বিদেশ জীবনের মানুষের দুঃখ কষ্ট তুলে ধরেন তরুন সাংবাদিক জসীম ঊদ্দীন

বিদেশ জীবনের মানুষের দুঃখ কষ্ট তুলে ধরেন তরুন সাংবাদিক জসীম ঊদ্দীন

কুতুব উদ্দিন রাজু,চট্টগ্রাম:  আমরা আসলে জানি না একটা দেশের ছেলে অন্য আরেকটা দেশের মাটিতে কেমন কষ্ট করে আয়-উপার্জন করে। এই বিষয়গুলো আমাদের জানারও তেমন বিষয় নয়, কেন নয়? এই বিষয়গুলো জানা কি আমাদের দরকার নয়। নাকি এই বিষয়গুলো পাথর চাপা দেয়ার মতো কোনো বিষয়। না, দেশে থেকে একটা মানুষ বুকে কতটা কষ্ট নিয়ে দেশের বাইরে যায় তা হয়তো যে মানুষটা যায় সে মানুষটার থেকে ভালো আর কেউ বলতে পারবে না বা জানে না। কেননা দেশ থেকে একটা মানুষ সুস্থ অবস্থায় বিদেশে গেল ঠিকই সে মানুষটা বিদেশ থেকে অসুস্থ অবস্থায় ফিরে আসে দেশে। তখন তার প্রিয়গুলোর কষ্ট হয় কিন্তু প্রিয় মানুষ ছাড়া বাইরের কোনো মানুষের কষ্টের লেশমাত্র হয় না। কেননা সে মানুষটা তো শুধু তার আপন মানুষগুলোর জন্যই কষ্ট করছে। তা ভুল। সে মানুষটা কষ্ট করছে একটি দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য, দেশের সতেরো কোটি জীবনের জন্য, জীবনগুলোর বেঁচে থাকার জন্য। তাহলে আমরা কেন প্রবাসে থাকা মানুষটাকে কোনো মূল্যায়ন করছি না বা সম্মান দেখাচ্ছি না বা শ্রদ্ধাবোধের জায়গাটাও হারিয়ে ফেলেছি তা কেন। তা আমাদের সমাজব্যবস্থা, আমাদের দেশ এবং দেশের মানুষের কাছে প্রবাসীদের ছোট করে রেখেছে তার কারণ রাজনৈতিক ইস্যু। এই ইস্যু দ্বারা দেশের প্রত্যেকটা মানুষ বিভক্ত হলেও প্রবাসীরা কিন্তু কখনোই বিভক্ত হওয়ার কথা চিন্তা করে না। কারণ তারা বোঝে যে, দেশটা তো আমার, দেশের মানুষগুলো তো আমার, দেশের মানুষগুলোর এই সুখ-দুঃখ এগুলোও তো আমার। তাহলে কেন দেশ থেকে বিভক্ত হতে যাব। এই বিভক্ত হওয়ার জন্য তো আমাদের প্রবাসে আসা নয়, এই বিভক্ত হওয়ার জন্য তো আমাদের এই রাত-দিন পরিশ্রম করে যাওয়া নয়। এই বিভক্তের পেছনে লুকিয়ে আছে একটা স্বার্থ। যে স্বার্থটা আসলে দেশের মানুষ বুঝলেও প্রবাসীরা তা বোঝে না, তাদের একটাই চিন্তা যে, আমার দেশের মানুষগুলোকে আমারই ভালো রাখতে হবে। আমরা আসলে টের পাই না বা বুঝতে পারি না আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রবাসীদের ভূমিকা কতটুকু। প্রবাসীরা এখানে কতটুকু দায়িত্ব পালন করছে বা কি করে যাচ্ছে। তা আমরা দেখতে পাই গুটিকয়েক মানুষের কথা চিন্তা করলে যেমন মা-বাবা, ভাই-বোন, স্ত্রী-সন্তান যে মানুষগুলোর জন্য একজন মানুষ আসলে বিদেশে যায়। আমাদের বুঝতে একটু কষ্ট হয় যে প্রবাসীরা বিদেশ গেলে কেন দেশে আসে না বা দেশে আসার কথা চিন্তা করে না, না করার কারণ তারা দেশে ফিরলে তাদের আপন মানুষগুলোর যে সুখটা আছে বিদেশ থাকাবস্থায়। তাদের সে সুখ থাকবে না দেশে ফিরলে। তাদের জন্যই ওদের বিদেশ থাকা, দেশে না ফেরা। দেশের সঙ্গে, দেশের মানুষজনদের সঙ্গে প্রবাসীদের সম্পর্কের কথা চিন্তা করলে আমরা দেখতে পাই দেশের প্রতি, দেশের মানুষজনদের প্রতি প্রবাসীদের যে টান-সে টান দেশের মানুষদের নেই। কেননা তারা তাদের কাছে থাকা মাতৃভূমিকে অনুভব করতে পারছে না যেমনটা পারে দেশের বাইরে থাকা প্রবাসীরা। দেশের মাটির গন্ধ পর্যন্তও তারা শুকতে পায় কেননা তাদের