নওগাঁর মান্দায় কলেজ পড়ুয়া ছাত্র ইমনের পরিত্যাক্ত পলেথিন থেকে পেট্রল তৈরি

নওগাঁর মান্দায় কলেজ পড়ুয়া ছাত্র ইমনের পরিত্যাক্ত পলেথিন থেকে পেট্রল তৈরি

মাহবুবুজ্জামান সেতু, নওগাঁ প্রতিনিধি : নওগাঁর মান্দায় পরিত্যাক্ত পলেথিন থেকে নিজস্ব প্রযুক্তিতে ইমন পেট্রল,ডিজেল,অকটেন, কেরোসিন এবং গ্যাস উৎপাদন করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। তার এমন উদ্ভাবনে এলাকাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

গত ২১ ফেব্রুারিতে একই উপজেলার চৌবাড়িয়া বাজার এলাকার হোসেনপুর গ্রামে ইদ্রিস আলী নামের একজন ব্যাক্তিও পরিত্যাক্ত পলেথিন থেকে পেট্রোল তৈরী করে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্ট করেছিলেন। যে সংবাদটি বিভিন্ন প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক্স মিডিয়াতে ফলাওভাবে প্রচারিত হয়।

মানুষের যান্ত্রিক জীবনে জায়গা দখল করেছে পলিথিন ও প্লাস্টিক। পলিথিনের স্থায়িত্ব বেশি। সহজে পচন ও পুড়িয়ে ফেলা সম্ভব হয় না। অল্প বাজার সহজেই পলিথিনে বহন করা সম্ভব। কিন্তু কাজ শেষে পলিথিনের স্থান হয় ডাস্টবিনে। আর সেই পরিত্যক্ত পলিথিনকে কাজে লাগিয়েছেন নওগাঁর মান্দা উপজেলার ১৯ বছর বয়সী ইবনে শাহরিয়ার ইমন। পলিথিনকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় কাজে লাগিয়ে তা থেকে তৈরি করেছেন জ্বালানি পদার্থ, গ্যাস ও ফটোকপি মেশিনের কালি।

ইবনে শাহরিয়ার ইমন (১৯) উপজেলার নুরুল্যাবাদ ইউনিয়নের নুরুল্যাবাদ (মীরপারা) গ্রামের মোস্তাক আহম্মেদের ছেলে। তিনি বর্তমানে রাজশাহী শহীদ এ ,এইচ, এম কামরুজ্জামান সরকারি ডিগ্রী কলেজের এইচ এস সি ২ বর্ষের বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র। তার বাবা পেশায় একজন কৃষক। মা আফরোজা বেগম একজন গৃহিনী। দুই বোন মোনালিশা আক্তার ভিয়া এবং নিশাত মনি মৌ স্কুল পড়ুয়া ছাত্রী।

কলেজ পড়ুয়া ছাত্র ইমন তার নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি করেছেন একটি তেল রিফাইনারি মেশিন। যা দিয়ে পেট্রল,ডিজেল,কেরোসিন, অকটেন এবং গ্যাস রিফাইন করার পর আলাদা আলাদা পাত্রে সংরক্ষণ করা সম্ভব। তার এ প্রতিভাকে এক নজর দেখতে বাড়িতে ভিড় করছেন এলাকার সব বয়সী নারী-পুরুষ। তার এ উদ্ভাবন এলাকাজুড়ে ব্যাপক কৌতুহলের সৃষ্টি করেছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তার এ প্রতিভা বিকশিত করা সম্ভব বলে মনে করছেন সচেতন এলাকাবাসি।

ইমন বলেন, পরীক্ষামূলকভাবে পলিথিন পোড়াতে গিয়ে আমি লক্ষ্য করি পোড়া পলিথিন থেকে তৈলাক্ত জাতীয় পদার্থ বের হচ্ছে ।

এ ধরণের উদ্ভাবনের কথা আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া বড় ভাইদের কাছে শুনেছি । বিষয়টি নিয়ে গত কয়েক মাস ধরে ভাবছি।

এরপর সেই ভাবনাকে আমি প্রাইলোসাইসিস প্রযুক্তিতে বাস্তবে রূপদান করি। মাত্র আট হাজার টাকা খরচ করে বাজার থেকে তেলের একটি বড় টিনের ড্রাম (ব্যারেল),প্রায় ১০ ফুট স্টিলের সরু পাইপ, বেশ কয়েকটি প্লাস্টিকের বোতল ও কয়েক হাত প্লাস্টিকের ফিতা কিনে কাজ শুরু করি।

প্রথম প্রথম সামান্য সমস্যা হলেও তা শুধরে নিয়ে আমি সাফল্য লাভ করেছি।

তিনি আরো বলেন, নোংরা ও পরিত্যক্ত পলিথিন,পুরাতন টায়ার-টিউব,প্লাস্টিকের বোতল এবং রাবার বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করে তা কেটে টুকরো-টুকরো করে ড্রামের ভিতর ঢুকিয়ে দিই।

এরপর বিশেষ প্রক্রিয়ায় পলিথিনগুলো ড্রামের নিচে খড়ি দিয়ে জ্বাল দেন।

এরপর ড্রাম থেকে নির্গত গ্যাস স্টিলের পাইপ দিয়ে এসে প্লাস্টিকের বোতলের মধ্যে জমা হচ্ছে। পলিথিন থেকে পেট্রল জাতীয় পদার্থ, ডিজেল,অকটেন,কেরোসিন এবং গ্যাস উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। কিন্তু গ্যাস সংরক্ষণ করতে না পারার কারনে তা বর্তমানে তা জ্বালানী হিসেবে ব্যাবহার করছেন।

এ পেট্রোল ইতোমধ্যে মোটরসাইকেলে জ্বালানি হিসেবেও ব্যবহার করা হয়েছে। সব খরচ বাদ দিয়ে ৫০-৬০ টাকা লিটার হিসেবে বাজারজাত করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। তবে টাকার অভাবে আধুনিক যন্ত্র কেনা সম্ভব হচ্ছে না। এজন্য সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

ইকবাল, মোস্তাক আহম্মেদ ভুট্টু,সাবিনা ইয়াসমিন, সাদেকুল ইসলাম এবং রিপন নামের স্থানীয়রা অনেকেই জানান, আমরা জানতাম পলিথিন পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু এ পলিথিন থেকে যে জ্বালানি তেল তৈরি করা যায় সেটা জানতাম না। নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাসই করতাম না।

মান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, ইমনের উদ্ভাবনের কথা শুনেছি। তবে এর কার্যকারিতা কতটা পরিবেশবান্ধব তা এই মুহুর্তে বলতে পারছি না। তবে তার এ উদ্ভাবনের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে স্বাগত জানাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*