্দর এবং আচরণকে রুচিসম্মত করতে প্রায়শ আহ্বান করে। তাই মানুষ জীবন সায়াহ্নে এসেও অলি আল্লাহদের সান্নিধ্যে থাকার চেষ্টা করে। একজন মানুষ যখন নবীন বয়সে প্রকৃত অলি-আউলিয়াদের দর্শনে যেতে পারে তাহলে সে অনেক কিছু অর্জন করতে পারে। জ্ঞান-বিজ্ঞানকে আয়ত্ত করতে পারে। জীবনকে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে সাজাতে পারে। তাই আগামীর কর্ণধার শিশুদের জন্য আয়োজন হয় কিছু পরিবেশনার।
গ্রামীণ শিশু-কিশোরদের সুস্থধারার সংস্কৃতির জগতে উৎকর্ষ বিধানের জন্য মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ গাউছিয়া হক মঞ্জিল থেকে শুরু হলো শিশু-কিশোর সমাবেশ। তথ্য প্রযুক্তির যুগে বাংলাদেশের যুব সমাজের প্রতিযোগিতানির্ভর বিশ্বে এটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করছে। এর মাধ্যমে তরুণ প্রতিভা বেরিয়ে আসবে। এরাই জাতির আগামী দিনের সম্পদ। তরুণ মেধাবীদের উৎকর্ষ বিধানের জন্য এরকম আয়োজন সত্যই প্রশংসনীয়।
কেউ বলেছেন বাড়াবাড়ি, আবার কেউ বলেছেন ক্ষতি কী। প্রতিভা খোঁজা তো দোষের কিছু নয়। তবে শিশুরা বেশ আনন্দিত। তাদের প্রতিভা খোঁজা মানেই তো আলোর দিকে এগিয়ে যাওয়া। পরিবারকে স্বপ্ন দেখানো। শিশু-কিশোররা পরিবারের সম্পদ। পারিবারিক প্রতিভার মাঝেই বেঁচে থাকুক সুখে থাকুক আনন্দে থাকুক অভিভাবকরা এটাই প্রত্যাশা করে সারাক্ষণ।
শিশু-কিশোর সমাবেশের প্রতিযোগিতার ইভেন্টগুলো খুবই চমৎকার মনে হয়েছে। থরে থরে সাজানো শিক্ষামূলক বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিয়ে এই সমাবেশ যেন একটি আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করছে। চট্টগ্রামে বসবাসরত দেশের সকল জেলার শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণ আয়োজকদের আশান্বিত করেছে। প্রতিটি বিষয় যেন একেকটি চমক হিসেবে আবিষ্কৃত হচ্ছে নতুন অধ্যায়। ভবিষ্যতে এইগুলো আরো প্রশংসা অর্জন করতে সক্ষম হবে। দেশের ভবিষ্যত কর্ণধার এই কাজে উদ্যোগী হিসেবে কাজ করছে শাহান শাহ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী ট্রাস্টের অন্যতম সংগঠন মাইজভাণ্ডারী একাডেমি। সহযাত্রী হিসেবে কাজ করছে এর অঙ্গসংগঠন মাইজভাণ্ডারী মরমী গোষ্ঠী, মাইজভাণ্ডারী সংগীত নিকেতন, শিল্পকলা একাডেমী, শিশু একাডেমীসহ ট্রাস্ট সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। সে জন্য সকলে গর্ববোধ করে।
শিশু-কিশোরদের জন্য বাংলাদেশে অনেক প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার চালু রয়েছে। কিন্তু এই শিশু-কিশোর সমাবেশ এর প্রতিযোগিতাকে মনে হলো পুরোপুরি ব্যতিক্রম। বাংলার লোকসংগীতের মূলধারার কাজগুলো এখানে বেশ ভালোই দেখাচ্ছে। শিশুরা শিখে সম্মান পাচ্ছে। আবার কর্মের প্রেরণায় অনেকের হৃদয়ে আশা জাগাচ্ছে। এখানে পুরস্কারে আছে অনুপ্রেরণা আর শেখা হচ্ছে জীবন সাধনা। আরো দায়িত্ব নিয়ে কাজ করলে এই অনুষ্ঠান বছরের পর বছর চালু রাখলে জাতীয় পর্যায়ে এক বিশাল মহীরূহে পরিণত হবে।
এই বছর এই শিশু-কিশোর সমাবেশের একযুগ পূর্তি। যার কথা মনে উঠলে মাইজভাণ্ডার গাউছিয়া হক মঞ্জিলে চিত্র সামনে ভেসে উঠে। এই সমাবেশের জন্ম সেখানেই। হুজুর গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী শাহসুফি মাওলানা সৈয়দ আহমদ উল্লাহ (ক.)-র পবিত্র ওফাত শতবার্ষিকী ২০০৬ সাল থেকেই এটি শুরু হয়েছে।
মাইজভাণ্ডার দরবার নিয়ে ছোটবেলাতেই আগ্রহ ছিল খুব বেশি। সেখানে মেলা হতো। ঢোল বাজত। গরু-মহিষ-ছাগল নিয়ে ভক্তরা ঢোল বাজিয়ে গীত গেয়ে সারি সারি মানুষ আসত মিছিলে মিছিলে। সেই মিছিলগুলোই মহামহীরূহে পরিণত হয় একসময়। বাবার সাথে শিশুরা যেত, শিশুরা ও বড়রা মিলে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যে শেষ রাতে পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা এবং তবারুক গ্রহণÑএগুলো সেকালের কথা। এখন কিন্তু সেটা নেই। এখন শিশুরা মাইজভাণ্ডারকে নিয়ে চর্চা করে। তারা মাইজভাণ্ডারী দর্শন, মাইজভাণ্ডারী ত্বরিকা ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে চর্চা করে। বাংলা ও ধর্মীয় সাহিত্যে মাইজভাণ্ডারী দর্শনের আবহকে খোঁজে বেড়িয়ে আলোর দিকে যাচ্ছে। যেখানে আদি থেকে অস্ত পর্যন্ত খোদাভীরুতা অর্জনের এক সহজ উপায় নিহিত আছে। এই শিশু সমাবেশ তার একটি প্রাণান্ত চেষ্টা। আয়োজকদের এই চেষ্টা আগামী প্রজন্মর জন্য একটি উদ্দীপনামূলক প্রেরণায় রূপান্তরিত হবে। এক যুগ পূর্তি উপলক্ষে বাঁধভাঙ্গা উচ্ছ্বাসের সকল শিশু-কিশোরদের জানাই সাদর সম্ভাষণ।

লেখক : প্রাবন্ধিক, মরমী গবেষক ও বহু গ্রন্থপ্রনেতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*