সাহাবি হযরত সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) যাঁর মাধ্যমে চট্টগ্রামে এলো ইসলামের সত্যবাণী

সাহাবি হযরত সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) যাঁর মাধ্যমে চট্টগ্রামে এলো ইসলামের সত্যবাণী
সোহেল মো. ফখরুদ-দীন

প্রাচীন এই চট্টগ্রামের মাটিতে আরব দেশ হতে নবী মুহাম্মদ (সা.) পবিত্র ইসলাম ধর্মের আগমনী বার্তা নিয়ে এদেশের চট্টগ্রামের মাটি ও মানুষকে ধন্য করেছিলেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর সাহাবী হযরত সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)। হযরত সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) আরবভূমি থেকে সমুদ্র পথে এই চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে সুদূর চীন গমন করেন। তাঁর নেতৃত্বে ৬১৬ হিজরিতে আরো ৫ জন সাহাবী এই চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে চীন গমন করেন। অন্য সাহাবীরা হলেন: হযরত তামিম আনসারী (রা.), হযরত কায়েস ইবনে ছায়ফুরী (রা.) হযরত উর ওয়াহ ইবনে আছম (রা.), হযরত আবু কায়েস হারিস (রা.) প্রমুখ। তাঁরা এই সময় দীর্ঘদিন চট্টগ্রামে অবস্থান করেছিলেন। পরবর্তীতে ৬১৭ খ্রিস্টাব্দের পরে আমিরুল মুমেনীন হযরত ওমর (রা.) এর সময়ে আরো একটি আরবদেশের ধর্মপ্রচারক দল চট্টগ্রামে আসেন। তাঁরা কতদিন চট্টগ্রামে ছিলেন তা জানা যায়নি। ঐ প্রতিনিধি দলের মধ্যে যাঁরা ছিলেন তাঁদের নাম: হযরত মুহাম্মদ মামুন (রা.), হযরত মোহাইমিন (রা.), হযরত আবু তালেব (রা.), হযরত মরতুজা (রা.), হযরত আবদুল্লাহ (রা.), হযরত হামিদ উদ্দিন (রা.), হযরত হোসাইন (রা.) প্রমুখ। (চট্টগ্রামে মুসলমান আগমনের ইতিকথা, সোহেল মো. ফখরুদ-দীন, সাজিদ আলী প্রকাশন, চট্টগ্রাম-২০১৫)। চট্টগ্রামকে বলা হয় বার আউলিয়ার চট্টগ্রাম। সুফিগণ ও ধর্মপ্রচারকদের আগমনে চট্টগ্রামের মাটি ও মানুষকে ইসলাম ধর্মের আদর্শে অনুপ্রাণিত করতে পেরেছিলেন। যার অবস্থান এখনো বিদ্যমান। চট্টগ্রামের ভাষা, সাহিত্য-সংস্কৃতিতে আরব দেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি ও ফারসির সাথে ব্যাপক মিল দেখা যায়। ইতিহাস গবেষকদের ধারণা আরব রাজ্যের ধর্ম প্রতিনিধিদের ধর্ম প্রচার প্রসারে এ অঞ্চলের মানুষকে ইসলাম ধর্ম ও পবিত্র কোরআন হাদিসের আলোকে জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে উঠে। চট্টগ্রামে মুসলমান আগমনের প্রবাদপ্রতিম হযরত সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) প্রসঙ্গে বাংলাদেশের প্রখ্যাত আইনবিদ ও ইতিহাসবিদ বিচারপতি আবদুস সালাম মামুন লিখেছেন, “নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কায় ইসলামের দাওয়াত শুরু করায় মক্কার শাসকগোষ্ঠী কুরাইশরা তাঁর উপর বিভিন্নভাবে নির্যাতন শুরু করে। অত্যাচারী কুরাইশরা ততোধিক নির্মম নির্যাতন-নিপীড়ন শুরু করে ইসলামের আহবানে