শত বছরের ঐতিহ্য বহনকারী আশেক ভক্তের মিলন ও গ্রামীন লোকজ মেলা

মাইজভা-ার ওরশ শরীফ মহান ১০ মাঘ
শত বছরের ঐতিহ্য বহনকারী আশেক ভক্তের মিলন ও গ্রামীন লোকজ মেলা
রফিক তালুকদার

হযরত গাউছুল আজম সৈয়দ আহমদ উলল্লাহ মাইজভা-ারী(কঃ)এর র্বাষিক ওরশ শরীফ মহান ১০ মাঘ শত বছর পেরিয়ে। ১১৩ তম ওরশ শরীফ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।ওরশ উপলক্ষে প্রতিবছরের মত এ বছরও লক্ষ লক্ষ আশেক ভক্তের সমাগম ঘটে। ১৯০৬ সালে হযরত কেবলা আলম (কঃ)ওফাত হওয়ার পর ১৯০৭ সাল থেকে এই মহান ওরশ শরীফের সূচনা। শত বছরের এতিহ্য বহনকারী এই মহান ওরশ শরীফ যেন জাতী ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলের মিলন মেলা বা প্রেমের মেলা । ১০ মাঘের এই ওরশ শরীফ শুধু আধ্যত্বিকভাবে নয় সামাজিক ভাবে ও অত্যান্ত তাৎর্পয বহন করে। এই মহান ওরশ শরীফ অসংখ্য বৈশিষ্ট,ধারা,দিক নিয়ে উদযাপিত হয়। কয়েকটি দিক তুলে ধরার মাধ্যমে এই লেখাটি লেখার প্রয়াস।
প্রস্তুতি
ওরশ শরীফ সফল ও সুন্দর ভাবে উদযাপন করার জন্য আওলাদেপাকগন র্পূব থেকেই প্রশাসন,স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও আশেক ভক্তদের সাথে সমন্বয় করে বিভিন্ন র্কমসূচীর মাধ্যমে প্রস্তুতি গ্রহন করে।
রওজা শরীফ গোসল ও গিলাফ চড়ানো
ওরশ শরীফের একদিন আগে আওলাদেপাকগনের উপস্থিতিতে মাজার শরীফ আতর সুগন্ধি গোলাফজলের মাধ্যমে গোসল করিয়ে নতুন গিলাফ চড়ানো হয়, পুষ্প র্অপন ও জিকির মিলাদ মাহফিল মোনাজাতের মধ্যে দিয়ে ওরশ শরীফের র্কাযক্রম শুরু হয়।এতে হাজার হাজার আশেক ভক্ত ও উপস্থিত থাকে।
আলোকসজ্জা ও ডেকোরেশন
ওরশ শরীফ উপলক্ষে হযরত গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারীর রওজাসহ মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফের সকল রওজা ও মঞ্জিল সমূহ আলোকসজ্জা,ফুলে দিয়ে সাজানোসহ স্ব স্ব মঞ্জিলস্থানে আশেক ভক্তের সুবির্ধাতে ও রান্না করার জন্য মনোরম ডেকোরেশন করা হয়।
দলে দলে
ওরশ শরীফের কয়েকদিন আগে থেকে দেশ বিদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দলে দলে আশেক ভক্তগন আসতে শুরু করে।নারায়ে তাকবীর,আল্লাহুআকবর।নারায়ে রেছালত, এয়া রাছুলুল্লাহ(দঃ)নারায়ে গাউছিয়া, এয়া গাউছুল মাইজভাণ্ডারী(কঃ) গাউছুল মাইজভাণ্ডারী(কঃ) মারহাবা মারহাবা ইত্যাদি তাকবীর দিয়ে,ঢোল বাজনা বাজিয়ে,মাইজভান্ডারী গান গেয়ে গেয়ে ওরশ শরীফে আসে। ওরশ শরীফের দিন অগনিত আশেক ভক্তের জনসমুদ্র পরিনত হয়।
র্টামিনাল
