“ইউ আর মাই বেস্ট ভ্যালেনটাইন এভার  “

একটি সত্য ঘটনার উপর লেখা ভালবাসা দিবসের গল্প  
“ইউ আর মাই বেস্ট ভ্যালেনটাইন এভার  “
এক রাতের বউ
 জাহাঙ্গীর বাবু
প্রচন্ড রোদ পড়ছে।পিপলস পার্কের ট্রাফিক সিগনাল, সকালে কাজের ঝামেলা ছিল সৈকতের। প্রায় দুপুর বারোটা। লাঞ্চের সময় হয়ে এলো। ঘড়ির কাঁটা দেখছে বার বার। কোমল কন্ঠের ডাক,
“এক্সকিউজ মি ,সরি টু ডিস্টার্ব ইউ ,
ও কে নো প্রবলেম সৈকতের উত্তর ,হাউ কেন আই হেল্প ইউ ,
সরি আই থিঙ্ক ইউ আর অন ডিউটি
ইটস ওকে নাও ইটস মাই লাঞ্চ টাইম।
এক চুয়েলি আই এম লুকিং ফর পোস্ট অফিস।
নো  প্রবলেম ইউ কেন ফলো মি, প্লিজ,
সিগনালের পাশেই প্রজেক্টের বাউন্ডারী ওয়াল ছোট্ট একটি দরজা খুলে সেফটি হেলমেট টি রেখে আসলো। সৈকত বলল লেটস গো।হাটতে  শুরু করে দু জন , কথার মাঝে মাঝে সৈকত দেখছিল ছিপ চিপে গড়নের, টপস পরা হাই হিল দিয়ে ঠক ঠক করে হেঁটে চলছে, মনে হয় যেন কত দিনের পরিচিত। মেয়েটি তার পরিচয় দেয় ,লি ওয়াং জাপান থেকে সরকারী কাজে এসেছে সিঙ্গাপুরে ,সৈকতের পরিচয় জানতে চায় , সৈকত জানায় সে এক জন বাংলাদেশী ,এখানে একটি প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিতে সুপারভাইজার হিসাবে কর্মরত আছে। দু জনে পৌঁছে যায় পোস্ট অফিসের বারান্দায়। সৈকত পোস্ট অফিস  দেখিয়ে দিয়ে ফিরে আসতে চাইলে ধন্যবাদ জানায় ওয়াং।
রেস্টুরেন্টের দিকে পা বাড়াতেই ওয়াং  এর ডাক ,
হ্যালো ,পিছন ফিরে তাকায় সৈকত। কাছে এসে বলে যদি কিছু মনে না করো একটু দাড়াবে। পাঁচ মিনিটেই আমার কাজ শেষ হবে। সৈকত জানায় তার কোন অসুবিধে নেই। সৈকতের প্রায় তিন বছরের পুরানো প্রজেক্ট কাজ শেষের পথে। এই চায়না টাউনের প্রতিটি অলি গলি তার পরিচিত,  পোস্ট অফিসের কাছের একটি জুতা দোকানে প্রবেশ করে, বিভিন্ন ডিজাইনের সু দেখছে সৈকত।নরম হাতের স্পর্শে ফিরে তাকায়,মিষ্টি একটি হাসি দিয়ে ওয়াং সৈকতকে বলে ধন্যবাদ তোমাকে, চল কোথাও বসে লাঞ্চ করা যাক। ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড।
সৈকতের জবাব,ইটস মাই প্লেজার।
