শীঘ্রই কালুরঘাটে নতুন একটি সেতু চাই

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী
শীঘ্রই কালুরঘাটে নতুন একটি সেতু চাই

আ ব ম খোরশিদ আলম খান
বৃহত্তর চট্টগ্রামের উন্নয়নের দায়িত্ব আমারÑ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা এক যুগ আগেই চট্টগ্রামবাসীকে এব্যাপারে আশ্বস্ত করেছিলেন। চট্টগ্রামবাসীও তাঁর কথায় আস্থা রেখে চট্টগ্রামে তাঁর দল আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের নৌকার ভোটের বাক্স ভরিয়ে দিয়েছে বারবার। চট্টগ্রাম নগরের উন্নয়নে অনেক মেগা প্রকল্প এখন বাস্তবায়িত হচ্ছে। এমনকি কর্ণফুলী-আনোয়ারা নদী মোহনায় টানেলের মতো মেগা প্রকল্পও এখন বাস্তবায়নের পথে। চট্টগ্রামের কালুরঘাটে নব্বই বছরের পুরনো সেতুটি ভেঙে নতুন একটি দ্বিমুখী সড়ক ও রেল সেতু নির্মাণ টানেলের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। দক্ষিণ চট্টগ্রামের বোয়ালখালী, পটিয়া, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া এবং কক্সবাজারের প্রায় অর্ধকোটি মানুষের জীবন-জীবিকা ও দৈনন্দিন জীবনযাপনের সঙ্গে কালুরঘাট সেতু ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অর্ধকোটি মানুষের চাওয়া-পাওয়া, দাবি ও স্বার্থ জড়িত কালুরঘাটে নতুন একটি সেতুকে ঘিরে। ১৯৩০ সনে বৃটিশ আমলে তৈরি কালুরঘাট সেতু বহু আগেই ব্যবহারের উপযোগিতা হারিয়েছে। পিচ ঢালাই ওঠে গিয়ে সেতুটিতে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। দিনে দিনে সেতুটি হয়ে পড়েছে নড়বড়ে ও ঝুঁকিপূর্ণ। এটি দেখভালের দায়িত্ব রেলওয়ে চট্টগ্রামের। অথচ রেল কাম একমুখী সড়ক সেতুটি বরাবরই রেলওয়ের উপেক্ষা ও অবহেলার শিকার। ফলে এখানে যে কোনো সময়ে ঘটে যেতে পারে মারাত্মক দুর্ঘটনা। জন্ম দিতে পারে দুঃখজনক বড় ট্র্যাজেডির।
আমাদের দেশে সাধারণত বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা কিংবা ট্র্যাজেডির আগে প্রশাসন বা কর্তাব্যক্তিদের টনক নড়ে না। বড় কোনো ট্র্যাজেডির আগে হাজারো সতর্কবার্তা বা হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও প্রশাসনের ঘুম ভাঙে না। বড় ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির পরই প্রশাসন নড়ে চড়ে বসে। কালুরঘাট সেতুর বেলায়ও সরকার ট্র্যাজেডি দেখার অপেক্ষায় হয়তো প্রহর গুনছে। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কালুরঘাট সেতু নিয়ে লেখালেখি কম হয়নি। এমনকি স্থানীয় সাংসদের বারবার জোরালো দাবি জানানো সত্ত্বেও সরকার কোনো এক রহস্যজনক কারণে কালুরঘাটে নতুন সেতু বাস্তবায়নে গড়িমসি করে যাচ্ছে। কেন এই জনদাবি বাস্তবায়নে সরকারি শৈথিল্য প্রদর্শন তা চট্টগ্রামবাসীর বোধগম্য হচ্ছে না। দক্ষিণ চট্টগ্রামসহ কক্সবাজারের অর্ধকোটি মানুষের প্রাণের দাবি কালুরঘাটে নতুন একটি সেতু। এজন্য আন্দোলনও চলছে ব্যাপকভাবে। তবুও সরকার নির্লিপ্ত নির্বিকার।
কালুরঘাটে নতুন একটি সেতু নির্মাণে চারবার সমীক্ষা হয়েছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বোয়ালখালী-চান্দগাঁও-পাঁচলাইশ এলাকার সংসদ সদস্য মইন উদ্দীন খান বাদল। সংসদেও তিনি বহুবার কালুরঘাটে সেতু নির্মাণে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বক্তব্য-বিবৃতি দিয়েছেন। এমনকি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছেও সাক্ষাতে সরাসরি কয়েকবার এ দাবি তুলেছেন প্রবীণ এ সাংসদ ও রাজনীতিবিদ। এই তো কিছুদিন আগে ৯ আগস্ট ২০১৯ চট্টগ্রাম ক্লাবে চট্টগ্রামের গণমাধ্যমের শীর্ষ সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে সাংসদ বাদল বলেছেন, যদি তাঁকে শেষ বয়সে এসে কালুরঘাট সেতুটির জন্য সরকারি দলে যোগ দিতে হয়, তাও করবেন। তবুও যেন সেতুটি হয়। