জামালগঞ্জে অনুমোদনের আগেই কাজ শেষ, দরিদ্ররা সুফল পাচ্ছেন না ৪০ দিনে কর্মসুচিতে

জামালগঞ্জে অনুমোদনের আগেই কাজ শেষ, দরিদ্ররা সুফল পাচ্ছেন না ৪০ দিনে কর্মসুচিতে

ফকির হাসান, জামালগঞ্জ থেকেঃ সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার ৬টি ইউনিয়নে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের আগেই অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির কাজ (৪০ দিনের) সম্পন্ন করে ফেলেছেন বলে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা দাবী করে আসছেন। নিয়মানুযায়ী সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা প্রকল্পের সভাপতি হিসেবে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করে থাকেন। এই প্রকল্পে নির্ধারিত শ্রমিকের তালিকা অনুযায়ী জবকার্ড থাকে। নির্দিষ্ট শ্রমিকেরা এই প্রকল্পে কাজ করবেন এবং তাদের নামে ব্যাংক একাউন্ট থাকবে। কাজের পর মাস্টাররোলের মাধ্যমে সেই শ্রমিকেরা তাদের স্ব-স্ব ব্যাংক একাউন্টে জমাকৃত টাকা থেকে তাদের মজুরি উত্তোলন করবেন। কিন্তু বাস্তবে আদৌ এসবের কোন নিয়মই মানা হচ্ছে না। এলাকায় গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে কার মাল কে খায়। নিয়ম ভঙ্গ করেই সংশ্লিষ্টরা সকল স্তরে সমঝোতা করে বরাদ্ধ নয়-ছয় করা হয়ে আসছে বছরের পর বছর ধরে এমন অভিযোগ এখন মুখে-মুখে । সম্প্রতি জামালগঞ্জ উপজেলার ইউনিয়ন গুলোতে এই প্রকল্পের খোঁজ খবর নিতে গিয়ে জানা যায়, গেল ফেব্রুয়ারি- মার্চেই অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থান কর্মসূচির ২য় পর্যায়ের কাজ সম্পন্ন করে নিয়েছেন বলে দাবী করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বরাদ্ধ উত্তোলনের জন্য মাস্টাররোল প্রস্তুত করছেন। অথচ প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ে যোগাযোগ করে জানা যায়, কোন প্রকল্প এখনও অনুমোদন হয়নি। খোঁজ নিয়ে আরো জানা গেছে, জামালগঞ্জ উপজেলার ৬ টি ইউনিয়নে অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থান কর্মসূচির বরাদ্ধকৃত কার্ড হচ্ছে ১০৯১টি। এর মধ্যে জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নে ১৩০টি, জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নে ১২৭টি, ফেনারবাঁক ইউনিয়নে ৩১৪টি, বেহেলী ইউনিয়নে ২০৪টি, ভীমখালী ইউনিয়নে ১৭৮টি, সাচনাবাজার ইউনিয়নে ১৩৮টি। এতে প্রতি পর্যায়ে শ্রমিকেরা মজুরি পাবেন ৮৭ লাখ ২৮ হাজার টাকা। এরকম প্রকল্প বছরে দুই বার সম্পন্ন করা হয়ে আসছে। কিন্তু অতিদরিদ্ররা এর সুফল কেউই পাচ্ছেন না। বরাদ্দের সিংহভাগ চলে যাচ্ছে অন্যদের পকেটে। প্রকল্প কাজের প্রকল্প চেয়ারম্যানরা নিজেদের আত্মীয়-স্বজন ও অনুগতদের নামে জবকার্ড ব্যাংক একাউন্ট করিয়ে নামমাত্র কাজ করে ব্যাংক থেকে বান্ডিল বান্ডিল টাকা তোলে নিয়ে নিজেদের পকেট ভারী করছেন। জামালগঞ্জ উপজেলায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোন অনুমোদন ছাড়াই প্রকল্প বাস্তবায়ন ও সমাপন প্রসঙ্গে জানতে চেয়ে জামালগঞ্জ উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো.