আমাদের একব্যাগ রক্তই বাঁচাতে পারে সুন্দর একটি জীবন

আমাদের একব্যাগ রক্তই বাঁচাতে পারে সুন্দর একটি জীবন
মোঃ মহসিন হোসাইনঃ বেশ কয়েক বছর আগের কথা। তখন বর্তমান প্রযুক্তির এতো প্রসার ঘটেনি। আসেনি ডিশ অ্যান্টেনা। একমাত্র টিভি চ্যানেল বিটিভি। রিমোট ঘুরিয়ে চ্যানেল পরিবর্তনের সুযোগ তখন ছিল না।পরিবারের সবাই প্রায় অধীর- আগ্রহ নিয়ে বিটিভি দেখতাম। বিশেষত সাপ্তাহিক নাটকগুলো। তখন নাটকের মাঝে দীর্ঘক্ষণ বিরতি থাকতো না। ২/১টি বিজ্ঞাপণের পর আবার নাটক। এসব বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের মাঝে প্রায়ই একটি আবেদন দেখা যেত। ‘একজন মুমূর্ষু রোগীকে বাঁচাতে দু’এক ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন।’ এরপর রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা জানানো হতো। মনটা ভার হয়ে যেত। মনে অনেক প্রশ্ন জাগতো। সেই রোগীটি বেঁচে আছেন? তাকে কি কেউ রক্ত দিয়েছেন?
একবিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব সাফল্য মাঝে মাঝে আমাদের বিস্ময়ের সীমা ছাড়িয়ে যায়। আমরা এখন অনেকাংশে প্রযুক্তি নির্ভর। জীবনের গতি পাল্টেছে। বদলিয়েছে রঙ। এখন আর একটি চ্যানেল দেখার অপেক্ষায় থাকতে হয় না। হাতে টিভি রিমোট কন্ট্রোল থাকলেই পরিবর্তন করা যায় চ্যানেল। মন ভার হওয়ার মতো ‘আবেদন’ খুব সহজেই এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব। তথ্য প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় আমাদের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে ‘ফেসবুক’। যে কোন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। এটির মাধ্যমে আমরা খুব সহজেই একে-অন্যের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারি। গড়ে তুলতে পারি নতুন নতুন বন্ধুত্ব।ফিরে পেতে পারি আমাদের পুরনো সব বন্ধুদের। শেয়ার করতে পারি নিজের সুখ-দুঃখের কথা। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবস্থাতেও আমাদের নজরে পড়ে বিংশ শতাব্দী’র সেই ‘আবেদন’। ‘মুমূর্ষু রোগীকে বাঁচাতে রক্তের প্রয়োজন।’ পার্থক্য শুধু একটা। তখন এটি প্রচার পেতো টিভিতে। প্রকাশ পেতো পত্রিকায়। আর এখন ভেসে উঠে ফেসবুকের দেয়ালে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক রিপোর্টে দেখা যায়, দেশে মুমূর্ষু রোগীদের বাঁচাতে বছরে প্রয়োজন প্রায় ১০ লাখ ব্যাগ রক্ত। অথচ গত বছর সংগৃহীত হয়েছে প্রায় ৮ লাখ ব্যাগ রক্ত। অর্থাৎ চাহিদার ২ লাখ ব্যাগ রক্ত কম সংগৃহীত হয়েছে। আর এই রক্তের মাত্র ৩০ ভাগ স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়। বাকি ৭০ ভাগ রক্ত রোগীর আত্মীয়-স্বজনরা আবার কেউবা কিনে দিয়ে থাকে। এতে অনেক সময় বিভিন্ন দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের তার গ্রুপ অনুযায়ী তাত্ক্ষণিকভাবে রক্ত না দেওয়ার কারণে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। তাছাড়া কঠিন সব রোগে যাদের রক্ত দেওয়ার মতো কাছের কোনও লোক না থাকে তারাও ভয়াবহ সমস্যায় মুখোমুখি হন। আমাদের দেশে ২০২০ সালের মধ্যে চাহিদার শতভাগ রক্ত স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের কাছ থেকে সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী ১ বছরে এ লক্ষ্য অর্জন করতে হলে সরকারিভাবেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন প্রতি ৩ মাস অন্তর অন্তর রক্ত দেওয়ার ব্যাপারে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা।