বাস,কার,মাইক্রো.পিকআপ,সিএনজি,ট্রাকসহ হাজার হাজার বিভিন্ন যানবাহনযোগে আশেক ভক্ত জায়েরীনগন ওরশ শরীফে আসে। চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়িসড়ক,মাইজভাণ্ডার-নানুপুর সড়কের দুপাশ,এলাকার বিভিন্ন স্কুল কলেজ মাঠ,জমিন,ও মঞ্জিল র্কতৃপক্ষের ব্যবস্থাপনায় র্নিধারিত র্পাকিং স্থানসহ কয়েক কিরোমিটার এলাকা জুড়ে অস্থায়ী র্টামিনালে পরিণত হয়।
হাদীয়া মিছিল
আশেক ভক্তগন ওরশ শরীফে আসার সময় গরু,মহিষ,গয়াল,মূরগী,উঠ,ছাগল,টাকা পয়সা,চাউলসহ সাধ্যনুযায়ী বিভিন্ন হাদীয়া নিয়ে আসে।হাজার হাজার গরু মহিষের অন্যন্য র্দৃশ্য পরিলক্ষিত হয়।
ইবাদত বন্দেগী
হযরত গাউছুল আজম মাইজভন্ডারীর রওজা শরীফ,হযরত বাবা ভান্ডারীর রওজা শরীফ,হযরত শাহানশাহ হক ভান্ডারীর রওজা শরীফসহ অন্যান্য রওজা শরীফে ওরশ শরীফে আগত ভত্তরা কোরানআন শরীফ,অজীফা শরীফ তেলাওয়াত,তছবীহ তাহলীম পাঠ,জিকির আজগার মিলাদ মাহফিলের মাধ্যমে ইবাদত বন্দেগীতে রত থাকে। এতে অত্যান্ত র্ধমীয় পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
ঢোল বাজনা
ওরশ শরীফ উপলক্ষে পুরো মাইজভান্ডার শরীফ জুড়ে সাপ্তাহব্যাপী ব্যাণ্ড দল,বাদকরা মাইজবাণ্ডারী সুরে ঢোল বাজনা বাজিয়ে মাতিয়ে রাখে।কোন কোন দল রওজা শরীফে, কোন কোন দল আশেক ভক্তের ক্যাম্পে,কোন কোন দল পশু হাদীয়া আনা নেওয়ায়,ঢোল বাজনা বাজিয়ে আশেক ভক্তের মাঝে তালে তালে এস্কের জোয়ার তুলে।
ক্যাম্প
স্ব স্ব মঞ্জিল র্কতৃপক্ষ আশেক ভক্তদের প্রতিটি শাখা বা এলাকাবিত্তিক ক্যাম্পের ব্যবস্থা করে। ক্যাম্পে বসে দূর দূরান্ত থেকে আগত আশেক ভক্তরা বিশ্রাম নেয়।এছাড়া ক্যাম্পে ক্যাম্পে মাইজভান্ডারী র্দশন আলোচনা,ঢোল বাজনা,মাইজভাণ্ডারী গানের আসর,ছেমা মাহফিল অনুষ্ঠিত হয় ।
গানের আসর
দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে খ্যাতনামা,অসংখ্য কাওয়াল,বাউল,মরমী শিল্পীবৃন্দ ওরশ শরীফ উপলক্ষে মাইজবণ্ডার শরীজ সমবেত হয়। তারা মাইজভাণ্ডার জুড়ে কেউ কেউ আশেক ভক্তের ক্যাম্পে,কেউ কেউ মঞ্জিলে,মঞ্জিলে,কেউ কেউ রওজা শরীফে ভক্তি ও শ্রদ্ধাসহকারে মাইজভণ্ডারী,মরমী,মারফতী,বাউল গান পরিবেশন করেন।শ্রোতারা ও সুরের র্মুছানায় আবেগ আপ্লুত হয়ে শুনতে থাকে।
জবেহ্ ও রান্না
জবেহ ও রান্না কাজে নিয়োজিত থাকে শত শত কসাই ও বাবুচি। একসাথে দশ বারটি গরু মহিষ জবেহ করে এক ঘন্টার ভিতর রান্না করার উপযোগি করে বড় বড় হাঁড়িতে একসঙ্গে শতাধিক চুলায় ভাতসহ রান্না করা হয়।এই প্রক্রিয়ায় শতশত গরু মহিষ জবেহ করার মাধ্যমে তাবরুকের ব্যবস্থা করা হয়।
লোকজমেলা
