রক্তের বিনিময়ে, প্রাণের বিনিময়ে বাংলা পায় রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা

রক্তের বিনিময়ে, প্রাণের বিনিময়ে বাংলা পায় রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা

ইঞ্জিনিয়ার জসীম উদ্দিন

ভাষা মানবজীবনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভাষা না হলে মানুষের, সমাজের কাঙ্ক্ষিত বিকাশ ঘটতো না। প্রতিদিন সকালে আমরা যখন চোখ খুলি তখন আমাদের দৃষ্টির সীমানায় মানুষ ছাড়াও ধরা দেয়, বিভিন্ন প্রজাতির পশু-পাখি তথা বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি জগৎ। একটু সচেতন হলেই আমরা শুনতে পাবো মানুষ ও প্রকৃতি জগতের বিচিত্র ভাষা।

আসলে ভাষা মানুষের অস্তিত্বে যেমন বিরাজমান, তেমনি বিরাজমান প্রকৃতির অস্তিত্বেও। তাই তো সবাই নিজের মতো করে কথা বলে বিচিত্র ভঙ্গিমায়, নানা ইশারায়। বলা হয়, ভাষা আছে বলেই পৃথিবী এতো প্রাণচঞ্চল ও আনন্দময়। এই পৃথিবীতে অনেকের কাছেই অনেক সম্পদ নেই, কিন্তু একটি সম্পদ আছে সবার কাছে- সেই সম্পদের নাম ‘মাতৃভাষা’।

মাতৃভাষা নিয়ে আমাদের সুজলা-সুফলা এই জনপদে ঘটে গেছে এক ঐতিহাসিক ঘটনা। যা আর কোনো দেশে ঘটেনি। পাকিস্তানের তদানীন্তন শাসকরা তাদের ভাষা উর্দুকে আমাদের ওপর চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল। তারা বলেছিল, একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। এর প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে পূর্ব বাংলার মানুষ। যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি। রক্তের বিনিময়ে, প্রাণের বিনিময়ে বাংলা পায় রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা।

বস্তুত অন্যায়ের কাছে মাথানত না করার শিক্ষা দিয়ে গেছেন আমাদের ভাষাশহীদরা। আগে ২১শে ফেব্রুয়ারি পালিত হতো ‘শহীদ দিবস’ হিসেবে। ২০০০ সালে জাতিসংঘ দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ২১শে ফেব্রুয়ারি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। এর লক্ষ্য মানুষকে মাতৃভাষার গুরুত্ব সম্পর্কে আরও সচেতন করা।

মাতৃভাষা মানুষের জন্মগত অধিকার, মৌলিক অধিকার। জন্মের পর মায়ের কোলেই শিশু মায়ের ভাষার সাথে পরিচিত হয়। পরে বয়স বাড়ার সাথে সাথে শিশুর মাতৃভাষা শেখার বিষয়টি পূর্ণতা পেতে থাকে। তবে এর জন্য প্রয়োজন হয় শিক্ষার এবং চর্চার। আমরা জানি, শিক্ষা তথা জ্ঞানার্জন ছাড়া মানুষ যোগ্য হতে পারে না, জাতিও এগুতে পারে না। কিন্তু ভাষা ছাড়া কি জ্ঞানার্জন সম্ভব? জ্ঞান বলি, ভাব বলি কোনো কিছুরই প্রকাশ ভাষা ছাড়া সম্ভব নয়। ভাষা এতটাই গুরুতপূর্ণ বিষয়। এ কারণে মহান আল্লাহতায়ালা মানুষকে বিভিন্ন নেয়ামতের পাশাপাশি উপহার দিয়েছেন ভাষার মতো অমূল্য নেয়ামতও। এ বিষয়ে মহাগ্রন্থ আল কোরআনে ভাষা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা বর্ণিত হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে ভাব প্রকাশের জন্য ভাষা শিক্ষা দিয়েছেন।’ -(সূরা আর রাহমান : ৩-৪)

ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে মাতৃভাষা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা উপলব্ধি করা যায় এই আয়াতে, ইরশাদ হচ্ছে, ‘আমি প্রত্যেক রাসূলকেই তার স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি তাদের নিকট পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য …।’ -(সূরা ইবরাহিম : ৪)

পবিত্র কোরআনুল কারিমে আরেকটি আয়াত থেকে একথা স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা যায় যে, পৃথিবীতে এত যে ভাষা তা বৈচিত্র্যের এক অনুপম উদাহরণ। তাই ভাষাকে কেন্দ্র করে মানুষে-মানুষে বিদ্বেষ কিংবা উগ্র জাতীয়তাবাদ কোনো বিবেকবান মানুষের কাম্য হতে পারে না। যেমন পবিত্র কোরআনে কারিমে হয়েছে, ‘এবং তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। এতে জ্ঞানীদের জন্য অবশ্যই রয়েছে নিদর্শন।’ -(সূরা রূম : ২২)

পবিত্র কোরআনের আলোকে আমরা স্পষ্টভাবে জানলাম যে, জ্ঞান ও ভাব প্রকাশের জন্য ভাষার কোনো বিকল্প নেই। তাই ভাষা চর্চা মানুষের মৌলিক দায়িত্ব ও অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। আর ভাষা চর্চার ক্ষেত্রে প্রথমেই দৃষ্টি দিতে হবে মাতৃভাষার প্রতি। কারণ জীবনের শুরুতে কোনো কিছু পরিষ্কারভাবে বুঝতে হলে মাতৃভাষার সাহায্য নেয়াটাই হয় সহজ ও স্বাভাবিক। তাই বলে মাতৃভাষার চর্চা করতে গিয়ে, মাতৃভাষাকে ভালোবাসতে গিয়ে অপর কোনো ভাষার প্রতি যেন আমাদের মনে না জাগে কোনো বিদ্বেষ। কারণ প্রতিটি মানুষের কাছে তার মাতৃভাষা প্রিয় এবং সেই ভাষায় কথা বলা তার জন্মগত অধিকার। তাই ভাষাভিত্তিক বিদ্বেষ কিংবা ভাষাভিত্তিক উগ্রজাতীয়তাবাদ কোনো মানবিক বিষয় হতে পারে না।

একটি কথা কিন্তু স্পষ্ট, বাংলাভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে প্রধান দাবিটি ছিল সর্বস্তরে মাতৃভাষার প্রতিষ্ঠা। কিন্তু সেই দাবির বাস্তবায়ন এখনো পুরোপুরি হয়নি। দেশের বিভিন্ন অফিস-আদালতে ইংরেজি ভাষা, শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন মাধ্যমে ইংরেজি, আরবি ও উর্দূর মিশ্রণ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এটা কাম্য নয়। তবে, ভাষা শিক্ষার জন্য ভিন্ন ভাষার অনুশীলন দূষনীয় নয়।
বিদ্যমান বাস্তবতায় আমাদের কথা হলো, সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠা করার প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন ধরেই অনুভূত হচ্ছে। সেই সঙ্গে প্রয়োজন তীব্র হচ্ছে, আইন-আদালত, চিকিৎসা সেবা ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তিসহ নানাবিধ সেক্টরে বাংলার সম্পৃক্ততা বাড়ানোর বিষয়ে গবেষণা শুরু করার। অবশ্য এসবক্ষেত্রে কিছু কাজ হয়েছে, কিন্তু তা খুব নয়। এসব বিষয়ে কাজ করলে জাতি যেমন উপকৃত হবে, তেমনি ভাষার জন্য যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাদের আত্মত্যাগও হবে স্বার্থক এবং কাজটি হবে বাস্তবভিত্তিক। আশা করি বিষয়টি সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবাই আন্তরিকভাবে উপলব্ধি করবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*