চট্টল সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পরিচিত নাম দীপালী ভট্টাচার্য

চট্টল সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পরিচিত নাম দীপালী ভট্টাচার্য
সোহেল মো. ফখরুদ-দীনdipali-battacharjee

চট্টগ্রাম সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অতি পরিচিত নাম কবি দীপালী ভট্টাচার্য। সাহিত্য-সংস্কৃতি কর্মকাণ্ড ও সৃজনশীল সামাজিক কার্যক্রমে এই মানুষটির সদা উপস্থিতি বর্তমান প্রজন্মকে আলোর পথে উৎসাহিত করে। শিক্ষাবিদ হিসেবে খ্যাতিমান এই দীপালী ভট্টাচার্য চট্টগ্রাম জেলার রাউজান থানার বিপ্লবী পুরুষের নোয়াপাড়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মণ পরিবারে ১৯৪৯ সালের ১৮ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন। পিতা প্রয়াত অ্যাডভোকেট বগলা চরণ ভট্টাচার্য, মাতা প্রয়াত নিরূপমা দেবী। শিক্ষা জীবন থেকেই তিনি সাহিত্য চর্চা করছেন। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় প্রায় আড়াইশ পৃষ্ঠার মধুমিলন নামে একটি উপন্যাস লিখেছিলেন, খুলনা থেকে ফেরার পথে তা হারিয়ে যায়, তবুও তার লেখা থেমে নেই। বর্তমানেও বিভিন্ন দৈনিক সাপ্তাহিক ও সাহিত্য সাময়িকীতে নিয়মিত লিখছেন। এ যাবত কবিতা, গল্প, উপন্যাস, শিশুসাহিত্য সহ প্রায় ২০টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। বিবাহিত জীবনে স্বামী সুধীর কান্তি চৌধুরী ও তিন সন্তানের উৎসাহ ও প্রেরণায় সাহিত্যের সকল শাখায় তার অবাধ বিচরণ। পেশাগত জীবনে তিনি একজন প্রিয় প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে অবসর গ্রহণ করেছেন। চট্টগ্রাম বেতার, নন্দিনী সাহিত্য ও পাঠকচক্র, চট্টগ্রাম লেখিকা সংঘ, চট্টগ্রাম একাডেমি, চাঁদের হাটসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে তিনি জড়িত আছেন। শিক্ষাগত যোগ্যতা এম.এ.বি.এড ডি.এইচ.এম.এস। সাহিত্য চর্চার স্বীকৃতি স্বরূপ চাঁদের হাট, চট্টগ্রাম লেখিকা সংঘ, রোটারী পুরস্কার, স্বামী বিবেকানন্দ পুরস্কার ও সংবর্ধনাসহ শ্রেষ্ঠ শিক্ষিকা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। শিল্প-সাহিত্য অঙ্গনে অবদানের জন্য বাংলা সাহিত্য পদক ২০০৩, চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্র সাহিত্য স্মারক সম্মাননা, বঙ্গ অসম উৎকল আন্তর্জাতিক ভাষা সম্মাননা, বাংলা কবিতা সংসদ পদক ১৪১০ ও নেপাল ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতি সম্মাননা-২০১৬ লাভ করেন। শিশু সাহিত্যের জন্য ড. আশরাফ সিদ্দিকী ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রবর্তিত স্বর্ণপদক ২০০৪ ও আমেরিকা থেকে ওমেন অফ দ্যা ইয়ার ২০১১-এর সম্মান অর্জন করেছেন।

প্রশ্ন: আপনার জন্ম, শৈশব, কৈশোর, ছাত্রজীবন ও বেড়ে ওঠা সম্পর্কে বলুন।