সাড়া দেওয়া নবদীতি মুসলিমদের উপর। মক্কায় তাঁদের জীবন সংকটাপন্ন হয়ে উঠলে আল্লাহর রসূল (সা.) তাঁদেরকে আবিসিনিয়ায় (ইথিওপিয়া) গমন করে আত্মরার অনুমতি দান করেন। সাহাবারা দুই দলে বিভক্ত হয়ে আবিসিনিয়ায় গমন করেন। ৬১৩ খ্রিস্টাব্দে ১১ জন পুরুষ ও ৪ জন মহিলা সাহাবী প্রথম ব্যাচে আরবের সুহাইবা বন্দর থেকে আবিসিনিয়ার অক্সামে গমন করেন। আবিসিনিয়ার খ্রিস্টান রাজা আমা ইবনে আবজার (আল নাজাসী, নেগুস) তাঁদেরকে সাদরে বরণ করেন। দুই বছর পর ৬১৫ খ্রিস্টাব্দে হযরত আলীর (রা.) কনিষ্ঠ ভ্রাতা হযরত জাফর ইবনে আবু তালিব (রা.) এর নেতৃত্বে প্রায় একশ সদস্যের অপর একটি দল (৮৩ জন পুরুষ, ১৮ জন মহিলা) আবিসিনিয়ার অক্সামে পৌঁছান। ৬১৩ ও ৬১৫ খ্রিস্টাব্দে আবিসিনিয়ায় আশ্রয় গ্রহণকারীদের মধ্যে নবী করীম (রা.) এর বিশিষ্ট কয়েকজন সাহাবা ছিলেন, যথা- সা’দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রা.), আবদুল্লাহ ইবনে জাস (রা.), উসমান ইবনে আফফান (রা.) (পরবর্তীতে খোলাফায়ে রাশেদিনের তৃতীয় খলিফা) ও তদীয় স্ত্রী রুকাইয়া বিনতে মুহাম্মদ (সা.) প্রমুখ। পরবর্তীকালে সাহাবারা আবিসিনিয়া থেকে মদিনায় ফিরে যান। কিন্তু সেই ৬১৫ খ্রিস্টাব্দেই সা’দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রা.) অপর দুইজন সঙ্গী নিয়ে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে ইথিওপিয়ার অক্সাম বন্দর থেকে নৌপথে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌঁছান। তিনিই প্রথম চট্টগ্রামবাসীদের নিকট ইসলামের বাণী পৌঁছে দেন। চট্টগ্রাম থেকে কামরূপ-মণিপুর হয়ে ৬১৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি চীনের ক্যান্টন শহরে উপনীত হন। ক্যান্টন ও পার্শ্ববর্তী এলাকার হুই চাই (পরবর্তী কালে হুই হুই জনগোষ্ঠী নামে পরিচিত) জনগণের মধ্যে ইসলামের প্রাথমিক পর্যায়ে উপমহাদেশে চট্টগ্রামেই সর্বাগ্রে ইসলামের অমীয় বাণীর সন্ধান পায়। অতঃপর কামরূপ ও মণিপুর। তারপর চীন। ৬১০-৬১১ খ্রিস্টাব্দে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং রসূল (সা.) এর প্রিয় সাহাবায় উন্নীত হন। ইসলাম গ্রহণের েেত্র তিনি ছিলেন ১৭তম ব্যক্তি। তিনি হযরতের মাতা আমিনা বিনতে ওয়াহাব (রা.) এর চাচাত ভাই ছিলেন। তিনি সুদ সেনাপতি ছিলেন। পারস্য সাম্রাজ্য (ইরান) বিজয়ে নেতৃত্ব দান করেন। ৬৩৭-৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি পারস্য সাম্রাজ্যের রাজধানী টেসিফন এর গভর্নর এবং ৬৪৫-৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে সিরিয়ার বুসরা আল শাম এলাকার গভর্নর ছিলেন। সা’দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রা.) আরব-চীন কূটনীতির পুরোধা হিসাবে ইতিহাসে খ্যাত হয়ে আছেন। ক্যান্টানে তাঁর স্মৃতি সংরতি আছে।” (উপমহাদেশের আইন ও শাসনের ইতিহাস, এপ্রিল-২০১৪)।
