বীর মুক্তিযোদ্ধা, বহুগুণে গুণান্বিত একজন আলোকিত মানুষ হাবিবউল্লাহ জাহিদ (মিঞা) স্মরণে

বীর মুক্তিযোদ্ধা, বহুগুণে গুণান্বিত একজন আলোকিত মানুষ হাবিবউল্লাহ জাহিদ (মিঞা) স্মরণে
=== সাফাত বিন ছানাউল্লাহ্

আমার সম্মানিত বড় আব্বু – মরহুম হাবিবউল্লাহ জাহিদ ; ডাক নাম (মিঞা) নামেই সমধিক পরিচিত। ছিলেন একাধারে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, তুখোড় রাজনীতিবিদ, সাংস্কৃতিক সংগঠক ও দরাজগলার একজন শিল্পী। ধর্মীয় গণ্ডির মধ্যে বেড়ে ওঠা হলেও তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চিন্তা চেতনার একজন মননশীল ব্যক্তিত্ব।
১৯৪৩ সালের কোন এক শুভক্ষণে স্বাধীনতার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সূতিকাগার বীর চট্টলার চন্দনাইশ উপজেলার সাতবাড়ীয়া গ্রামের স্বনামধন্য  ‘ক্বারি’-বাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন। 
পিতা – বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী, পীরে কামেল হযরত আল্লামা সৈয়দ আব্দুল মান্নান (রাহঃ) ও মাতা –  মরহুমা মোছাম্মৎ মালেকা খাতুন। পিতা-মাতার ৫ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। 
ছোট বেলা থেকে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ মেধাসম্পন্ন হাবিবউল্লাহ জাহিদ প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষা গ্রহণ গ্রামেই শেষ করেন। পড়ালেখা করা অবস্থায় শিক্ষাদীক্ষা, রাজনীতি, ধর্মীয় ও সমাজসেবায় দক্ষিণ চট্টগ্রাম জুড়ে সুপরিচিত গ্রাম সাতবাড়ীয়ায় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ব্যাপকভাবে ভূমিকা রাখেন। এরপর চট্টগ্রাম শহরে গিয়ে চট্টগ্রাম  কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণ অবস্থায় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হন। পরবর্তীতে নগরীর নামকরা সিটি কলেজে নৈশকালীন লেখাপড়া চালিয়ে রাজনীতিতে আরো বেশী সক্রিয় হয়ে পরেন। উল্লেখ্য, তৎকালিন সময়ে সিটি কলেজ ছিল আওয়ামী রাজনীতির দুর্গ। 
ষাটের দশকে বামপন্থি রাজনীতি দিয়ে শুরু হলেও ৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলনের মাধ্যমে সরাসরি আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। ৭০-এর উত্তাল গণআন্দোলনে জননেতা মরহুম এম,এ,আজিজ এর সাহচর্যে তাঁর আস্থাভাজন যুবনেতা হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগে। জননেতা জহুর আহমেদ চৌধুরী, এম এ হান্নান, সম্পর্কে তালই – মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী, তৎকালিন চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার ও দপ্তর সম্পাদক মিয়া আবু মোহাম্মদ ফারুকী সহ বিখ্যাত নেতাদের সাথে থেকে রাজনীতিতে ব্যাপকভাবে ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে  স্বাধীন সার্বভৌম দেশ বিনির্মাণের অন্যতম কারিগর একজন সাহসী, অকুতোভয় বীর সৈনিক হাবিবউল্লাহ জাহিদ ভারতের দেরাদুনে প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেন এবং ২ নং সেক্টরে প্লাটুন কমান্ডার হিসেবে নেতৃত্ব দেন।
যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদ (চট্টগ্রাম বিভাগ) -এ বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন। ৮০-র দশকে প্রতিষ্ঠা করেন বাঙালী জাতীয়তাবাদ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক সংগঠন ‘সমন্বয়’, যা অবশ্য আজ বিলুপ্ত। এছাড়াও, এ সময়ে চট্টগ্রাম মহানগর ও আগ্রাবাদের কয়েকটি ওয়ার্ড আওয়ামী লীগেও দল পুনর্গঠনে ব্যাপকভাবে ভূমিকা পালন করেন। 
বিভিন্ন চাকরী করার পাশাপাশি একজন সংস্কৃতি মনা ব্যক্তি হাবিবউল্লাহ জাহিদ কণ্ঠশিল্পী হিসেবেও বন্ধুমহলে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। শহরে কোথাও অনুষ্ঠান হলে মঞ্চে গান করতেন অনন্য সঙ্গীদের সাথে। মঞ্চ নাটকে অভিনয়েও সমান পারদর্শী ছিলেন। উন্মুক্ত মঞ্চে তৎকালিন সময়ে অসম্ভব জনপ্রিয় নবাব সিরাজদৌল্লাহ নাটকে বিশ্বাসঘাতক মীরজাফরের পুত্র মীরানের চরিত্রে অভিনয় করে বাহবা কুড়িয়েছিলেন শ্রোতামহলে, ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল তাঁর অভিনয়শৈলি। খেলাধুলাতে ও যোগ্যতার পরিচয় দেন বহুগুণী এই ব্যক্তিত্ব। 
ব্যক্তিগত জীবনে দুই পুত্র সন্তান – আহসান উল্লাহ (জাহিদ) ও রাহাতউল্লাহ (জাহিদ) এর গর্বিত জনক তিনি। ওরাও উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশের শিক্ষা ও রাজনীতিতে অবদান রেখে যাচ্ছেন।
রাজনীতি করতে গিয়ে দলের জন্য আপোষহীনতা ও নিঃসার্থপরতার জন্য সতীর্থরা অনেকেই দুরে চলে গিয়েছিলেন। ৮০’ র দশকে দলের অনেক সিনিয়র নেতৃবৃন্দের দুর্ব্যবহার ও বিভিন্ন অনিয়মের প্রতিবাদে রাজনীতি থেকে পরোক্ষভাবে অনেকটা দুরে ছিলেন। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনীতিবিদ হয়েও দলের কেউ তার খোজ খবর নিতেন না বললেই চলে।
২০০২ সালের ৫ মার্চ তিনি ইন্তেকাল করেন। প্রতি বছর মৃত্যুবার্ষিকীর দিনটিকে পরিবারের পক্ষ থেকে গ্রামের বাড়ীতে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করা হয় ।।

মহান স্বাধীনতার এই মাসে বীর মুক্তিযোদ্ধা হাবিবউল্লাহ জাহিদ (মিঞা) কে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্বরণ করছি  ।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*