দালালি শুরু করেছে নারীরাও

দালালি শুরু করেছে নারীরাও

পুরুষের পাশাপাশি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নারী দালালরাও সক্রিয় রয়েছে। তারা বিভিন্ন প্যাথলজি-ক্লিনিকের প্রতিনিধি হয়ে রোগী ভাগানোর কাজে জড়িত। অ্যাপ্রোন পরে হাসপাতালে ঢুকে বাচ্চা ও ওষুধ চুরির মতো ঘটনাও ঘটাচ্ছে তারা।

জানা গেছে, হাসপাতালে এক ডজন নারী দালালি করছে। তারা হাসপাতালের আশপাশে গড়ে ওঠা অর্ধশতাধিক বেসরকারি প্যাথলজি-ক্লিনিকের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে। যেসব নারী দালালি করে, তারা চিকিৎসক-নার্সের বেশভূষায় হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে নির্বিঘ্নে ঢুকে যায়। এজন্য অনেক সময় নিরাপত্তারক্ষীরা তাদের চিনতে পারেন না।পাশাপাশি ৩০ থেকে ৪০ জন পুরুষ দালালদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ রোগীরা। তারা হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে নেয়। ভালো মেশিনে স্বল্প দামে পরীক্ষার কথা বলে বেসরকারি প্যাথলজিতে নিয়ে যায় রোগীদের।

বৃহত্তর চট্টগ্রামবাসীর চিকিৎসার শেষ আশ্রয় এ হাসপাতাল। প্রতিদিন গড়ে আড়াই থেকে তিন হাজার রোগী এ হাসপাতালে ভর্তি থাকে। জরুরি চিকিৎসা নিতে আসেন আটশ থেকে নয়শ রোগী। এ হাসপাতাল ঘিরে গড়ে ওঠা ক্লিনিক-প্যাথলজি মালিকরা দালাল নিয়োগ করে নিজেদের ব্যবসা পরিচালনা করছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কর্তব্যরত চিকিৎসকদের বিশেষ সুবিধা দিয়ে প্রতিদিন সকাল থেকে প্রায় সন্ধ্যা পর্যন্ত শতাধিক দালাল হাসপাতাল চষে বেড়ায়। ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিকের প্রতিনিধি হয়ে তারা কাজ করে।

অন্যদিকে রোগীরা কোন ক্লিনিকে যাবে, তা একশ্রেণির অসাধু চিকিৎসক ঠিক করে দেয়। ব্যবস্থাপত্রে ওই ক্লিনিকের নাম তারা লিখে দেয়। কিছু টেস্ট চমেক হাসপাতালে করা সম্ভব হলেও চিকিৎসক, ওয়ার্ডবয় ও নার্সরা এখানে করাতে রোগীর আত্মীয়-স্বজনদের নিরুৎসাহিত করে। এ ছাড়া দালালদের হাসপাতালে ঢুকতে সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে আনসার সদস্যদের বিরুদ্ধে।

চমেক হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, আলাদা আলাদা জোনে ভাগ হয়ে ক্লিনিক-প্যাথলজির নিয়োগকৃত দালালরা অবস্থান করছে। আউটডোরে বেশীর ভাগ মহিলা দালাল। ভুক্তভোগীরা জানান, দালালদের দৌরাত্ম্যে রোগী ও রোগীর স্বজনেরা দিশেহারা। যেখানে রোগী, সেখানেই হাজির হয়ে যায় দালালেরা।

মেডিসিন বিভাগে চিকিৎসাধীন রফিকুল আলমের স্ত্রী সাবিনা খাতুন বলেন, তার স্বামী বেশ কয়েক দিন ধরে পেটের ব্যথায় ভুগছিলেন। সোমবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) রাতে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ভর্তির পর চিকিৎসক রোগী দেখে এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাম করতে বলেন।

‘ব্যবস্থাপত্র পাওয়ার পর এক লোক এসে সেটি দেখে বলেন, হাসপাতালের এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন নষ্ট। বাইরে থেকে করতে হবে। সেখানে আমার পরিচিত মানুষ আছে, টাকা কম নিবে।’

সাবিনা খাতুন বলেন, এখানে কিছু চিনি না। ওই লোকের সঙ্গে যেয়ে পরীক্ষা করিয়ে আনি। পরে জানতে পারি হাসপাতালের মেশিন ভালো এবং বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে দ্বিগুণ টাকা খরচ হয়েছে।

হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির এক কর্মকর্তা জানান, দালালরা ক্লিনিক-প্যাথলজির মালিকদের পক্ষ থেকে কিছু চিকিৎসককে খাবার সরবরাহ করে থাকে। এ ছাড়া প্রতি পরীক্ষার বিপরীতে নির্দিষ্ট হারে কমিশন পান চিকিৎসকরা। এজন্য তাদের ইন্ধনে দালালরা অবাধে হাসপাতালে ঢোকার সুযোগ পাচ্ছে।

হাসপাতালের একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা দাবি করেন, দালালমুক্ত করতে একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও রাজনৈতিক চাপে সম্ভব হচ্ছে না। কর্তৃপক্ষ দালাল ধরে পুলিশে সোপর্দ করলেও প্রভাবশালী চক্রের চাপে তাদের তাৎক্ষণিক ছাড়িয়ে নেওয়া হচ্ছে। রোষানলে পড়ার ভয়ে ওই কর্মকর্তা নাম প্রকাশ করতে চাননি।

দালাল প্রতিরোধে একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে জানিয়ে হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আখতারুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, প্রতি ওয়ার্ডে আনসার সদস্য রয়েছে, হাসপাতালজুড়ে বসানো হয়েছে ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা। পাশাপাশি গেটপাস চালু রয়েছে।

উল্লেখ্য, কয়েক বছর আগে হাসপাতালের গাইনি বহির্বিভাগ থেকে পাঁচ নারী দালালকে আটক করা হয়। আটকরা হলেন- রাজিয়া বেগম (৪৫), সোভা দে (৫০), প্রমিতা দাশ (৪০), জাহানারা বেগম (৪০) ও মিতু রানী চৌধুরী (৫০)।

মঙ্গলবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) সকালে হাসপাতালের বহির্বিভাগ থেকে মো. মিজান (২১) ও মো. সুজন (২৮) নামের দুই দালালকে আটক করে পুলিশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*