মহানবি হযরত মুহাম্মদ (স.) এর সাহাবি হযরত সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) ইসলামের ইতিহাসে একজন শ্রেষ্ঠ সেনাপতি, প্রজ্ঞাশীল রাজনীতিবিদ ও গভর্নর হিসেবে বিখ্যাত ছিলেন। রাসুলে করিম (সা.)-এর জীবদ্দশায় যে কয়েকজন সাহাবি জান্নাতে যাওয়ার শুভ সংবাদ পেয়েছিলেন হযরত সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) তাঁদের মধ্যে অন্যতম। হযরত সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) ৫৯১ খৃস্টাব্দে আরবের মক্কা নগরীর বিখ্যাত কুরাইশ বংশের ‘বনু যুহরা’ গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম ছিল আবু ওয়াক্কাস এবং মায়ের নাম ছিল হামনা। তাঁর পিতা ও মাতা উভয়ই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। হযরত সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) এর সাথে হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রা)-এর ছিল গভীর বন্ধুত্ব। তাই ইসলামের সূচনালগ্নে হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রা.)-এর উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় হযরত সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) ও তাঁর ভাই উমাইর পবিত্র ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। ইসলাম ধর্মে দীতি হওয়ার সময় তাঁর বয়স ছিল ১৭ বছর। হযরত সা’দের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা প্রসঙ্গে বুখারি শরিফে একটি হাদিস বর্ণিত আছে। হযরত আমের ইবনে সা’দ পিতা সা’দ ইবনে
হযরত সা’দের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা প্রসঙ্গে বুখারি শরিফে একটি হাদিস বর্ণিত আছে। হযরত আমের ইবনে সা’দ পিতা সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস থেকে বর্ণনা করে বলেছেন, ‘আমার ভালোভাবে স্মরণ আছে, ইসলাম ধর্ম গ্রহণকারী পুরুষদের মধ্যে আমি তৃতীয় ব্যক্তি ছিলাম। হযরত সা’দের ইসলাম ধর্ম গ্রহণের ব্যাপারটি জানাজানি হয়ে গেলে তাঁর মা চেঁচামেচি শুরু করে দেন। তাঁর চেঁচামেচিতে লোকজন জড়ো হয়ে যায়। মায়ের কাণ্ড দেখে সা’দ ঘরের এক কোণে নীরব অবস্থান গ্রহণ করেন। তাঁর মা কিছুণ শোরগোল করার পর ছেলেকে ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করার জন্য কঠোর নির্দেশ দিলেন। তিনি বললেন, যতণ না সে মুহাম্মদের ধর্ম ত্যাগ করবে, ততণ আমি কোনো কিছু খাব না এবং রোদ থেকে ছায়াতেও যাব না। তিন দিন কেটে গেল, হযরত সা’দের মা খাবার বা পানীয় কোনো কিছুই স্পর্শ করলেন না, রোদ থেকে ছায়াতেও এলেন না, কারো সাথে কথাও বললেন না। হযরত সা’দ বিচলিত হয়ে পড়লেন এবং রাসুলে করিম (সা.)-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে বিষয়টি অবহিত করলেন। সাথে সাথে পবিত্র কুরআনের আয়াত নাজিল হলো, ‘আমি মানুষকে মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার করার জন্য নির্দেশ দিয়েছি। যদি তারা তোমাকে আমার সাথে এমন কিছুকে শরিক করার পীড়াপীড়ি করে, যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তাহলে তুমি সে বিষয়ে তাদের আনুগত্য কর না। আমার কাছে তোমাদের প্রত্যাবর্তন করতে হবে। এরপর আমি তোমাদের জানিয়ে দেব তোমাদের কর্মফল।’ [সুরা আল-আনকাবুত, আয়াত ৮]।