দুজনেই চলে আসে ফুড কোর্টে।কথা হয় দুজনার। পরিবার  সম্পর্কে জানায় একে  অপরকে।ওয়াং জানায় সৈকত তার দেখা এক বেষ্ট পুরুষ। সে ভাবতে পারে না মানুষ এত উদার ,বিশ্বাসী আর কেয়ারিং হয়।
স্বার্থের পৃথিবীতে ব্যস্ততম  জীবনে মানুষের এত সময় কোথায়? দুজনে দুপুরের খাওয়া শেষ করে সৈকত বার বার দেখছিল তার মোবাইলের দিকে। ওয়াং জানতে চায় সমস্যা কি ? সৈকত জানায় ,তাকে এখন যেতে  হবে পাঁচ মিনিট বাকি। কাজে যোগ দিতে হবে। মনটা খারাপ হয়ে যায় ওয়াং এর, বিনয়ের সাথে বলে,দেখো তোমাকে আমি অনেক কষ্ট দিয়েছি,তুমি অনেক ভালো ,যদি কিছু মনে না কর একটি অনুরোধ করব ,রাখবে ,সৈকত জানায় চেষ্টা করবে।
আমার অফিসিয়াল কাজ শেষ। আমি কাল পাঁচটায় চলে যাব। আমি চাই, আমার হাতে
 যে টুকু সময় আছে তার সবটুকু সময় তুমি আমার পাশে থাক। তোমার ডিউটি কয়টায় শেষ হবে ? সৈকতের জবাব,এই ধর আট টায়;ঠিক আছে আজ রাত আট টায় ওই সিগনালেই যেখানে আমাদের দেখা হয়েছিল সেখানে অপেক্ষা করব। সৈকত আসি বলে পা বাড়ায়  কর্ম স্থলের দিকে।
তাকিয়ে আছে ওয়াং ,এক বারের জন্য পিছনে ফিরে তাকায় না সৈকত,কি হয়ে গেল নিজেও বুজতে পারছে না ,একটা ঘন্টা কি করে কাটলো তাই ভাবছে!
দুপুরের পর মিটিং,আর এফ আই পেপার সাবমিশন, নানা ঝামেলায় কাটে। বিকেলে চা বিরতিতে চায়ের কাপে চুমুক দেয় ,চায়ের কাপে ভেসে উঠে ছিপ ছিপে গড়নের ওয়াং এর মায়াবী মুখায়ব।মাথা থেকে যাচ্ছে না ওয়াং। চিনে না ,জানে না জাপানের একটি মেয়ে কিনা জেকে বসেছে মাথার ভিতর .কাজে মনোযোগ দিতে পারছে না।
বেজে উঠে মোবাইল ফোন। রিসিভ করতেই ” আব্বু ফোন কর ” সৈকতের ছোট ছেলের ফোন।  বাড়িতে ফোন করে। ছেলে তার  ভারী দুষ্ট। সারাক্ষণ বড়ো মানুষের মত কথা বলবে আর বড় বোনদের নামে ,মায়ের নামে নালিশ করবে,ভালোবেসে বিয়ে করেছিল সৈকত। জীবনে তেমন কোন কথা নেই যা তার স্ত্রী ইরা’ র সাথে শেয়ার করে নি,তাই আজ দুপুরের ঘটনাটা ও বাদ পড়ল না। কথার ছলে কিছু ফোড়ন কাটলেও বলল  রাতে দেখা করতে   চেয়েছে দেখা কর হয়তো শপিং টপিং করবে তোমায় নিয়ে,তুমি তো হ্যান্ডসাম। আঞ্চলিক ভাষায় ইরাকে বলে” প্যাঁচ বাইধে গেলে কি করবো নে?