দীপালী ভট্টাচার্য: নারী জীবনে জন্ম, শৈশব, কৈশোর বলতে কিছুরই তেমন মূল্য নেই। তারপরও আপনার প্রশ্ন সাপেক্ষে কিছু তো বলতেই হবে। বার আউলিয়ার পুণ্য তীর্থভূমি চট্টগ্রামের রাউজান থানার নোয়াপাড়া গ্রামে আমার জন্ম। যে রাউজানে জন্ম নিয়েছেন বিশ্বের সেরা কিছু ব্যক্তিত্ব, দেশের তো বটেই। জন্ম হয়েছে নোয়াপাড়া গ্রামে, তবে মাত্র তিন/চার বছর বয়সে চলে আসতে হয়েছে চট্টগ্রাম শহরে।
জন্ম ১৯৪৯ সালের ১৮ই অক্টোবর দিনটা ছিল সোমবার। শৈশব কেটেছে টেরীবাজার কুঞ্জ সাধুর আশ্রম নামক লোকালয়ে বন্ধু-বান্ধবীদের সাথে। বলা বাহুল্য শৈশবে বান্ধবীদের সাথে খেলাধুলা মেয়েলী জীবনধরণ আমার পছন্দ হতো না, আমি ছেলে বন্ধুদের সাথে মার্বেল, হা-ডু-ডু, দাঁড়িয়াবান্দা ঘুড়ি উড়ানোতেই বেশি আনন্দ পেতাম। অর্থাৎ ছেলেমেয়েতে সত্যিকারের পার্থক্যটা আমি তেমন বুঝতাম না। এজন্য মা সবসময় রাগ করতেন। কিন্তু বাবা বলতেন ও বুঝতে শিখলে সব ঠিক হয়ে যাবে। শৈশবে স্কুল আর বাঁধাধরা নিয়ম কানুন আমার একেবারেই না পছন্দের ছিল। মেয়েদের স্কুলে নেবার জন্য প্রতিদিন ঝি আসতো। তখন আমার নাম ছিল শান্তি। ঝি-এর ডাক শুনলেই লা-পাত্তা হয়ে যেতাম। ঝি রাগে গজ গজ করতে করতে বলতেন, শান্তিটা রোজ রোজ বড় অশান্তি করে। প্রথম শ্রেণিতে ঘাট ফরহাদ বেগ মিউনিসিপ্যাল বালিকা বিদ্যালয়ে আমার পিঠাপিঠি বোন নমিতা ডাক নাম যার পুষ্প, তার সাথে স্কুলে যাবার জন্য ভর্তি করে দেন। স্কুলে কতদিন গিয়েছে মনে পড়ে না। তবে একদিন পৌর কর্পোরেশন থেকে ডাক্তার আসলেন দুজন মহিলা। ইনজেকশান দেবার জন্য, সূঁচ ফুটানোর সময় মেয়েরা কাঁদছে দেখে ভয় পেয়ে গেলাম। দরজায় দাঁড়িয়ে পাহাড়া দিচ্ছিলেন বিজন মাসীমা। বললাম, মাসীমা আমি একটু বাথরুমে যাবো। বললেন, যা তাড়াতাড়ি আসিস। আমার ভাগ্যটা ভালো এজন্য যে বাথরুমটা ছিল স্কুলের গেইটের কাছেই। আমি গেটের কাছে গিয়েই ভোঁ দৌড়, ফিরেও তাকালাম না। আদর্শ লিপি, শ্লেট আর পেন্সিল পড়ে থাকলো ক্লাস রুমে। বাসা ছিল কাছেই। ঘরে এলে হাঁপাচ্ছি দেখে মা বললেন, বই খাতা কোথায়? শুধু বললাম, আমি আর কখনো স্কুলে যাব না। আমার দিদি আমার চাইতে তিন চাইতে তিনি চার বছরের বড়। ও আমার শ্লেট বই নিয়ে এসে সবিস্তরে মাকে সব বললো। বাবা কোর্ট থেকে ফিরলে মা সব খুলে বললেন খুব বিরক্তি সহকারে। বাবা বললেন, সব ছেলেমেয়ে তো আর সমান হয় না। আমাকে ডেকে বাবা বললেন, কী রে মা, তুই নাকি বলেছিস আর কোনদিন স্কুলে যাবি না। বললাম, ওখানে ইনজেকশান দেয়। বাবা হেসে উঠলেন, বোকা মেয়ে তোদের যাতে অসুখ বিসুখ না হয় সেজন্যই তো ডাক্তার এসে প্রতিষেধক দেয়। বাবা হেসে উঠলেন, বোকা মেয়ে তোদের যাতে অসুখ বিসুখ না হয় সেজন্যই তো ডাক্তার এসে প্রতিষেধক দেন। বললাম, তুমি জান না বাবা, ওরা যেমনি ইনজেকশান দিয়েছে ওমনি সবাই কাঁদছিল।
এরপর আর স্কুলমুখো করতে পারেনি শৈশবে আমাকে। ঘরে বসেই চলতো দিদির সাথে সাথে সামান্য লেখাপড়া। দুবছর দেখতে দেখতে কেটে গেল। বাবা বললেন, মহা মুশকিল দেখছি।
নাহ ওকে আর কাছের কোন স্কুলে নয়, দূরের স্কুলে ভর্তি করাতে হবে, যাতে পথঘাট চিনে বাড়ি না আসতে পারে। বাবা এবার বাসা থেকে প্রায় দেড়মাইল দূরে কুসুমকুমারী সিটি কর্পোরেশন গার্লস স্কুলে ৪র্থ শ্রেণিতে নিয়ে ভর্তি করিয়ে দিলেন। দিদি ভর্তি হলো ৫ম শ্রেণিতে। ঐ স্কুলে গিয়ে কিছুটা মন বসলো। অন্য পরীক্ষার কথা তেমন মনে নেই। তবে বার্ষিক পরীক্ষায় দুর্ভাগ্যক্রমে বায়ান্ন জনের মধ্যে ৪র্থ শ্রেণিতে প্রথম হয়ে গেলাম। রেজাল্ট দেখে বাবার সেদিন সে কি আনন্দ। মাকে বললেন, দেখলে তো আমার ঝুনু কেমন তাক লাগিয়ে দিল সবাইকে। এখানে বলতে হয় ঝুনু-রুনু আমাদের দুবোনের নাম রেখেছিলেন আমার দুলাভাই। এখন সমস্যা হলো আমার ছোড়দি অর্থাৎ পুষ্প যাবে ষষ্ঠ শ্রেণিতে, তাই তাকে হাই স্কুলে ভর্তি হতে হবে। তাহলে আমাকে গাইড দেবে কে! তাছাড়া দুবোন একই ক্লাসে পড়লে বই পত্রের খরচও অনেক কমে যাবে, এটা ভেবে বাবা দিদির সাথে একই ক্লাসে ষষ্ঠ শ্রেণিতে আমাকে পঞ্চম শ্রেণি ডিঙ্গিয়ে ভর্তি করিয়ে দিলেন। ষষ্ঠ শ্রেণিতে আমি নিয়মিত ছাত্রী হয়ে গেলাম। পরীক্ষায় ডবল প্রমোশন নেবার পরও বিরানব্বই জনের মধ্যে আমি ৫ম স্থান অধিকার করে নিলাম। ষষ্ঠ এবং সপ্তম মাত্র দুটো বছর চট্টগ্রাম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়েছি।
বড়দাদা চাকরি করেন খুলনা। তাই বৌদির সাথে পাঠানো হলো লেখাপড়া করার জন্য আমাকে খুলনায়। তখন আমি অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। বিদেশবিভূই ওদের ভাষায় কথা বলতেও আমার কষ্ট হয়। তারপরও ২/৩ মাসের মধ্যে সবার কাছে প্রিয় হয়ে গেলাম। অর্ধবার্ষিক পরীক্ষায় তৃতীয় স্থান এবং বার্ষিক পরীক্ষায় ২য় স্থান লাভ করলাম। খুলনা পাইওনিয়ার স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম। এখন সেটা কলেজে উন্নীত হয়েছে। খুলনা যাবার পর বদলে গেল জীবন ধারা। খুব চুপচাপ সারাদিন বই পড়া, স্কুলে যাওয়া। একবার স্কুলে ডাকঘর নাটক হবে তাই স্যার অনেকের পরীক্ষা নিলেন। আমাকে পাট দিলেন অমলের দাদুর। শ্রদ্ধেয় স্যার আমাকে অত্যন্ত øেহ করতেন। পিতৃতুল্য এক স্যার ছিলেন মনমথো স্যার। পড়াতেন ইংরেজি গ্যালিভার ট্রাভেলস, সেভেন ইনভেটরস। উনি আদর করে ডাকতেন পাইওনিয়ারের কালিদাস বলে। উনি বলতেন আমি নাকি উপমায় কালিদাস-এর মত।
কালিদাস ডাকতেন বলে মাঝে মাঝে খুব রাগ হতো। স্যারের সাথে কথা বলতাম না। স্যার বলতেন, পাগলী কালিদাস কতবড় কবি ছিলেন ভাবতে পারিস? তখনও কালিদাস সম্পর্কে জানা হয়নি। এখন ভাবি স্যার কতটা øেহ করে আমাকে ডাকতেন পাইওনিয়ারের কালিদাস বলে। স্যারের কথা মনে হলে এখনও দুচোখ ঝাপসা হয়ে যায়। স্যার আপনি যেখানেই থাকুন খুব ভালো থাকুন। আপনার পাগলীর এটাই একান্ত প্রার্থনা।

প্রশ্ন: লেখালেখিতে কীভাবে এলেন, প্রথম লেখা কি ছিল?
