জাতিকে নেতৃত্বশূণ্য করে দেওয়ার নীলনকশাই ছিল ২১ আগস্ট ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা

জাতিকে নেতৃত্বশূণ্য করে দেওয়ার নীলনকশাই ছিল ২১ আগস্ট ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা
লায়ন ডা. বরুণ কুমার আচার্য বলাই

এই বাংলায় আরেকটি রক্তের স্রোত বয়ে গেল ২০০৪ সালে। একটি স্বাধীন দেশের উদার নৈতিক গণতন্ত্রের সঙ্গে দ্বিজাতিতত্বের মতাদর্শিক দ্বন্দ্বের চরমতম প্রকাশ ঘটাতে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামীলীগের জনসভায় ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা করা হয়। আজ ইতিহাসের ভয়াবহতম ২১ আগস্ট এই গ্রেনেড হামলার ১৫তম বার্ষিকী। পনের বছর আগের এই দিনে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশে নারকীয় গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষ স্থানীয় কয়েকজন নেতা সেদিন অল্পের জন্য এই ভয়াবহ হামলা থেকে বেঁচে গেলেও অপর ২৪ জন নিহত হন। আওয়ামীলীগ আয়োজিত শান্তি সমাবেশে বিকালে একটি ট্রাকের উপর অস্থায়ী মঞ্চে যখন শেখ হাসিনা বক্তৃতা দিচ্ছিলেন তখন আকস্মিক এই হামলায় সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রয়াত জিল্লুর রহমানের সহধর্মিণী ও আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমান এবং আরও ২৩ জন নেতাকর্মী নিহত হন। এছাড়াও এই হামলায় আরও ৪শ’ জন আহত হন। আহতদের অনেকেই চিরতরে পঙ্গুতে পরিণত হয়েছেন। তাদের অনেকেই আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। দেশের বৃহৎ এই রাজনৈতিক সংগঠন আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করতে এ হামলা করা হয়েছিল বলে পরবর্তী সময়ে অভিযোগ করেছিলেন দলটির নেতারা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শেখ হাসিনার বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে আকস্মিক গ্রেনেড বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলে মারাত্মক বিশঙ্খলা, ভয়াবহ মৃত্যু ও দিনের আলো মুছে গিয়ে এক ধোঁয়াচ্ছন্ন পরিবেশ সৃষ্টি হয়। ঢাকার তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ হানিফ এবং শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত দেহরক্ষীসহ অন্যান্য নেতারা তাৎক্ষণিকভাবে এক মানব বলয় তৈরি করে নিজেরা আঘাত সহ্য করে তাকে গ্রেনেড ও গুলির আঘাত থেকে রক্ষা করেন। গ্রেনেডের আঘাত থেকে শেখ হাসিনা বেঁচে গেলেও তাঁর শ্রবণ শক্তির ব্যাপক ক্ষতি হয়। সেদিন মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যাওয়া অনেকে এখনও বিশ্বাসই করতে পারেন না আসলে তারা জীবিত আছেন কি-না। মৃত্যুর এতো কাছাকাছি গিয়ে আবার ফিরে আসায় হয়তো তারা নতুন জীবন পেয়েছেনÑ কিন্তু যতদিন বেঁচে থাকবেন ততদিন তাদের বহন করে যেতে হবে সেই দুঃস্বপ্নের মতো তাড়িয়ে বেড়ানো স্মৃতিকে। হঠাৎ করে গভীর অন্ধকারে তলিয়ে যাওয়ার সেই ঘটনাকে। এই বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলায় নিহত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে রয়েছেনÑআইভি রহমান, ল্যান্স করপোরাল (অব.) মাহবুবুর রশীদ, আবুল কালাম আজাদ, রেজিনা বেগম, নাসির উদ্দিন সরদার, আতিক সরকার, আবদুল কুদ্দুস পাটোয়ারি, আমিনুল ইসলাম মোয়াজ্জেম, বেলাল হোসেন, মামুন মৃধা, রতন শিকদার, লিটন মুনশী, হাসিনা মমতাজ রিনা, সুফিয়া বেগম, রফিকুল ইসলাম (আদা চাচা), মোশতাক আহমেদ সেন্টু, মোহাম্মদ হানিফ, আবুল কাশেম, জাহেদ আলী, মোমেন আলী, এম শামসুদ্দিন এবং ইসাহাক মিয়া। মারাত্মক আহতরা হলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আমির হোসেন আমু, প্রয়াত আব্দুর রাজ্জাক, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, ওবায়দুল কাদের, সাহারা খাতুন, মরহুম মোহাম্মদ হানিফ, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, নজরুল ইসলাম বাবু, আওলাদ হোসেন, সাঈদ খোকন, মাহবুবা পারভীন, উম্মে রাজিয়া কাজল, নাসিমা ফেরদৌস, শাহিদা তারেখ দিপ্তী, রাশেদা আখতার রুমা, হামিদা খানম মনি, ইঞ্জিনিয়ার সেলিম, রুমা ইসলাম, কাজী মোয়াজ্জেম হোসেইন, মামুন মল্লিক প্রমুখ। অভিযোগ রয়েছে ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিকারের ব্যাপারে তৎকালীন বিএনপি সরকার নিলিপ্ত ভূমিকা পালন করে। শুধু তাই নয় এ হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের রক্ষা করতে সরকারের কর্মকর্তারা ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছেন। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধারকৃত পাঁচটি তাজা গ্রেনেড ধ্বংস করে দিয়ে প্রমাণ নষ্ট করার চেষ্টাও করা হয়েছিল। হামলার পর তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের তত্ত্বাবধানে একটি তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় এবং এতে জজ মিয়া নামে এক ভবঘুরে, একজন ছাত্র, একজন আওয়ামী লীগের কর্মীসহ ২০ জনকে গ্রেফতার করা হয়। অথচ পরবর্তী তদন্তে তাদের কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অনুকূল পরিস্থিতিতে সরকার এ হামলার পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দেয় এবং সাড়ে তিন বছর পর বিলম্বিত পুলিশ চার্জশিট নথিভুক্ত করা হয়। অথচ বিএনপির কতিপয় সংসদ সদস্য এই জঘন্য হামলাকে আওয়ামী লীগের পরিকল্পিত হামলা বলে দাবি করেছিলেন। পুনরায় তদন্তে পুলিশ এই হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ২১ জনকে চিহ্নিত করে। অভিযুক্তদের মধ্যে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় ফাঁসিতে ইতোমধ্যেই মৃত্যুদণ্ড সম্পন্ন হওয়া সাবেক মন্ত্রী ও জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদও ছিলেন। অন্যদিকে, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু ও হরকাতুল জিহাদ প্রধান মুফতি আবদুল হান্নান কারাগারে রয়েছেন। এই মামলায় পুলিশের সাবেক আইজি আশরাফুল হুদা, শহুদুল হক ও খোদাবক্স চৌধুরী এবং সাবেক তিন তদন্ত কর্মকর্তা-সিআইডির সাবেক এসপি রুহুল আমিন, সিআইডির সাবেক এএসপি আতিকুর রহমান ও আবদুর রশিদ জামিনে রয়েছেন। পলাতক আসামিদের মধ্যে তারেক রহমান রয়েছেন লন্ডনে, শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ ব্যাংককে, হানিফ এন্টারপাইজের মালিক মোহাম্মদ হানিফ কলকাতায়, মেজর জেনারেল (অব.) এটিএম আমিন আমেরিকায়, লে. কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার কানাডায়, বাবু ওরফে রাতুল বাবু ভারতে, আনিসুল মোরসালীন ও তার ভাই মহিবুল মুত্তাকিন ভারতের একটি কারাগারে এবং মাওলানা তাজুল ইসলাম দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থান করছেন বলে গোয়েন্দা সূত্র জানায়। জঙ্গি নেতা শফিকুর রহমান, মুফতি আবদুল হাই, মওলানা আবু বকর, ইকবাল, খলিলুর রহমান, জাহাঙ্গীর আলম ওরফে বদর ও মওলানা লিটন ওরফ জোবায়ের ওরফে দেলোয়ার, ডিএমপির তৎকালীন ডেপুটি কমিশনার (পূর্ব) ও ডেপুটি কমিশনার (দক্ষিণ) মো. ওবায়দুর রহমান এবং খান সৈয়দ হাসানও বিদেশে অবস্থান করছেন। তবে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব অভিযুক্ত হারিছ চৌধুরীর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। পলাকতকদের মধ্যে মাওলানা তাজউদ্দিন ও বাবু কারান্তরীণ উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই। বেশ কয়েকটি বিদেশি মিশন যেমন ব্রিটিশ স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড, ইউএস ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) এবং ইন্টারপোল বাংলাদেশী তদন্তকারী টিমকে সহযোগিতা করতে এগিয়ে এলেও এসব প্রতিষ্ঠানকে তৎকালীন সরকার সহযোগিতা করেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। শেখ হাসিনাসহ অন্য কেন্দ্রীয় নেতৃবর্গকে একসঙ্গে খতম করে আওয়ামী লীগ তথা তৎকালীন বিরোধী দল তথা জাতিকে নেতৃত্বশূন্য করে দেওয়ার যে ভয়াবহ উদ্যোগ: নীলনকশা, ষড়যন্ত্র, গ্রেনেড জোগাড়, হামলা, অপরাধীদের পালিয়ে যেতে সাহায্য করা এবং অবশেষে ঘটনার দায় খোদ আওয়ামী লীগ আর ভারতের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করা হয়েছিল তার মুখোশ উম্মোচিত হল। গত ১০ অক্টোবর ২০১৮, মামলার রায় হলো। আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ২১ আগস্ট চালানো গ্রেনেড হামলা মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এই মামলায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরী, সাবেক সাংসদ কায়কোবাদসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। শেখ হাসিনা এবং তাঁর সরকারকে ধন্যবাদ দিতে হবে, স্বয়ং শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য সংঘটিত হামলার বিচারও আদালতের মাধ্যমে হয়েছে। যেমন আইনানুগ বিচারের মাধ্যমে বছরের পর বছর বিচারকার্য পরিচালনা করে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায় হয়েছে, রায় কার্যকর করা হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারও প্রকাশ্য আদালতে হয়েছে এবং হচ্ছে। কোনো শর্টকাট বিচারপদ্ধতি বেছে না নিয়ে সরকার যে আইনানুগ বিচারিক পদ্ধতিকেই বেছে নিয়েছে এবং কার্যকর করেছে, সে জন্য আমরা অবশ্যই সরকারের প্রশংসা করব। আইনানুগ বিচারের মধ্য দিয়েই জাতির আরেকটা কলঙ্কের মোচন হলো।আগস্ট মাস বাঙালি জাতির কাছে শোকের মাস। এই শোকের মাসে আজ থেকে ১৫ বছর আগে আরেকটি বড় ধরনের শোকাবহ দিন সৃষ্টির লক্ষ্যে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত যে নজীরবিহীন নিন্দনীয় ঘটনা ঘটিয়েছিল তা নিন্দার ভাষা আমাদের কারো কাছে জানা নেই। আজকের এই দিনে একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহতদের আত্মার শান্তি ও মাগফেরাত এবং সদগতি কামনা করছি।

লেখক: প্রাবন্ধিক, কলামিষ্ট ও মরমী গবেষক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*