জনসচেতনতা বাড়ানোর প্রচেষ্টা সরূপ ‘আপনার রক্তেই জীবন আমার, রক্তদানে হোক জীবন সঞ্চার’-এই স্লোগান নিয়ে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সঙ্গে সংগতি রেখে পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব রক্তদাতা দিবস’। দিবসটি উদযাপনে বাংলাদেশে চিকিত্সক এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন বিবিধ কর্মসূচি দিয়েছে। রক্তের গ্রুপের আবিষ্কারক কার্ল ল্যান্ডইস্টেনার জন্মদিন ১৮৬৮ সালের ১৪ জুন। ১৯০০ সালে এ-বি-ও ব্লাড গ্রুপ আবিষ্কার করেন কার্ল ল্যান্ডইস্টেনার। এজন্য ১৯৩০ সালে তিনি মেডিসিনে নোবেল পুরস্কার পান। তার স্মরণে ২০০৪ সাল থেকে জন্মদিনটি ‘বিশ্ব রক্তদাতা দিবস’ হিসেবে পালন করা হচ্ছে। অসংখ্য মুমূর্ষু রোগীকে স্বেচ্ছায় রক্তদান করে যারা জীবন বাঁচাতে সাহায্য করেন তাদের দানের মূল্যায়ন, স্বীকৃতি ও উদ্বুদ্ধকরণের মধ্যে রয়েছে এ দিবসের তাৎপর্য।
দিবসটি’র তাৎপর্য যাই হোক না কেন, মানুষের উৎকর্ষ বিশ্লেষণ জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, প্রতিবছর সারাবিশ্বে প্রায় ১২ কোটি ব্যাগ রক্ত স্বেচ্ছায় সংগৃহীত হয়ে থাকে। বলা হয়ে থাকে, জনসংখ্যার মাত্র ১ ভাগ মানুষ নিয়মিত স্বেচ্ছায় রক্তদান করলেই তা একটি দেশের রক্তের চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট। নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে, স্বেচ্ছাদানের মাধ্যমে সংগৃহীত রক্তের ৬৫ ভাগ কাজে লাগে অনূর্ধ্ব ৫ বছর বয়সী শিশুদের। অন্যদিকে, উন্নত দেশগুলোতে সংগৃহীত রক্তের ৭৬ ভাগ যায় ৬৫ বছরের বেশি বয়সী রোগীদের শরীরে।
বাংলাদেশে নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন কর্মসূচির পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতিবছর নিরাপদ রক্ত পাওয়া যায় সবমিলিয়ে ৩ লাখের মতো। এর মধ্যে কোয়ান্টাম গড়ে প্রতি বছর সংগ্রহ করতে পারে ১ লাখ ব্যাগ। আর রেড ক্রিসেন্ট ও সন্ধানী মিলে আরও দেড় লাখ ব্যাগ দিতে পারে। ৫০ থেকে ৫৫ হাজার রোগী রক্তের অভাবে মারা যান। বাকিরা বাণিজ্যিভাবে বিভিন্ন স্থান থেকে রক্ত সংগ্রহ করেন। চিকিৎসকরা বলছেন,আমাদের দেশে প্রতিদিনই সড়ক দুর্ঘটনায় অনেকেই মারা যান। এদের বেশিরভাগই রক্তক্ষরণজনিত কারণে। রক্ত সঠিক সময়ে সংগ্রহ করে পরিসঞ্চালন করা গেলে অনেক জীবনই বাঁচানো সম্ভব। এ প্রাণগুলো অকালে ঝরে যাওয়া রোধ করতে প্রয়োজন আমাদের একটু সহানুভূতি, সচেতনতা। আমাদের এক ব্যাগ রক্তই পারে এদের জীবন বাঁচাতে।তারই পেক্ষিতে আমরা শুরু করেছি মানবতার ডাক সামাজিক সংগঠন।
নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে রক্তদানের হার খুবই কম। তবে এসব দেশে রক্তের চাহিদাও বেশি। তাই এসব দেশে চাহিদার তুলনার সরবরাহ সব সময় কম থাকে। রক্ত যেহেতু পরীক্ষাগারে তৈরি করা যায় না, তাই এর চাহিদা পূরণ হতে পারে কেবল রক্তদানের মাধ্যমে। আমাদের দেশেও রক্তদাতার সংখ্যা আগের তুলনায় বেড়েছে এবং বাড়ছে। তবে এখনও তা পর্যাপ্ত নয়।