দীপালী ভট্টাচার্য: যখন আমি ৪র্থ শ্রেণির ছাত্রী তখন আমার বড়দার বিয়ে হয়। তখন মানুষ বিয়েতে বই উপহার দিত। আমার মনে আছে দাদা ও বৌদি ৯৬টা বই গিফট পেয়েছিলেন। প্রায় বই বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, নীহার রঞ্জন গুপ্ত, দেবানন্দ, ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়, তারাশংকরসহ আরো অনেকের লেখা উপন্যাস। সবচাইতে কঠিন ছিল আমার কাছে সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস। যেমন কঠিন কঠিন শব্দ তেমনি শব্দের মর্ম উদ্ধারও কঠিন। তখন এ ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করতেন আমার বাবা স্বর্গীয় অ্যাডভোকেট বগলা চরণ ভট্টাচার্য। অষ্টম শ্রেণিতে থাকতেই একটা স্কুলের খাতায় ২৩৬ পৃষ্ঠার একটা উপন্যাস ‘মধু মিলন’ নামে লিখেছিলাম। কাহিনী ছিল মধু নায়িকা মিলন নায়ক। দুজন দুজনকে ভালোবাসা, কিন্তু ধর্মের করিডোর পার হতে পারলো না। মিলন নিরুদ্দেশ হলো, মধু বিয়ে করলো না, নার্সের চাকরি নিল। মিলন বিয়ে করেনি। শেষ দৃশ্যে মিলন হাসপাতালের কেবিনে। হঠাৎ রোগীর অবস্থা খারাপ দেখে সিনিয়র নার্স মধুকে ডেকে আনা হলো। মধু দেখেই মিলনকে চিনে ফেলে। মধুকে দেখে মিলন বলল, আমি জানতাম দেবদাসের মতো শেষকালে হলেও আমার পার্বতীকে দেখতে পাব। কিন্তু দুঃখের বিষয় খুলনা থেকে চট্টগ্রাম আসার পথে ভৈরব স্টেশরে আমাদের বেডিংটা চুরি হয়ে যায়। সেখানে সযতেœ রাখা ছিল আমার খাতা ও কিছু সূচীশিল্পের কাজ। বাবাকে দেখানোতো হলোই না বরং আমার উপন্যাসের দরজা সেই যে বন্ধ হলো আজ অবধি তা আর খোলা সম্ভব হলো না আমার। তারপর দীর্ঘদিন আমি লেখালেখি করিনি। এসএসসি পরীক্ষা দেবার পরপরই আমার বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের পর আই.এ পাশ করলাম। বলা চলে একরকম কলেজ নাম থাকলেও না গিয়ে প্রাইভেট রেগুলার বি.এ, ১৯৭১-এ এম.এ, ১৯৭৪ বি.এস ডিগ্রী লাভ। বলতে পারেন আমার লেখালেখি আনুষ্ঠানিক ভাবে শুরু হয় ১৯৭৩ থেকে। রেডিওতে নিয়মিত নাটিকা, ধারাবাহিক জীবন্তিকা, ছোটগল্প ইত্যাদি প্রচার হতো। স্থানীয় পত্র-পত্রিকায়ও নিয়মিত লিখতে শুরু করি। বিশেষ করে ছোট গল্প। একদিন কবি ও সাংবাদিক আমার শ্রদ্ধেয় দাদা অরুণ দাশগুপ্ত বললেন, দীপালী তোমার তো লেখার হাত ভালো। গল্প মেয়েরা প্রচুর লেখে। তুমি এবার গল্প না লিখে প্রবন্ধ লিখতে শুরু করো। সেই যে মন্ত্র শোনাল দাদা। তারপর থেকে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়, নয়াবাংলা, আজাদী, পূর্বকোণ, অনুবীক্ষণ, স্বাধীনতা, কর্ণফুলী, চট্টলা, সুপ্রভাত, ভোরের কাগজ, রূপালী, জনকণ্ঠ, সংবাদ এসব কাগজে প্রায় হাজার/বারশো প্রবন্ধ আমি লিখেছি। তার কিছু আছে, কিছু কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে স্বাভাবিকভাবেই। আর কবিতা হলো আমার মনের অনুভূতি, আবেগ। আমি মানুষটা খুবই খেয়ালী, হেয়ালী, আবেগী এবং অভিমানী। বাউণ্ডুলে প্রকৃতির, কোন কিছুই গুছানো নয়, সবকিছু কেমন যেন এলোমেলো। একজন্য সময় মতো অনেক কিছুই করতে পারি না।

প্রশ্ন: আপনার প্রকাশিত গ্রন্থ কখন কীভাবে প্রকাশিত হয়েছিল, এ পর্যন্ত কতগুলো বই প্রকাশিত হয়েছে?
