স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের বিপ্লবী মহানায়ক ভূপতি ভূষণ চৌধুরী সোহেল মো. ফখরুদ-দীন

স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের বিপ্লবী মহানায়ক ভূপতি ভূষণ চৌধুরী
সোহেল মো. ফখরুদ-দীনUntitled-1

ইতিহাসের কারণে বাংলাদেশের চট্টগ্রামের গৌরব সবার উপরে। কারণ বিশেষ কারণে এই চট্টগ্রামের সাথে বিমাতাসুলভ আচরণ চরমভাবে লক্ষণীয়। উন্নয়ন অগ্রগতিতে চট্টগ্রাম অনেক পিছিয়ে আছে। অথচ আজকের এই চট্টগ্রামের কালজয়ী বিপ্লবী ধারার রাজনীতি ও সাহসী সন্তানদের গৌরবগাথা ইতিহাসের কারণে আজকের বাংলাদেশ ও স্বাধীন বাংলাদেশ। চট্টগ্রামের ক্ষণজন্মা এই মহাবিপ্লবীদের মধ্যে অন্যতম হলো ভূপতি ভূষণ চৌধুরী ওরফে মানিক চৌধুরী। তিনি নিজের জীবনবাজি রেখে বাংলা নামের দেশ সৃষ্টির পিছনে অসামান্য অবদান রেখেছেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে দেশ গঠনে তাঁর ভূমিকা ছিল অসাধারণ। বাংলাদেশের স্বাধীনতাকালীন সময়ে বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের সাহায্যের ব্যাপারে চট্টগ্রামের এই ক্ষণজন্ম কৃতিপুরুষ ভূপতি ভূষণ চৌধুরী ওরফে মানিক চৌধুরী বিশেষ অবদান রেখেছিলেন। মূলত পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে বাঙালিকে মুক্তির জন্য তিনি দেশপ্রেমিক হিসেবে কাজ করেছেন। ভূপতি ভূষণ চৌধুরীর ৩৬তম প্রয়াণ দিবসে এই মহান কর্মবীরের প্রতি সশ্রদ্ধচিত্তে সম্মান প্রদর্শন করছি। তাঁর ৩৬তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্রের আয়োজনে ৩০ জুন ২০১৬ সকাল ১১টায় চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে স্বদেশপ্রেমিক মানিক চৌধুরী শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে।
ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধিকার আন্দোলন। এই আন্দোলনের আরেকটি অন্যতম ইতিহাস হচ্ছে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। এই মামলার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিণত করেছে সমগ্র বিশ্বে বাঙালির বজ্রকণ্ঠ হিসেবে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম অভিযুক্ত হলেন চট্টগ্রামের এই কৃতিপুরুষ ভূপতি ভূষণ চৌধুরী ওরফে মানিক চৌধুরী। চট্টগ্রামকে বলা হয় বিপ্লবী চট্টগ্রাম। এই চট্টগ্রাম থেকে দু’দুবার ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অগ্নিবীণা বেজে উঠে। এক. হাবিলদার রজব আলীর নেতৃত্বে, অন্যবার বীর যোদ্ধা মাস্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ঐতিহাসিক ছয়দফার সনদ চট্টগ্রামের লালদিঘির ময়দান কালজয়ী সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে। স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর প্রথম ঘোষণা কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত হয়। এতগুলো অর্জনের মহাবিপ্লব তীর্থ চট্টগ্রাম। আর সেই চট্টগ্রামের ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ ভূপতি ভূষণ চৌধুরী। তিনি কর্মের মধ্যে আমাদের মাঝে আজও জীবনের আলোকচ্ছটা ছিটিয়ে বেড়াচ্ছেন। কর্ম মানুষকে মৃত্যু থেকে আলাদা করে রাখতে পারে। তার প্রমাণ ভূপতি ভূষণ চৌধুরী। আজ থেকে ৩৬ বছর পূর্বে তাঁর দেহত্যাগ হলেও দেশপ্রেমিক নাগরিক, স্বাধীন দেশের সাধারণ নাগরিক, এক দিনের জন্য বঙ্গবন্ধুর একনিষ্ঠ বন্ধু ভূপতি ভূষণ চৌধুরীকে ভুলে নি। এটি তাঁর রাজনীতিগুণ ও দেশপ্রেমের বড় পরিচয়। মানুষ মরে যায়, পরের দিন থেকে তার স্মৃতি কেউ উল্টিয়েও দেখে না। কিন্তু ভূপতি ভূষণ চৌধুরীর ক্ষেত্রে তা বিপরীত। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা এক বাণীতে বলেছেন, “মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহকর্মী ও বিশ্বস্ত অনুসারী ভূপতি ভূষণ চৌধুরী ওরফে মানিক চৌধুরীর ওপর একটি স্মারকগ্রন্থ প্রকাশিত হচ্ছে জেনে আমি আনন্দিত। মানিক চৌধুরী ছিলেন আদর্শ ও নীতির প্রশ্নে অত্যন্ত অবিচয় একনিষ্ঠ, নিবেদিতপ্রাণ রাজনীতিবিদ। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং বাংলাদেশের জন্য তাঁর অপরিসীম ত্যাগ চিরস্মরণীয়। আগরতলা মামলায় তিনি অন্যতম অভিযুক্ত ছিলেন। বাংলাদেশের একজন বীর সন্তান হিসেবে আমি মানিক চৌধুরীর পুণ্যস্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাই, তাঁর পারলৌকিক শান্তি কামনা করি।”