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে কালুরঘাট সেতু নির্মাণে কোনো সুরাহা না হলে তিনি স্বেচ্ছায় সংসদ সদস্য পদ ছেড়ে দেবেন বলে একথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন সাংবাদিকদের কাছে। প্রবীণ রাজনীতিবিদ, বরেণ্য সংগঠক ও মুক্তিযোদ্ধা সাংসদ মইন উদ্দীন খান বাদল এ ব্যাপারে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, কালুরঘাট সেতু দিয়ে প্রতিদিন লাখো মানুষ যাতায়াত করে। সেতুটির দুরবস্থার জন্য ভোগান্তি-দুর্ভোগের শিকার ক্ষুব্ধ লোকজন প্রতিনিয়ত তাঁর (সাংসদের) ‘মরা মা’ ধরে গালিগালাজ করে থাকেন। তা আর তিনি সহ্য করতে পারছেন না। সেতুটি নির্মিত না হওয়ায় লজ্জায় তিনি এলাকাবাসীর কাছে মুখ দেখাতে পারছেন না বলে তীব্র আক্ষেপ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। যে সেতুর পেছনে লাখো লাখো মানুষের স্বার্থ ও অধিকার জড়িত, সেই সেতু নির্মাণে সরকার কেন গড়িমসি করবে এই জিজ্ঞাসা তো সরকারের কাছে নির্দ্বিধায় করা যায়।
বারবার সংসদে দাঁড়িয়ে কিংবা সভা সম্মেলনে কোনো এলাকার একটি সেতুর জন্য সাংসদ মইন উদ্দীন খান বাদলের এতো বেশি ‘আহাজারি-আর্তনাদ-ফরিয়াদ’ হয়তো দেশে এই প্রথম। এমনকি ‘যমুনা’ ‘পদ্মা’ সেতুর জন্য সেখানকার সাংসদ-মন্ত্রীরা এমপি বাদলের মতো এতো করুণভাবে ফরিয়াদ-আর্তি জানিয়েছেন এমন দৃষ্টান্ত হয়তো নেই।
সারা দেশে এখন উন্নয়নের মহাযজ্ঞ চলছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রজ্ঞায় সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত হচ্ছে পদ্মা সেতু। হাজার হাজার কোটি টাকার পদ্মা সেতুও আজ আর কোনো অলীক স্বপ্ন নয়। বছর দেড়েক পরই স্বপ্নের পদ্মা সেতু বাস্তবে দেখা যাবে। দেশের নানা এলাকার উন্নয়ন-অগ্রগতি ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে প্রতি সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একনেকের বৈঠকে হাজার হাজার কোটি টাকা বিভিন্ন প্রকল্পের পেছনে বরাদ্দ দিচ্ছে সরকার। অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ এমন বহু প্রকল্পের পেছনেও সরকার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিতে কার্পণ্য করছে না। সাংসদ বাদল সরকারের উন্নয়ন বরাদ্দ বা প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে ‘প্রায়োরিটি’ তথা অগ্রাধিকারের ওপর জোর দেয়ার দাবি জানিয়ে আসছেন। প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে এর সুবিধাভোগী কারা, সরাসরি বিপুলসংখ্যক জনগণ এতে উপকৃত হচ্ছেন কিনা সেটিই দেখার বিষয় বলে সাংসদ বাদল বারবার সরকারকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। সরকারের নীতি নির্ধারকরা এতে কর্ণপাত করছেন বলে অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় না। জনতুষ্টি চাইলে জনদাবি বাস্তবায়নে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। এছাড়া গত্যন্তর নেই।
মাত্র ৮ শ কোটি থেকে ১২শ কোটি টাকার মধ্যে কালুরঘাটে নতুন একটি সেতু নির্মাণ করা সম্ভবÑ সমীক্ষার মাধ্যমে কোরিয়ান কোম্পানি এই তথ্য জানিয়েছে। তবে রেলওয়ের ধারণা, ৮০০ কোটি টাকা লাগবে। কোরিয়ানরা বলেছিল ১২০০ কোটি টাকা লাগবে। তারা ৮০০ কোটি টাকা দিতে রাজি হয়। সরকারকে দিতে হবে ৩৭৯ কোটি টাকা। দেশে হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন হচ্ছে। অথচ ১৭৯ কোটি টাকার জন্য একটি সেতু পাচ্ছে না চট্টগ্রামবাসী। এটি চট্টগ্রামের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ বলেছেন সাংসদ বাদল। প্রায়োরিটি বিবেচনায় এবং লাখ লাখ মানুষের প্রয়োজন ও স্বার্থের কথা ভেবে এই হাজার বারোশ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া সরকারের পক্ষে কঠিন কোনো কাজ নয়। দেশে এমন উদাহরণও আছে, শত শত ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণের পরও বছর বছর ধরে পরিত্যক্ত থাকে। সংযোগ সড়কের অভাবে বা জনচাহিদা না থাকায় ব্রিজগুলো দিয়ে জনচলাচল ও যানচলাচল নেই। শুধু কিছু মানুষের পকেট ভারি করার জন্য কিংবা উন্নয়নের কমিশন ভাগাভাগির জন্য অনেক উন্নয়ন প্রকল্প নেয়া হয় তা কী অস্বীকার করা যাবে?