কাজের মধ্যে থাকে দেশকে উদ্দেশ্য করে খেটে খাওয়া মানুষদের কথা, আপন মানুষগুলোর হাসিমুখের জন্য অপেক্ষা এবং তার আরো কাছের যেমন স্ত্রী-সন্তান তাদের ভালো থাকার কথা। সন্তানের পড়াশোনার খরচ, বৃদ্ধ মা-বাবার ওষুধের খরচ সবকিছুর কথাই যেন তার মাথায় কেউ গেঁথে রেখেছে যে, তোমার টাকার জন্য তোমার সন্তান স্কুলের বেতন দিতে পারছে না, তোমার বৃদ্ধ মা-বাবা ওষুধ কিনতে পারছে না এই কথাগুলো যেন তার কানে বাজতেই থাকে। যার জন্য সে তার কাজ ছাড়াও বাড়তি কাজ করে যেন তারা হতাশ না হয় বা যত টাকা খরচ করে ঋণ নিয়ে সে বিদেশ এসেছে তা পরিশোধ করার আগ পর্যন্ত তার যেন কোনো নিদ্রা নেই। সে কাজ করতেই থাকে তার মতো করে। সেই কাজ করার মধ্য দিয়েই মনে পড়ে দেশের কথা, দেশের মানুষজনদের কথা, আরো মনে পড়ে চেনা পরিচিত কিংবা অচেনা অপরিচিত দেশের পথ-ঘাটের কথা। প্রবাসীদের সুখ-দুঃখের কথা যদি বলি তবে আমি বলব তাদের কোনো সুখ নেই বরং দুঃখেরও কোনো শেষ নেই। কেননা তারা না ঘুমিয়ে, সময়মতো না খেয়ে, ক্ষুধার্ত পেট নিয়ে দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। তবে তারাও সুখের কাঙাল। তারাও সুখ চায়। আর তারা তখনই সুখ পায় যখন কিনা তারা প্রবাস থেকে নিজের দেশে কিছু নিয়ে আসে বা প্রিয় মানুষদের হাতে তুলে দিতে পারে তাদের কষ্টের টাকা। তারা তখন আনন্দ পায়, সুখে আত্মহারা হয়ে ওঠে। তাদের কাছে তখন মনে হয় তাদের প্রবাস জীবন সার্থক। সার্থক হয়ে উঠবারই কথা, তারা যে কারণে দেশ ছেড়ে প্রবাসে গিয়ে কষ্টের জীবন বেছে নিয়েছে সে জীবনের যে মূল কথা ছিল তাদের বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলা, স্ত্রী-সন্তানের জন্য ভালোভাবে জীবন কাটানোর জন্য কিছু সময় নিয়ে আসা এটাই যেন তাদের কাছে বড় পাওয়া বলে মনে হয়। কেননা তারা তো এটার জন্যও বিদেশে দেশ ছেড়ে। প্রবাসে কী কেউ সুখের জন্য যায়? না প্রবাসে কেউ নিজের সুখের জন্য যায় না বরং অন্যের সুখটা দেখার জন্য প্রবাসে যায় দেশ ছেড়ে। তারা তাদের অর্জিত কাঙ্খিত সম্পদ দিয়ে যখন প্রিয় মানুষগুলোর জন্য প্রিয় কিছু নিয়ে আসে তখন তাদের ভালো লাগে বরং আনন্দ হয় যখন কিনা তারা বুঝতে পারে, দেখতে পারে তাদের প্রিয় মানুষ, কাছের মানুষের আনন্দ তখন তারা রীতিমতো অবাক হয়, বিস্মিত হয়।একজন মানুষ দেশে থেকে যে কোনো কাজ করতে পারে না কিন্তু প্রবাসে গিয়ে যে কোনো কাজ করতে পারে। কেননা তাকে অর্থ উপার্জন করে দেশে বাবা-মায়ের কাছে, স্ত্রী-সন্তানের কাছে পাঠাতে হবে। তখন তারা লোকচক্ষুর লজ্জা আড়াল করে ভাবে যে, আমাকে আমার যে কোনো কাজ করতে হবে এবং করেও। একজন প্রবাসী অন্যের বাসাবাড়ি দেখাশোনা থেকে শুরু করে সুইপারি পর্যন্ত করে। কিন্তু এতে লজ্জাটা কোথায়, এতে তো আনন্দ থাকার কথা, যে আনন্দের কিনা অর্থ উপার্জন করার সক্ষমতা থাকে বা তা পরিবারের মানুষদের মুখে হাসি ফোটানোর মতো বিন্দু পরিমাণ ক্লেদও যেন জমা না থাকে। দেশে যে মানুষটা রিকশা চালিয়ে অর্থ উপার্জন করে সমাজ তাকে অবহেলার চোখে, অনীহার চোখে দেখে, কেননা সে মানুষটা রিকশা চালিয়ে অর্থ উপার্জন করছে। কিন্তু বিদেশে সেই মানুষটা গিয়ে এই একই কাজ করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*