পবিত্র কুরআনে এ আয়াতটি নাযিল হওয়ার পর হযরত সা’দ (রা.)-এর মনের অশান্তি দূর হলো। ছেলের দৃঢ়তায় মাতা হামনার হৃদয় বিগলিত হলো। তিনিও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেন। রাসুলে করিম (সা.)-এর নেতৃত্বে পরিচালিত প্রায় সকল যুদ্ধে হযরত সা’দ অসীম সাহসকিতা ও বীরত্বের সাথে অংশগ্রহণ করেন। ইসলামের প্রথম যুদ্ধ বদরের যুদ্ধে হযরত সা’দ ও তাঁর ভাই উমাইর বীরত্বের সাথে শত্র“র বিরুদ্ধে লড়াই করেন। এ যুদ্ধে হযরত সা’দের ভাই উমাইর শাহাদাতবরণ করেন।
উহুদ যুদ্ধে যখন কয়েকজন মুসলিম সৈনিকের ভুলের কারণে মুসলিম বাহিনী বিপর্যয়ের মুখে পতিত হয়, তখন মুষ্টিমেয় যে কয়েকজন সাহাবি নিজেদের জীবনকে তুচ্ছ মনে করে রাসুল (সা.)-এর জীবন রার্থে শত্র“র বিরুদ্ধে প্রতিরোধ রচনা করেছিলেন, হযরত সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) তাঁদের মধ্যে অন্যতম।
বুখারি শরিফের এক হাদিসে সেদিনকার ঘটনা হযরত সা’দ (রা.) নিজেই এভাবে বর্ণনা করেছেন, “উহুদের যুদ্ধ েেত্র রাসূল (সা.) স্বীয় তীর হতে সব তীর আমার সামনে রেখে দিয়ে আমাকে বললেন, ‘তুমি যথাসাধ্য তীর ছুড়তে থাক।’ (বুখারি)। আল্লাহ ও রাসূল (সা.)-এর অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন হযরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)। তাঁর সমর্থনে পবিত্র কুরআনে একাধিক আয়াত নাযিল হয়েছে। বদর যুদ্ধে হযরত সা’দ সাঈদ ইবনে আসকে হত্যা করে তাঁর তলোয়ারটি রাসুল (সা.)-এর কাছে জমা দিয়ে আবার সেটি ফেরত চাইলে, রাসুল (সা.) সেটি তাঁকে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বললেন, এটি না তোমার, না আমার। রাসুল (সা.)-এর জবাব শুনে হযরত সা’দ কিছুদূর যেতে না যেতেই সুরা আনফাল নাযিল হয়। এরপর রাসুল (সা.) হযরত সা’দকে ডেকে তলোয়ারটি ফেরত দিলেন। হযরত সা’দ সম্পর্কে বর্ণনা করতে গিয়ে হযরত আলী (রা.) বলেছেন, ‘একমাত্র সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) এমন সৌভাগ্যবান মানুষ যে রাসুল (সা.) স্বীয় মাতা-পিতা উৎসর্গ বলে তার সম্পর্কে উক্তি করেছেন। রাসুল (সা.)-কে অন্য কারো সম্পর্কে এরকম উক্তি করতে শুনিনি।’ (বুখারি)।
একদা হযরত সা’দ কোথাও থেকে আসছিলেন। তিনি নিকটবর্তী হলে রাসুল (সা.) বললেন, “এই দেখ, আমার মামা, তোমরা কেউ এরকম মামা নিয়ে এসো দেখি।” [তিরমিজি]।