তত ক্ষনে কাজের ব্যস্ততা দেখিয়ে লাইন কেটে দেয় ইরা।সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। কোন কাজে মন বসছে না, কলিগ কে বলে, সাড়ে সাতটার দিকে বের হয়ে যায় সাইট থেকে। চলে আসে চায়না টাউন এম আর টি তে। গন্তব্য সেরাঙ্গুন, সেখানে তার বন্ধু সীমান্তের সাথে দেখা করবে ওরা প্রায় এক সাথে ডিনার করে। সিঙ্গাপুরের তাছাড়া  মোস্তফা সেন্টারে একটু আড্ডা আর আসা  যাওয়ার পথের নানান দেশের নারীদের দেহ কাঠামো নিয়ে বৈজ্ঞানিক ব্যাখা না দিলে ভালো লাগে না  দুই বন্ধুর। সে সাথে দেশের রাজনীতি!এই করে রাত দশটা বারোটা পর্যন্ত আড্ডা  চলে। কার্ড পাঞ্চকরে প্লাট ফর্মে ঢুকতেই মনে পড়ে ওয়াং এর কথা। দাড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। যাবে কি যাবে না!  দ্বিধা আর দ্বন্ধ! মনের অজান্তেই এম আর টি চড়ে  ফিরে আসে  সিগনালে পিপলস পার্ক চায়না টাউনে। মাই গড,দাড়িয়ে আছে ওয়াং, অপেক্ষায় সৈকতের! সেই পতলা গোলাপী ঠোঁটে হাসির রেখা। দূর থেকে সৈকত কে দেখে এগিয়ে আসে। তেমন কোন কথা বলে না ,সৈকত জানতে চায়, কোথায় যেতে চায় ওয়াং ,ওয়াং জানায় সিঙ্গাপুর এর পূর্বে বেশ কয়েকবার এসেছে ,দেখার বাকি নেই কিছুই। তাহলে শপিং ,নো। আসলে আমি তোমার সাথে কিছুটা সময় থাকতে চাই। হাটতে থাকে দুজন। ওয়াং যে দিকে যাচ্ছে মন্ত্র মুগ্ধের মত  সৈকতের পা ও চলছে সে দিকে।চলে আসে রিভার ভ্যালি লেকের পাশে। সৈকতের আবার চাইনিজ,থাই,মালয় সব ধরনের খাবার এর অভ্যাস আছে, দুজন একটি ছাতার নিচে বসে মৃদু আলোয় রাতের খাবার সেরে নেয়।
 রাত প্রায় বারো টা।সৈকত উঠতে চায় ,ওয়াং কি বলবে, তাও ভাবতে থাকে।সৈকতের আন ইজিনেস, ওয়াং জানতে চায় কোন সমস্যা।  বুজেছি ফিরতে হবে তাইতো।ওকে লেটস মুভ, সৈকত বিদায় নিতে চাইলে ওয়াং বলে আমাকে পৌঁছে দিবে ,আমি জানি তুমি না করতে পারবে না। যত টুকু আন্দাজ করছি  তোমার চরিত্রে না শব্দ টা কমই আছে, ইউ নো হাউ টু মেনটেইন কার্টেসি।
হোটেলের দরজায় এসে ওয়াং বলে একটু বস, সৈকত রুমে প্রবেশ করে আলো আধারি পরিবেশ। কেমন যেন মাদকতা রুমটার মধ্যে।সৈকতকে বসতে বলে ওয়াস রুমে যায় ওয়াং,ফিরে আসে সাদা ফিন ফিনে একটি নাইটি পরে।যার মধ্যে আধারি পরিবেশের মাঝেও লাল রংয়ের বক্ষ বন্ধনী সৈকতের দৃষ্টি গোচরে স্পস্ট। সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসে। সৈকতের আর না বুঝার অবকাশ নেই। উঠে দাড়ায়। পা বাড়ায় দরজার দিকে। হাত চেপে ধরে  ওয়াং, জড়িয়ে ধরে পেছন থেকে সৈকতকে আর বলে আমি জানি তুমি বিবাহিত ,তুমি চাইছ না, আমি যা চাইছি। কিন্তু আমি এই জন্য তোমাকে দায়ী করছি না। করবনা।আজ যদি আমি তোমাকে একান্তে না পাই আমি মরে যাব। আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি। আমি জানি এই ভালবাসার কোন অন্ত নেই। কোন ফলাফল নেই ,এই টুকু মিনতি আজ আর কিছুটা সময় আমাকে ভিক্ষা দাও।
 হে বাংলা বালক আমাকে নিরাশ করনা ,হে সুদর্শন তুমি আমাকে ফিরিয়া দিও না, কথা বলার সাথে সাথে ওয়াং এর অঙ্গ প্রতঙ্গ থেমে ছিল না তাই সৈকত আর ধরে রাখতে পারল না নিজেকে, হারিয়ে গেল জাপানের গিরি পথের সুখের রাজ্যে।ভোর পাঁচটা, সৈকতের বুকের উপর শুয়ে আছে ওয়াং, সৈকত সরাতে গিয়ে সরাতে পারে না ওয়াংকে। যেন এক ছোট্ট  শিশু। কিছুক্ষণ পর  এলার্ম   বেজে উঠলো ওয়াং এর মোবাইলে। চোখ মেলে বলল, এলার্ম দিয়ে রেখেছি ,আমি চাই না আমার জন্য তোমার কাজের ক্ষতি হোক।
সৈকতের মুখে কোন কথা নেই, কি যেন এক অপরাধ বোধ তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে, ওয়াং এর দৃষ্টি এড়ায় না। গোসল সেরে তৈরী হয়ে দরজা খুলে বের হবে ওয়াং চেপে ধরে হাত সৈকতের চড়া বুকে মাথা রেখে কাঁদে কিছুটা সময়। কান্না থামিয়ে বলে ইউর ওয়াইফ ইজ লাকি। নিজেকে অপরাধী ভেব না। এতে তোমার কোন দোষ নেই। কিছু  না বলে বেরিয়ে যায় সৈকত ওয়াং এর হোটেলের রুম থেকে।
কাজে মন বসছে না রাতের প্রতিটি দৃশ্য চোখে  ভাসছে। আর নিজেকে অপরাধী ভাবছে সৈকত। বিকাল চারটা। অফিসে বসে ড্রয়িং দেখছে মোবাইল বেজে উঠলো। অপরিচিত নাম্বার, হ্যালো ,ইয়েস, ওয়াং ,আই এম ওয়াং ,তুমি কি আসবে শেষ  বারের মতো একটু দেখা দিতে ?
আসছি,তার ইন্ডিয়ান কলিগ মুতু স্বামীকে বাকি সময়টা তার সাইটের খেয়াল  রাখতে বলে ট্যাক্সি নিয়ে হাজির হলো সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি এয়ার পোর্টে।দাড়িয়ে আছে ওয়াং সৈকত কে দেখতেই দুরে থেকে এসে জড়িয়ে ধরল ,আর মাত্র পনর মিনিট বাকি খুব কসে একটি চুমু দিল সৈকতের ঠোটে, বলল, সৈকত তুমি আমর জীবনের শ্রেষ্ট পুরুষ ,তুমি মানুষ নো দেবতা,যদি তুমি বিবাহিত না হতে তোমার কাছে চলে  আসতাম নয়তো তোমাকে নিয়ে যেতাম আমার দেশে। আমি তোমার অলিখিত বউ।আমি তোমার এক রাতের বউ। আমি সুখী আমি ভীষন খুশি তোমাকে কাছে পেয়ে।সৈকত তুমি কি জানো আজ কি দিবস? সৈকত ভাবতে থাকে কি দিবস। আমি বলছি শোন, আজ ভালবাসা দিবস, এই বলে পার্স থেকে বের করে দিল  একটি লাল গোলাপ। যার সাথে বাধা একটি চিরকুট।পাথর হয়ে দাড়িয়ে থাকে সৈকত। শেষ বিদায় নিয়ে চলে যায় ওয়াং। ইমিগ্রেশন থেকে বার বার মুখ ফিরিয়ে দেখছিল ওয়াং।ওয়াং চোখের আড়াল হতেই গোলাপের কাঁটা বিধে হাতে, উফ  বলতেই পড়ে যায় লাল গোলাপ এয়ার পোর্টের ফ্লোরে।সটকে পরে একটি চিরকুট। ফুলটি তুলে নেয়, সে সাথে চিরকুট টি, খুলে দেখতে পায় লেখা আছে “হ্যাপী ভ্যালেনটাইন ডে” ইউ আর মাই বেস্ট ভ্যালেনটাইন  এভার।
সৈকতের বুকটা কেঁপে উঠে চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে কয়েক ফোটা বোবা আর্তনাদের অশ্রু।আজ ও চায়না টাউনের সিগনালে গেলে ভেসে উঠে ওয়াং এর সেই মুখ ,সে হাসি আর চিরকুটের শেষ  লেখা”ইউ আর মাই বেস্ট ভ্যালেনটাইন এভার  “

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*