কালুরঘাটে নতুন একটি সেতু হলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাবে। পর্যটননগরী কক্সবাজারের সঙ্গে সারা দেশে সরাসরি রেল যোগাযোগ নেটওয়ার্ক তৈরি হবে। এতে লাভবান হবে পুরো দেশ। সরকারের নীতি নির্ধারকরা বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার এই দিকটি কেন বিবেচনায় আনছেন না? মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে কালুরঘাট সেতুর প্রয়োজনীয়তা ও অনিবার্যতা তুলে ধরার ক্ষেত্রে সাংসদ বাদলের সঙ্গে চট্টগ্রামের অন্য সাংসদ-মন্ত্রীদের একাট্টা দেখা যাচ্ছে না কেন? দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাংসদরাও একাট্টা হলে হয়তো স্বপ্নের কালুরঘাট নতুন সেতু শীঘ্রই আলোর মুখ দেখবে আশা করা যায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, অর্ধকোটি দক্ষিণ চট্টগ্রামবাসীর এই মুহূর্তে একমাত্র প্রাণের দাবি কালুরঘাটে নতুন একটি সেতু। তাই, এটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে নির্বাচনী ওয়াদা পূরণে শীঘ্রই পদক্ষেপ নিন। প্লিজ! কালুরঘাট সেতুর নিত্য বিড়ম্বনা ও ভোগান্তি থেকে লাখো মানুষকে রেহাই দিন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার সিদ্ধান্তের দিকে দক্ষিণ চট্টগ্রামবাসী ব্যাকুল হয়ে তাকিয়ে আছে।
১৯৯০ সনের পর দুই দফায় ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকার একাধিকবার প্রতিশ্রুতি দিয়েও কালুরঘাটে নতুন সেতু নির্মাণ করেনি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ১৯৯৬ সনের পর থেকে (২০০১-২০০৬ বাদে) আপনি এখন তৃতীয় দফায় দেশের হাল ধরে আছেন। দেশের সবখানে আজ উন্নয়ন-অগ্রগতির চিত্র চোখে পড়ে। আপনার হাত ধরে দেশ আজ পুরোদমে এগিয়ে যাচ্ছে। কালুরঘাটে নতুন সেতু নির্মাণের ওয়াদা আপনিও দিয়েছেন নানা সময়ে। তাই, চট্টগ্রামের কালুরঘাটে একটি দ্বিমুখী সড়ক কাম রেল সেতু নির্মাণের জরুরি ঘোষণা দিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি অর্ধকোটি দক্ষিণ চট্টগ্রামবাসীর দাবি ও স্বপ্ন পূরণ করুন। চট্টগ্রামের উন্নয়নের দায়িত্ব আপনার নিজেরÑ এই ঘোষণার দ্রুত বাস্তবায়ন দেখতে চাই আমরা। কালুরঘাটে নতুন সেতু না হলে সাংসদ মইন উদ্দীন খান বাদল যদি সত্যি সত্যি সংসদ থেকে পদত্যাগ করে বসেন তবে এটি একটি বাজে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তা আমরা দেখতে চাই না। তখন তা সরকারের জন্যও স্বস্তিদায়ক হবে না।
লেখক: সাংবাদিক, গবেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*