ভূপতি ভূষণ চৌধুরী ওরফে মানিক চৌধুরী ১৯৩০ সালে ১৬ ডিসেম্বর পটিয়া উপজেলার হাবিলাসদ্বীপ গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত হিন্দু জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ধীরেন্দ্র লাল চৌধুরী, মা যশোদা বালা চৌধুরী। তাঁর পারিবারিক পেশা ব্যবসা, সেই সূত্রে চট্টগ্রাম শহরের খাতুনগঞ্জের রামজয় মহাজন লেইনে তাদের গদি ও বাড়ি ছিলো এবং আজও আছে। শহরের পৈতৃক বাড়িতে কেটেছে বাল্য ও শৈশবের দিনগুলি। খাতুনগঞ্জ তখন থেকেই ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য বাংলাদেশের একটি প্রসিদ্ধ স্থান। মিউনিসিপ্যাল স্কুল থেকে ইংরেজিতে লেটার নিয়ে প্রথম বিভাগে পাস করে কলকাতা যান পড়াশোনা করতে। বঙ্গবাসী কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায় রাজনীতিতে হাতেখড়ি, যোগ দেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে। আই এ পাস করেন প্রথম বিভাগে। পিতৃদেবের আকস্মিক মুত্যৃতে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হন। কিন্তু ভবিষ্যতে যাঁর জীবনের ব্রত হবে বাংলার স্বাধীনতা, তাঁকে তো বেশিদিন ব্যবসা-বাণিজ্যের সংকীর্ণ গণ্ডিতে আবদ্ধ রাখা চলে না।
১৯৪৭-এ দেশভাগের অল্পকাল পরে মানিক চৌধুরী মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসেন এবং মুসলিম লীগ বিরোধী অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে যোগ দেন। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাকাল থেকে তিনি এ সংগঠনের সাথে জড়িত হয়ে পড়েন এবং চট্টগ্রামের এম এ আজিজ ও জহুর আহমদ চৌধুরীর সাথে চট্টগ্রামে সংগঠন গড়ে তোলার কাজে আত্মনিয়োগ হন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং সেই সূত্রে অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সংস্পর্শে আসেন। অবশ্য পারিবারিক এক মামলার কৌঁসুলি হিসেবে সোহরাওয়ার্দীর সাথে আগেই তাঁর পরিচয় ঘটেছিলো। এ সময়ই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে তাঁর পরিচয় এবং ক্রমান্বয়ে বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন ও আস্থাভাজন হয়ে উঠেন তিনি। তাঁকে চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগ কার্যকারি কমিটিতে অর্থ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। ৬২’র আন্দোলন সহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল আন্দোলন, বিশেষ করে ছয় দফা আন্দোলনে তাঁর ভূমিকার জন্যে তিনি চট্টগ্রামের রাজনীতিতে অন্যতম মুখ্য ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। ৬৬’র ২০ মে রাতে পাকিস্তান প্রতিরক্ষা আইনে ভূপতি ভূষণ চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হয় এবং তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় জড়িত করে তাঁর বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হয়। কারাগারে তাঁর ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। ৬৯’র গণঅভ্যুত্থানে তিনি মুক্তি পান কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যে ইয়াহিয়ার সামরিক জান্তা তাঁকে আবার গ্রেফতার করে। ১৯৭০’র শেষ দিকে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করার কাজে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।
৭৫’র ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু হত্যার এক সপ্তাহ পর মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ সহ তাঁকে আবারো ঢাকা থেকে গ্রেফতার করে তাঁর বিরুদ্ধে একটি মিথ্যে মামলা দায়ের করা হয় এবং সামরিক আইনের আওতায় সাজা দেওয়া হয়। ১৯৭৫ আগস্ট থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর তিনি জেলে বন্দি জীবন-যাপন করেন। বন্দি থাকা অবস্থায় তৎকালীন সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান তাঁকে নানা প্রলোভন দেখিয়ে তাঁর দলে যোগদানের প্রস্তাব দেন। কিন্তু সমস্ত প্রস্তাব তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।
১৯৮০ সালের ১৮ মার্চ মারাত্মক অসুস্থতা নিয়ে জেল থেকে বেরিয়ে আসেন মানিক চৌধুরী এবং চিকিৎসকের পরামর্শে উন্নততর চিকিৎসার জন্য নয়াদিল্লি যাওয়ার পথে ১৯৮০ সালে ৩০ জুন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ভোর রাতে কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পরলোকগমন করেন। বাংলার স্বাধীনতা ও স্বদেশি আন্দোলন এবং দেশপ্রেমের উজ্জ্বল নক্ষত্র এই মহান মনীষীর ৩৬তম প্রয়াণ দিবসে বিনম্রচিত্তে শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি।

লেখক: সোহেল মো. ফখরুদ-দীন, সভাপতি, চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্র।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*