শাহাদাৎ হোসেন ভুঁইয়ার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এই প্রকল্প কাজ শুরু ও সম্পন্ন করা সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের একটি চলমান প্রক্রিয়া। সেক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করার জন্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা দেওয়া আছে। এদিকে, জামালগঞ্জ উপজেলার বেহেলী ইউনিয়নে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে অতিদরিদ্রদের জন্য (৪০দিন) কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় ২য় পর্যায়ে গৃহিত প্রকল্পে অনিয়মের লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত ১৯ মে ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের বদরপুর গ্রাম থেকে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে এই লিখিত অভিযোগ করা হয়। অভিযোগের প্রেক্ষিতে জানা যায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে অতিদরিদ্রদের জন্য ৪০ দিনের কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় ২য় পর্যায়ে বেহেলী ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডে বদরপুর গ্রাম থেকে হালির হাওর অভিমুখী বেউড়ার জাঙ্গালের রাস্তা নির্মাণের জন্য ৪০ জন শ্রমিক নির্ধারণ হয়। শ্রমিকদের কাজের মজুরি বাবদ ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্ধ দেওয়া হয়। এবং প্রকল্পে সংশ্লিষ্টদের দাবী অনুয়ায়ী ঐ প্রকল্প কাজ গত মার্চেই সমাপ্ত করা হয়েছে। যদিও এসব প্রকল্পে যথাযথ কর্তৃপক্ষের তখনও কোন অনুমোদনের চিঠিই আসেনি। অথচ প্রায় দুই মাস আগে মার্চে কাজকে প্রকল্পে ধরে রেখে বর্তমান মে মাসে এসে ভূয়া মাস্টাররোলের মাধ্যমে বরাদ্ধ উত্তোলনের পায়তারা চলছে। অভিযোগে আরো উল্লেখ করা হয়, রাস্তার কাজে মাটি কাটার স্থানীয় হিসাবে ২২শ টাকা প্রতি হাজার মাটির মূল্য ধরে ২২হাজার মাটি কাটা হয়। যার সর্বসাকুল্য মজুরি ব্যয় দেওয়া হয় ৪৮ হাজার ৪শ টাকা। প্রকল্প স্থানে সরজমিন গেলে, বদরপুর গ্রামের মো.আব্দুস সাহিদ, মো. ঝুনু মিয়া, মো. হারুন রশিদ, শাহীন মিয়া, অখিল পাল, গোপেশ পাল জানান, হাওর থেকে ফসল উত্তোলনে বদরপুর বেউড়ার জাঙ্গালের রাস্তা নির্মানে কত টাকা বরাদ্ধ করা হয়েছে তা তাদেরকে জানানো হয়নি। তবে বেহেলী ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের পরামর্শ মোতাবেক গ্রামের লোকেরা মাসিক সুদে টাকা ধার করে এনে রাস্তার মাটি কর্তন করেন। তখন চেয়ারম্যানের তরফ থেকে বলা হয়েছিল পিআইও অফিস থেকে বরাদ্দের টাকা উত্তোলন করে গ্রামবাসীর টাকা পরিশোধ করে দেবেন। কিন্তু অদ্যাবধি গ্রামবাসীর ধার করা টাকা ফেরত পাচ্ছেন না। মাটি কাটার শ্রমিক গ্রুপের সর্দার শাহীন মিয়া জানান, তারা সর্বসাকুল্যে ৫০ হাজার টাকার মাটি উত্তোলনের কাজ করেছেন। এব্যাপারে জামালগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. মোশাররফ হোসেনের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রকল্প চেয়ারম্যানের পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেন, প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। অথচ সেই সময় প্রকল্প স্থানটি পানির নীচে তলিয়ে যেতে দেখা গেছে। উপস্থিত গ্রামবাসী জানান, এটা কোন রাস্তাই হয়নি। মাত্র ২/৩ফুট প্রস্থের এই সরু রাস্তা দিয়ে ফসল আনা- নেয়া তো দূরের কথা, একজন মানুষই হেটে যাওয়া যায় না। অভিযোগের ব্যাপারে জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার প্রিয়াংকা পালের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পিআইওকে দায়িত্ব দিয়েছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*