মহান ১০ মাঘ কে কেন্দ্র করে মাইজভাণ্ডার এলাকায় বসে সাপ্তাহব্যাপী গ্রামীন বা লোকজ পণ্যের মেলা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিভিন্ন ব্যবসায়ীরা মেলায় ব্যবসা করতে আসে। রকমারী খাবার,বিভিন্ন পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসে।মেলায় পোষাক,খেলনা,প্রসাধনী সামগ্রীসহ গৃহস্থের প্রয়োজনীয় বাঁশ বেত,মাটির,লোহার তৈরী জিনিসপত্র পাওয়া যায়।তাই এলাকার বউ ঝিয়েরা ও এই মেলার অপেক্ষায় থাকে ঘরের প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনার জন্য।
মূলা
মহান ১০ মাঘ ওরশ শরীফের অন্যতম আর্কষন মূলা। স্থানীয় ও আশেপাশের এলাকা থেকে চাষীরা তাদের উৎপাদিত বড় বড় আকারের মূলা মেলায় বিক্রি করার জন্য নিয়ে আসে।কারন মেলায় মূলা ভাল বিক্রি হয়।নাজিরহাট থেকে শুরু করে মাইজভাণ্ডারশরীফ মেলা র্পযন্ত মূলা বিক্রি চোখে পড়ার মত। এক একটি মূলা দুই তিন হাত র্পযন্ত লম্বা ও পাঁচ ছয় কেজি ওজনের র্পজন্ত হয়। আগত আশেক ভক্তরা মাইজভাণ্ডার শরীফ এলাকার মূলা সবজি হিসেবে এবং হযরত গাউছুল আজম মাইজবাণ্ডারীর পাক কালাম সর্ম্পকিত দরবারে মাংস মূলা তবরুকের বিশেষ প্রচলন থাকায় নিয়ত করে এই মূলা নিয়ে যায় আশেক ভক্তগন।
সেচ্ছাসেবক দল
ওরশ শরীফে আগত আশেকভক্তের নিরাপত্তা ও আইনশৃংঙ্খলা রক্ষায় আইনশৃংঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি হাজার হাজার সেচ্ছাবেক যা চোখে পড়ার মত পরিলক্ষত হয়।স্ব স্ব মঞ্জিলের পরিচয় ভিত্তিক পোষাক টুপি পড়ে হাতে লাটি বাঁসি নিয়ে তারা দায়িত্ব পালন করে।তবে তাদেরএই দায়িত্ব প্রশাসনের অনুমতিতে।
আখেরী মোনাজাত
ওরশ শরীফের দিন রাতে মাইজভণ্ডারী র্দশন ও জীবনী আলোচনা,মাইজভান্ডারী গান ও চেমা মাহফিল,মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।পরে দেশ,জাতী,বিশ্ব ও আশেক ভক্তের মঙ্গল কামনায় স্ব স্ব মঞ্জিলের প্রধানগণ আখেরী মোনাজাত পরিচালনা করেন।
তাবারুক বিতরন
আখেরী মোনাজাত শেষে ভাত,মাংস,নলারজুলসহকারে আশেক ভক্তের বহু প্রত্যাশিত নেয়াজ বা তাবরুক বিতরন করা হয়।রোগ শোক মুক্তি,সারা বছর হালাল রিজিকের আশাসহ নানা নিয়ত করে আশেক ভক্তগণ এই মহান তাবারুক তৃপ্তি সহকারে মন ভরে খায়।
চেহেলাম শরীফ ও বিদায়
ওরশ শরীফ শেষে আশেক ভক্তগন গন্ত্যব্য স্থলে ফিরে যেতে থাকে।তবে অনেকে হাজারো রকমের ফলাদি ও খাদ্য দ্রব্যাদি মিশ্রিত ফলাহার তাবারুক এর ফাতেহা চেহেলাম শরীফ শেষে ফিরে। প্রত্যেকে হযরত গাউছুল মাইজভান্ডারীর (কঃ)ফয়েজ বরকত কামনা করে,পরর্বতী আবারো আসার আশা পোষন করে কয়েকদিন মাইজবাণ্ডারশরীফ অবস্থানের মধুময় স্মৃতি নিয়ে বিদায় নেয়।পরিশেষে আমি অধম ও সকল ভুল ত্র“টির ক্ষমা চেয়ে মহান ১০ মাঘের উছিলায় হযরত কেবলা আলমের অফুরন্ত দয়া মেহেরবানি কামনা করছি ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*