ধানকাটা না ফটোসেশন

ধানকাটা না ফটোসেশন

সিটিজি পোস্ট ডটকম ডেস্কঃ এই বঙ্গে কে নয় কৃষকের সন্তান! জন্ম থেকেই লাঙ্গল-জোয়াল-কাস্তে দেখেনি এমন মানুষ ক’জন! ধানক্ষেত কিংবা ধানকাটার সঙ্গে পরিচয় জন্মসূত্রেই। কৃষকের সন্তান যখন পড়াশোনা শেখে, ব্যবসা-বাণিজ্য করে, প্রবাসে গিয়ে ‘ভদ্রলোক’ হতে শুরু করলেন তখন থেকেই দূরত্ব সৃষ্টি হতে থাকে ধানক্ষেতের সঙ্গে, কৃষকের সঙ্গে। কিন্তু কৃষক ঠিকই নিঃস্বার্থ, নিরলসভাবে দেশের মানুষের জন্য বছরের পর বছর অন্ন জোগান দিচ্ছেন। ধানক্ষেতের সঙ্গে যাদের দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে, নতুন করে তাদের কেউ কেউ ফিরেছেন ধানক্ষেতে, কাস্তে হাতে। কৃষককে সহযোগিতার জন্য হাতে কাস্তে নিয়েছেন, গামছা বেঁধেছেন কোমরে। অন্যদিকে কেউবা স্রেফ আত্মপ্রচারণা ও মিডিয়ার কাভারেজ পাওয়ার জন্য সহযোগিতার ভান করছেন। ধানকাটার সেলফি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফেসবুকে দিচ্ছেন, ফেসবুক লাইভে সরাসরি ধানকাটার ‘তোড়জোড়’ও দেখানো হচ্ছে। এর মাধ্যমে কৃষিক্ষেত্র বা কৃষক কতটুকু সুফল পাচ্ছেন সে প্রশ্নও উঠছে মোটা দাগে। চলতি বছর ধানের বাম্পার ফলন হলেও বরাবরের মতোই স্বস্তিতে নেই কৃষকরা। উৎপাদনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারিভাবে ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত না হওয়ায় কৃষকরা কম দামে ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। ফড়িয়া ও মধ্যস্বত্বভোগীরা মওকা বুঝে ধানের দাম কম হাঁকছে। ফলে সংকটে পড়েছেন কৃষক। বিক্রির দামে উৎপাদন খরচও উঠছে না। একদিকে ধানের কম মূল্য, অন্যদিকে কৃষি মজুরদের মাত্রাতিরিক্ত পারিশ্রমিকে ক্ষুব্ধ কৃষকরা আগুন দিয়েছেন ধানক্ষেতে। টাঙ্গাইলের একজন কৃষক এভাবে প্রতিবাদ জানালে দেশের আরও কয়েকজন কৃষিজীবী ক্ষেতে আগুন দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কৃষকের ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে সবখানে। এ আগুনের পরশমণিতে চেতনাও ফিরেছে কারও কারও। প্রথমে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী টাঙ্গাইলের সেই কৃষকের ক্ষেতের ধান কেটে দিয়ে সহযোগিতা করেন। এরপর বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক স্বেচ্ছাশ্রমে কৃষকদের ধান কেটে দিয়েছেন। একজন এসপি ও জেলা প্রশাসকের ধান কেটে দেবার ছবি ও খবরও আমরা জানতে পেরেছি। এর বাইরেও অনেকে গেছেন ধান কাটতে। এসব ধান কাটার ছবি বিভিন্ন গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচারিত হয়েছে। অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৃষককে পাশে রেখে ছবি তুলে সেটা প্রকাশ করেছেন। অসহায় কৃষকের পাশে গিয়ে তাদের সঙ্গে একাত্ম হওয়া, তাদের সহযোগিতা করার যে সংস্কৃতি তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। সর্বশেষ আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ বিভিন্ন ইউনিটের নেতাকর্মীদের স্ব স্ব এলাকার কৃষকদের ধান কেটে সহযোগিতার নির্দেশ দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল বুধবার রাজধানীর অদূরে আমিনবাজারে ধানকাটায় নেতৃত্ব দেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। গতকাল তিনি ছাত্রলীগের কয়েকজন সদস্যকে নিয়ে ধানক্ষেত্রে নেমে ফেসবুক লাইভে আসেন। ১৭ কোটি মানুষের অন্নদাতা কৃষকের পাশে দাঁড়ানোর এই রেওয়াজ নিঃসন্দেহে সমাজের জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, সাড়ম্বরে ধানক্ষেতে গিয়ে কাস্তে হাতে ছবি তোলার ক্ষেত্রেই মনোযোগ বেশি। অনেকে আগে থেকে রীতিমত ঘোষণা দিয়ে ধান কাটতে যাচ্ছেন। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের প্রচার করছেন। এভাবে ঢাকঢোল পিটিয়ে যারা কৃষককে ‘সহযোগিতা’ করছেন; তাতে প্রশ্ন উঠছে এটা ধানকাটা নাকি ফটোসেশন! ধানকাটা তথা কৃষককে সহায়তার চেয়ে যদি ফটোসেশন এবং আত্মপ্রচারণাই মুখ্য হয়ে ওঠে- লক্ষ্য-উদ্দেশ্য-সদিচ্ছা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। আয়োজন করে ধান কাটার সঙ্গে ফটোসেশনের মনোভাব বেখাপ্পা। সহযোগিতা নীরবে-অলক্ষে হলেই মাহাত্ম্য বজায় থাকে। কৃষকের এ দুরবস্থায় নতুন করে ধান কাটার সংস্কৃতিতে ফিরেছে জাতি। বাংলাদেশের সচ্ছলতা ও স্বনির্ভরতার ইতিহাস খুব বেশি দিন আগের নয়। কৃষকের সন্তানরাই বর্তমানে বিভিন্ন খাতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, স্বনির্ভর হচ্ছেন। ভূমিকা রাখছেন দেশ গঠনে। আত্মম্ভরিতা কিংবা নাক-উঁচু মনোভাবে অন্যকে ‘চাষার পুত’ বলে গালি দেন এমন মানুষও বিরল নয়। চাষা হওয়া কতটা সম্মান ও গৌরবের- এটা যারা উপলব্ধি করেন না তারাই কেবল এভাবে চিন্তা করতে পারেন। কৃষকদের বর্তমান সমস্যা সমাধানে কী করা উচিত তা আলোচিত হচ্ছে সরকারি ও বেসরকারিভাবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদনসহ আনুষঙ্গিক খরচ কমানো গেলেই কমবে কৃষকের দুর্ভাবনা ও সংকট। একজন কৃষিমজুরের বেতন দিতে কৃষককে আক্ষরিক অর্থেই দেউলিয়া হতে হচ্ছে। বাস্তবতার নিরিখে কমছে কৃষিমজুর। যে কারণে বাড়ছে কৃষিশ্রমিকের মজুরি। কৃষিকাজ সবসময় পাওয়া যায় না। অনিশ্চয়তার কারণে শ্রমিকরা ক্ষুদ্র ব্যবসাসহ অর্থকরী নানা কাজে জড়িয়ে পড়ছেন। এরই নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কৃষিক্ষেত্রে। হতাশার মধ্যেও ইতিবাচক একটি দিক প্রতিভাত হচ্ছে। ছাত্র-শিক্ষক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন কৃষকের অসহায়ত্ব ও বিদ্যমান সংকট। সামগ্রিকভাবে এ আত্ম-উপলব্ধি আশাজাগানিয়া। এখন প্রয়োজন সত্যিকারের সহযোগিতামূলক মনোভাব নিয়ে কৃষকের পাশে দাঁড়ানো। কৃষকের ঘাড়ে বন্দুক রেখে কেউ যেন আত্মপ্রচারণার সুযোগ না খোঁজেন সে মনোভাবও জাগিয়ে তোলা জরুরি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*