হিজরতের দ্বিতীয় বছরে রাসুল (সা.) কুরাইশদের গতিবিধি ল্য করার জন্য ৬০ জন উটারোহীর এক টহলদল মদিনার উপকণ্ঠে প্রেরণ করেন। হযরত সা’দ এ টহলদলের অন্যতম সদস্য ছিলেন। এ টহলদল ইকরাম ইবনে আবি জাহেলের নেতৃত্বে কুরাইশদের একটি কাফেলা দেখতে পান। কুরাইশদের কেউ হঠাৎ চিৎকার করে উঠলে সাথে সাথে হযরত সা’দ (রা.) তীর নিপে করেন। ইসলামের ইতিহাসে এটাই হলো কাফিরদের বিরুদ্ধে কোনো মুসলমানদের ছোড়া প্রথম তীর। মদিনার আশপাশে শত্র“দের গতিবিধির ওপর ল্য রাখতে এবং সেই সাথে মুসলমানদের শৌর্য-বীর্য প্রদর্শন করতে দ্বিতীয় হিজরির রবিউস সানি মাসে মহানবি (সা.) ২০০ সাহাবির একটি দল নিয়ে বের হন। এ দলের পতাকাবাহী ছিলেন হযরত সা’দ (রা.)। মহানবি (সা.)-এর জীবদ্দশায় হযরত বেলাল (রা.)-এর অনুপস্থিতিতে হযরত সা’দ তিনবার আজান দিয়েছিলেন। রাসুল (সা.) তাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘বেলালের অনুপস্থিতিতে তুমি আজান দেবে’। হযরত উমর (রা.)-এর খেলাফতকালে হযরত আবু ওবায়দা ও মুসান্নার নেতৃত্বাধীন মুসলিম বাহিনী পারস্যের বিশাল ভূভাগ দখল করে ইসলামের পতাকাতলে নিয়ে আসেন। ৬৩৫ খৃস্টাব্দে মুসান্নার নেতৃত্বাধীন মুসলিম বাহিনী কুফার নিকটবর্তী বুয়াবের যুদ্ধে পারস্য বাহিনীকে নির্মমভাবে পরাজিত ও বিধ্বস্ত করতে সম হয়। বুয়াবের যুদ্ধের জয়ের মাধ্যমে মুসলামনরা সেতুর যুদ্ধের পরাজয়ের প্রতিশোধ গ্রহণ করে। বুয়াবের যুদ্ধে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হওয়ায় পারস্য সম্রাট তৃতীয় ইয়জদিগার্দ মুসলিম বাহিনীর ওপর প্রতিশোধ গ্রহণকল্পে পারস্যের দুর্ধর্ষ সেনাপতি মহাবীর রুস্তমের নেতৃত্বে ১ ল ২০ হাজার সৈন্যের একটি বিশাল বাহিনী প্রেরণ করেন। খলিফা উমর (রা.) পারস্যের বিশাল বাহিনীর অগ্রসর হওয়ার কথা জানতে পেরে শত্র“ বাহিনীকে মোকাবিলা করার জন্য মুসলিম সুদ সেনাপতি হযরত সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাসের নেতৃত্বে একটি সুশিতি বাহিনী প্রেরণ করেন। খলিফার আদেশক্রমে হযরত সা’দ সমর প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন। হযরত সা’দ পারসিকদের তীব্র আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য যুদ্ধ কৌশলে সৈন্যবিন্যাস এবং বিভিন্ন দলে সৈন্য বিভাজন সমাপ্ত করলেন। ৬৩৫ খৃস্টাব্দে কাদেসিয়ার প্রান্তরে হযরত সা’দের নেতৃত্বাধীন মুসলিম বাহিনী বিশাল পারসিক বাহিনীর মুখোমুখি হলেন। যুদ্ধের শুরুতে খলিফার নির্দেশে হযরত সা’দ পারস্য সম্রাটকে ইসলাম গ্রহণের আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু পারস্য সম্রাট ইসলাম গ্রহণের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এবং মুসলিম দূতকে অপমান করে তাড়িয়ে দেন। পারস্য সেনাপতি রুস্তমকেও ইসলাম গ্রহণের আহবান করা হলে তিনি রাগান্বিত হয়ে বলেন, ‘সমগ্র কিন্তু পারস্য সম্রাট ইসলাম গ্রহণের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এবং মুসলিম দূতকে অপমান করে তাড়িয়ে দেন। পারস্য সেনাপতি রুস্তমকেও ইসলাম গ্রহণের আহবান করা হলে তিনি