স্মরণে-স্মৃতিতে শ্রদ্ধায় আবু বকর স্যার

স্মরণেস্মৃতিতে শ্রদ্ধায় আবু বকর স্যার

-জিয়া হাবীব আহসান

শ্রদ্ধেয় মোহাম্মদ আবু বকর স্যার (বি. এ. বিএড), একজন স্বনামধন্য আদর্শ শিক্ষক তথা মানুষ গড়ার কারিগরের নাম । স্কুল জীবনে যে সব আদর্শ শিক্ষকদের স্নেহ মমতায় বড় হয়েছি, মানবতার সেবা ও নৈতিক চরিত্রের শিক্ষা পেয়েছি আবু বকর স্যার তাঁদের মধ্যে অন্যতম । আমি আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ সংলগ্ন ঐতিহ্যবাহী এম.ই.এস হাই স্কুলের ছাত্র ছিলাম । একেবারে কেজি ওয়ান থেকে ক্লাস টেন পর্যন্ত, ১৯৮০ সালের এস.এস.সি (কুমিল্লা বোর্ড) । তখন প্রধান শিক্ষক ছিলেন শ্রদ্ধেয় এটিএম রফিকুল আনোয়ার সিদ্দিকি (বি.এ.বিটি ) । এর আগে প্রধান শিক্ষক ছিলেন মরহুম শ্রদ্ধেয় ছৈয়দুল ইসলাম (বি.এ.বিটি) স্যার । আরও যে সব আদর্শ শিক্ষক ছিলেন তাঁদের মধ্যে মরহুম মাহাবুবুর রহমান স্যার, প্রনব স্যার, জামাল স্যার, ভুঁইয়া স্যার, এমদাদুল ইসলাম স্যার, এডভোকেট ইলিয়াছ স্যার, সৈয়দ আবু তাহের, মোস্তাফিজ হুজুর, সুজিত স্যার, গৌরঙ্গ স্যার, ইলিয়াস কামরুল স্যার প্রমুখের অমর স্মৃতি এখনও চোখে ভাসছে । স্কুলের স্কাউট লিডার ও শ্রেনী প্রতিনিধি (ক্যাপ্টেন) হওয়ার কারণে প্রায় প্রত্যেক ছাত্র শিক্ষক কর্মচারীদের সাথে আমার হৃদ্যতা ও সুসম্পর্ক ছিল । মোহাম্মদ আবু বকর স্যার ছিলেন একজন ব্যতিক্রমী আদর্শ শিক্ষক । অত্যন্ত সাদাসিধে, ধর্মপ্রাণ আদর্শ মানুষ আমাদের আবু বকর স্যার । কোথাও কোন ধরণের হিংসা, বিদ্বেষ, দলাদলি, গ্রুপিং এ তাঁকে কখনো জড়াতে দেখিনি । ছাত্র-ছাত্রীদের জ্ঞান দান ও তাদের মানুষ করাই ছিল স্যারের জীবনের মূল লক্ষ্য । স্যারকে অনেক সময় সাইকেল চালাতে দেখেছি । শাহী জামে মসজিদে আজান শুনার সাথে সাথে নামাজের জন্য ছুটে যেতেন । তিনি ইংরেজীর পাশাপাশি আমাদের ভুগোলও পড়াতেন । যেখানেই দেখতেন, “কিরে জিয়া কেমন আছিস ? কোথায় আছিস”- এভাবে জিজ্ঞাস করতেন । স্যারকে আমার খুবই সম্মান করতাম ও তাঁর উপদেশাবলি পালনের চেষ্টা করতাম । স্কুল জীবন অতিক্রমের দীর্ঘ ৩৯ বছর অতিক্রান্ত হলেও এসব শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষকদের স্মৃতি ও অবদান কখনো ভুলবো না । জীবনে যতটুকু ভালো কাজ শিখেছি তা তাদেরই অবদান । বকর স্যারের প্রায় পুরো জীবনটাই শিক্ষকতা পেশায় কেটেছে। উনি এম ই এস স্কুলে যোগদানের পূর্বে রহমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয় (হামজারবাগ)ও বাকলিয়া এন.এম.