২০১১ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি রিপোর্টে দেখা যায়, সবধরনের রক্ত দাতা মিলে সারা বিশ্বে প্রতিবছর ৯ কোটি ২০ লাখ ব্যাগ রক্ত সংগৃহীত হয়। বর্তমানে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০৭ কোটি ব্যাগ-এ। এর মধ্যে ৩১ শতাংশ স্বেচ্ছা রক্তদাতা আর ৫৯ শতাংশ আত্মীয় রক্তদাতা। বিশ্বের প্রায় ৬০টি দেশে শতভাগ স্বেচ্ছা রক্তদানের মাধ্যমে রক্ত সংগ্রহ করা হয়। উন্নত বিশ্বে স্বেচ্ছা রক্তদানের হার প্রতি ১০০০-এ ৪০ জন আর উন্নয়নশীল বিশ্বে প্রতি ১০০০-এ ৪ জনেরও কম।
চিকিৎসা বিজ্ঞান মতে, রক্ত দিলে শরীর খারাপ হওয়ার কোনও কারণ নেই। বরং ৩ মাস পরপর রক্ত দেওয়া ব্যক্তি বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা থেকে রক্ষা পান। শরীরে নতুন রক্ত উত্পাদনে সহায়ক হয়। রক্তদাতাদের হার্ট অ্যাটাক, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ইত্যাদিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কম থাকে। কোলেস্টরলের মাত্রা কমে শরীর সুস্থ থাকে। এছাড়া রক্ত দেওয়ার সময় দাতার শারীরিক একটি চেক আপ করা হয়। ফলে ৩ মাস অন্তর রক্তদাতারা বিনামূল্যে এই চেকআপের মধ্যে থেকে সুস্থ থাকতে পারেন। এছাড়া ভবিষ্যতে তার প্রয়োজনে বিনামূল্যে তাকে রক্ত দেওয়া হবে, এমন বিধানও রয়েছে। এই বিষয় গুলো অধিকাংশ সাধারণ মানুষের অজানা। প্রচার মাধ্যমগুলোতে, এসব বিষয়ে আলোচনা করতে খুব একটা দেখা যায় না। ফলে অজ্ঞতার জায়গাটি অপরিছন্ন-ই থেকে যাচ্ছে। বর্তমান বাংলাদেশে শিক্ষিতের হার ৬৫ শতাংশ। এই ৬৫ শতাংশ কি রক্তদানের বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা রাখেন? রক্তদানে উদ্ধুদ্ধ হয়ে কিংবা অনেকটা কৌতুহলবশত কারণেও অনেকেই স্বেচ্ছায় রক্তদান করেন। রক্তদাতা’র কিছু মৌলিক পরীক্ষা-নীরিক্ষা অত্যাবশ্যকীয় হলেও, সেটি করা হয় ক’জনের? এসব বিষয়ের প্রতি সংশ্লিষ্টদের আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বছরের দিবস ভিত্তিক দিনটিতে যতোটা ঢাক-ঢোল পিটিয়ে তৎপরতা দেখানো হয়, বছরের বাকী ৩৬৪দিন ঠিক ততোটাই অপতৎপরতা প্রমাণ পাওয়া যায়।
পত্রিকান্তরে আমরা জেনেছি, বর্তমানে দেশে সরকারি ২১৯টি এবং লাইসেন্স নিয়ে বেসরকারিভাবে পরিচালিত ১০২টি নিয়ে মোট ৩২১টি ব্লাড ব্যাংক রক্ত সংগ্রহ ও বিতরণ করছে। বেসরকারিভাবে গড়ে ওঠা বিভিন্ন ক্লিনিক নিজস্বভাবে রক্ত সংগ্রহ করে রোগীদের দিচ্ছে। এসব হিসাব জাতীয় তথ্যভাণ্ডারে যোগ হচ্ছে না। বিনামূল্যে রোগীদের রক্ত দেওয়ার বিধান থাকলেও, সেটি মানছেন ক’জন? কখনও আইনের মাধ্যমে রক্তদান করানো যায় না। এজন্য প্রয়োজন মানবিকতা, মানুষের জন্য ভালোবাসা। আর মানুষের পক্ষে রক্তদাতাদের প্রতিদান দেওয়াও সম্ভব নয়। রক্ত কেনা-বেচার সঙ্গে জড়িত দালাল চক্র নির্মূল জরুরি। একজন মানুষের অমূল্য সম্পদ তার রক্ত। সেটি’র সামান্য পরিমাণে বেঁচে যেতে পারে একটি প্রাণ। রক্তদানের মহান আগ্রহ সৃষ্টির লক্ষ্যে বিরাট প্রচারণা চালাতে হবে। একজন রক্তদাতাকে নিশ্চিত করতে হবে, তার মহান দান-টি বৃথা যাবে না। যদি সেটা সম্ভব হয়, তাহলে, ‘রক্ত’ সংক্রান্ত জটিলতার অবসান ঘটবে অনেকাংশে। জনসাধারণ নিয়মিত রক্তদানে উত্সাহিত হবে। বাঁচবে জীবন। বাঁচবে মনুষ্যত্ব। তাই আসুন আমরা সবাই মানবতার ডাকে সাড়া দিয়ে রক্তদানে আরো একধাপ এগিয়ে যাই।
লেখক পরিচিতঃ কবি, লেখক, কলামিষ্ট ও সাংবাদিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*