রাগান্বিত হয়ে বলেন, ‘সমগ্র আরবের দম্ভ আমি চূর্ণ করে ছাড়ব’। সন্ধির সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে হযরত সা’দের নেতৃত্বাধীন মুসলিম বাহিনী শত্র“র ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ফলে মুসলিম বাহিনীর সাথে পারসিক বাহিনীর প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হয়। অসুস্থতার জন্য হযরত সা’দ যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে না পারলেও নিরাপদ স্থান থেকে তিনি সৈন্য বাহিনীকে পরিচালনা করতে থাকেন। তিন দিনব্যাপী উভয়পরে মধ্যে তুমুল যুদ্ধ সংঘটিত হলো। শত্র“র বিশাল বাহিনীর কথা জানতে পেরে খলিফা উমর (রা.) হযরত সা’দের সাহায্যার্থে সিরিয়া থেকে কাকার নেতৃত্বে একটি সুসজ্জিত বাহিনী কাদেসিয়ার প্রান্তরে প্রেরণ করেন। যুদ্ধের দ্বিতীয় দিনে কাকা কাদেসিয়ার প্রান্তরে উপস্থিত হলেন। কাদেসিয়ার প্রান্তরে উপস্থিত হয়ে কাকা পারস্যের জেনারেল বাহমনের সাথে মল্লযুদ্ধে অংশ নেন। প্রচন্ড মল্লযুদ্ধের পর মুসলিম জেনারেল কাকার হাতে পারস্যের জেনারেল বাহমন পরাজিত ও নিহত হয়। তৃতীয় দিনে মুসলিম ও পারস্য বাহিনীর মধ্যে মরণপণ যুদ্ধ শুরু হয়। হযরত সা’দ ও কাকার নেতৃত্বাধীন মুসলিম বাহিনী প্রচণ্ড যুদ্ধে পারসিক বাহিনীকে পরাজিত ও বিধ্বস্ত করতে সম হয়। যুদ্ধে পারস্য সেনাপতি রুস্তম নিহত হলে পারস্য বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে এবং মুসলিম বাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। অতঃপর হযরত সা’দের কাছে খবর আসে সম্রাট ইয়াজদিগার্দ মাদায়েন থেকে প্রচুর ধন-সম্পদসহ পলায়নের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। খলিফার অনুমতিক্রমে হযরত সা’দ ৬৩৭ খৃস্টাব্দে পারস্যের রাজধানী মাদায়েন আক্রমণ ও দখল করেন। সেখান থেকে মুসলিম বাহিনী প্রচুর ধনরতœ লাভ করে। পারস্য সম্রাট ইয়াজদিগার্দ রাজধানী মাদায়েন থেকে পলায়ন করে একশ’ মাইল দূরবর্তী হুলওয়ানে আশ্রয় গ্রহণ করেন। হযরত সা’দ শ্বেত প্রাসাদে প্রবেশ করে আট রাকাত সালাতুল ফাতাহ আদায় করেন। অতঃপর তিনি ঘোষণা দেন, এ শাহী প্রাসাদে আজ জুমার নামাজ অনুষ্ঠিত হবে। এরপর মিম্বার তৈরি করে সেখানে সালাতুল জুময়া আদায় করা হয়। এটাই ছিল পারস্যে প্রথম জুমার নামায। হযরত উমর (রা.) হযরত সা’দকে কুফার শাসনকর্তা নিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু কিছুদিন পর কতিপয় কুফাবাসীর মিথ্যা অভিযোগের কারণে তাঁকে কুফার গভর্নর পদ থেকে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। হযরত সা’দ (রা.)-এর মধ্যে কাব্যপ্রতিভাও ছিল। হযরত সা’দের কবিতার কয়েকটি চরণ ইবনে হাজা লিখিত গ্রন্থ ‘আল ইসাবা’ গ্রন্থে উল্লেখ পাওয়া যায়। রাসুল (সা.)