সি উচ্চ বিদালয়েও শিক্ষকতা করেন । মুসলিম এডুকেশন সোসাইটি উচ্চ বিদ্যালয়ের এক চরম সংকটময় মুহূর্তে ২০০৬ সালে তিনি প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন । তিনি অবসর গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত এ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা জীবন অতিবাহিত করেন । গত ১৭/০৮/১৯ ইং তারিখ শনিবার স্যার ৮০ বছর বয়সে চমেক হাসপাতালে হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে ইন্তেকাল করেন । (ইন্নাল্লিলাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন) । অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, দেশের বাইরে থাকায় আমি স্যারের জানাজায় অংশ গ্রহণ করতে পারিনি । বন্ধুবর সাংবাদিক মিজানুর রহমান চৌধুরী স্যারের ১ম কন্যার জামাই ও প্রাক্তন ছাত্রনেতা এডভোকেট গোলাম ফারুক তাঁর ভাগিনা । ১৯৪৭ সালের ১৩ই জানুয়ারী তিনি চট্টগ্রাম মহানগরীর শুলকবহর এলাকায় এক ঐতিহ্যবাহী সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন । তাঁর পিতার নাম মরহুম মোহাম্মদ ইব্রাহিম ও মাতার নামে আয়েশা খাতুন । ব্যক্তিগত জীবনে আবু বকর ও হাসিনা বেগম দম্পতির ৪ কন্যা ও ৩ পুত্র সন্তানের জনক ছিলেন । তিনি ২০১১ সালে এবং ২০১২ সালে দু’বার পবিত্র হজ্ব পালন করেন । শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন সমাজ উন্নয়নমূলক কাজেও সম্পৃক্ত ছিলেন । তিনি শুলকবহর মহল্লা কমিটির উপদেষ্টা, আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ কমিটি ও মুসলিম কমিটির উপদেষ্টা, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের হেড এক্সামিনার ছিলেন । একদিকে তিনি প্রচন্ড ধার্মিক ও আধ্যাত্মিকতায় নিমগ্ন একজন সুফী সাধক ছিলেন এবং অপর দিকে তাঁর মাঝে একটা রসিকতার প্রকাশ দেখেছি । তিনি কথায় আমাদের বিভিন্ন সময় নির্দোষ আনন্দ দিয়েছেন । এম.ই.এস স্কুলের বর্তমান প্রধান শিক্ষয়ত্রী এডভোকেট নূর নাহার বেগম কুম কুম বলেন, “স্যার আমাকে একটা দোয়া শিখিয়ে দিয়েছিলেন যা দিয়ে আমি অনেক বিপদ মুহূর্তে পার পেয়েছি, আলহামদুল্লিল্লাহ” । স্যার একজন খাঁটি মান প্রেমিক পরোকপকারী ধর্মপ্রাণ মানুষ ছিলেন । ৫ ওয়াক্ত নামাজ ও এবাদত বন্দেগীতে তিনি খুবই নিষ্ঠাবান ছিলেন । তিনি একাধিক গ্রন্থ রচনা করেন ও একজন সুবক্তা ছিলেন । এমন মহৎ প্রাণ ক্ষণজন্মা মানুষ আমাদের ছেড়ে চলে গেলেও তাঁর স্মৃতি কর্ম আদর্শের মাঝে তিনি বেঁচে থাকবেন অনাদীকাল । মহান সৃষ্টিকর্তা মালিক রহমানুর রাহীমের দরবারে মরহুম মগফুর আবু বকর স্যারের জন্য মুনাজাত করি তিনি যেন তাঁর এই প্রিয় বান্দাহকে জান্নাতের উঁচু মাকাম দান করেন (আমীন) ।

লেখকঃ আইনজীব, মানবাধিকার ও সুশাসন কর্মী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*