-এর অনেক হাদীস হযরত সা’দ বর্ণনা করেছেন। সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর মধ্যে হযরত সা’দের ছিল একটি বিশেষ মর্যাদা ও অবস্থান। একদা মোজার ওপর মাসাহ সংক্রান্ত একটি হাদীস হযরত সা’দ (রা.) বর্ণনা করেন। হাদীসটি যাচাই করতে আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) স্বীয় পিতা উমর ইবনুল খাত্তাবের কাছে গেলে তিনি বলেন, যখন হযরত সা’দ তোমাদের কাছে কোন হাদীস বর্ণনা করে তখন সে ব্যাপারে অন্য কাউকে কিছু জিজ্ঞাসা করো না। খোলাফায়ে রাশেদীনের সবাই হযরত সা’দের মতামতকে গুরুত্ব দিতেন। হযরত উসমান (রা.)-এর হত্যাকে কেন্দ্র করে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে এক চরম বিপর্যয় দেয়া দেয়। তখন মুসলিম উম্মাহ তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এক প ছিল হযরত উসমানের হত্যাকারীদের বিচার প্রার্থীরা, অন্য প ছিল হযরত উসমানের বিরুদ্ধবাদীরা। উভয় পইে ছিলেন বড় বড় সাহাবায়ে কেরাম। এ দু’দলের মধ্যবর্তী আরো একটি নিরপে শ্রেণীর লোক ছিলেন, যারা কোন মুসলমানদের বিরুদ্ধে তলোয়ার ধারণকে আদৌও যুক্তিযুক্ত মনে করেননি। এ নিরপে দলের একজন ছিলেন হযরত সা’দ। তিনি সে সময় মদিনার নিজ গৃহে অবস্থান করেন। দশম হিজরিতে বিদায় হজে রাসুল (সা.)-এর সঙ্গী ছিলেন হযরত সা’দ (রা.)। কিন্তু হজের অনুষ্ঠানাদি পালনের পূর্বেই হযরত সা’দ মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন। জীবনের আশা তাঁর ছিল না বললেই চলে। এমতবস্থায় রাসুল (সা.) তাঁকে মাঝে মধ্যে দেখতে যেতেন। হযরত সা’দ (রা.) বলেন, একদিন আমাকে দেখতে এসে রাসুলে করিম (সা.) আমার সাথে কথা বললেন। তিনি আমার কপালে হাত রাখলেন। এরপর হাতের স্পর্শ মুখমণ্ডলের ওপর দিয়ে বুলিয়ে পেট পর্যন্ত নিয়ে গেলেন। তিনি আমার জন্য দোয়া করলেন, ‘হে আল্লাহ সা’দকে সুস্থ করে দাও, তাঁর হিজরতকে পূর্ণতা দাও, তাঁর হিজরতের স্থান মদীনাতেই তাঁর মৃত্যুদান কর’। এরপর হযরত সা’দ (রা.) আরো ৪৫ বছর জীবিত ছিলেন। হযরত সা’দ (রা.) বলতেন, রাসুল (সা.)-এর হাতের শীতল স্পর্শ আজও আমি অনুভব করছি। ৬৭৬ খৃস্টাব্দে [৫৫ হিজরি] মদীনা থেকে ১০ মাইল দূরে আকীক উপত্যকায় কিছুদিন অসুস্থ থাকার পর ৮৫ বছর বয়সে হযরত সা’দ (রা.) ইন্তেকাল করেন। হযরত সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) ইন্তিকালের পর হযরত আয়েশা (রা.) ও উপস্থিত সাহাবায়ে কেরামদের অনুরোধে তাঁর লাশ মসজিদে নববীতে আনা হয় এবং রাসুল (সা.)-এর স্ত্রীগণ তাঁর জানাযায় অংশগ্রহণ করেন। যে জুববাটি পরিধান করে হযরত সা’দ (রা.) ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন তাঁর অন্তিম ইচ্ছানুযায়ী সেই জুববাটি দিয়ে তাঁর কাফন দেয়া হয়। অনেক ইতিহাস গবেষক লিখেছেন হযরত সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) চট্টগ্রাম হয়ে চীন গমন পরবর্তীতে তিনি চীনের ক্যান্টনে ইন্তেকাল করেছেন। সেখানে তাঁর একটি মাজার রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*