দীপালী ভট্টাচার্য: আমি পত্র-পত্রিকায় লিখতাম। কিন্তু বই বের করার কথা কখনো চিন্তা করিনি। আমার ছেলে উৎপল কুমার চৌধুরী। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আমার কিছু ছোটগল্প নিয়ে নিজ উদ্যোগে দুটি বই বের করে ১৯৯৬ সালে। ‘স্বপ্ন-সুখ-ভালোবাসা’ ও ‘বিন্দু থেকে বৃত্ত’। এরপর শৈলী প্রকাশন থেকে কবি রাশেদ রউফ এর উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় আমার প্রথম রূপকথার আদলে ছোটদের জন্য লেখা গল্পগুলি নিয়ে বের করা হয় ১৯৯৮ সালে ‘ভূতের দেশে রাজকন্যা’। এরপর বের হয়েছে রাজকন্যা, হীরামতি ও দৈত্যরাজ; এই প্রেম এই যুদ্ধ, খোলাচোখে বন্ধু দুয়ার, তিন প্রজন্মের কবিতা, সুখে থেকো, ইচ্ছেপরী ও তুতুন, শিয়াল মামার বিয়ে, কিছু কথা কিছু ব্যথা। প্রতিভা প্রকাশন থেকে রূপকথার আদলে লেখা গল্পগুলি নিয়ে প্রকাশক, কবি, সম্পাদক মঈন মুরসালিন বের করেছে ছোটদের গল্প সমগ্র। বইটা পাঠক মহলে সমাদৃত হয়েছে বলে শুনেছি।

প্রশ্ন: লেখালেখির জন্য আপনি কী পুরস্কৃত হয়েছেন?
দীপালী ভট্টাচার্য: সত্যি করে বলছি, এ মনিহার আমার নাহি সাজে। এ পর্যন্ত বিভিন্ন সংগঠন থেকে সংবর্ধনা সম্মাননা ও ক্রেস্ট পেয়েছি প্রায় ৩৮/৩৯টা। আমার কাছে সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার হচ্ছে পাঠকের ভালোবাসা।

প্রশ্ন: সাহিত্য চর্চায় কাদের লেখা আপনাকে অনুপ্রাণিত করে?
দীপালী ভট্টাচার্য: সত্যি বলতে অতীতে পড়া গল্প, উপন্যাস, ছোটদের জন্য লেখা বিভিন্ন ধরনের বইগুলিই আমার চিন্তা চেতনায় বীজ বপন করেছে। যে কারণে আলাদা ভাবে কাউকেই মনে করতে পারি না। তবে কবিতার ক্ষেত্রে বিদ্রোহী কবির কবিতাগুলি আমাকে প্রেরণা যোগায়, অনুপ্রাণিত করে। আমি একজন নির্ভেজাল পাঠক এবং একজন লেখক। কারণ যে বেশি বেশি খায় তিনি খাদক, আর আমি যা মনে আসে তাই লিখি আর এজন্যই মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি আমি একজন নিষ্ঠাবান লেখক। যে লেখার শ্রেণিভাগ না করেই নিরন্তর ঝর্ণাধারার মতো লিখে আনন্দ পায়। পাবনার কবিতা সংসদের কবি, লেখক, সংগঠক, সম্পাদক আমার নিয়ে বিভিন্ন জ্ঞানী গুণী ব্যক্তিত্বের লেখা দিয়ে একটা বই বের করেছেন বইটার নাম দিয়েছেন ‘নির্ঝরিনী’। মাঝে মাঝে ভাবি এই নামটা কীভাবে উনি দিলেন। কবি সাংবাদিক শরীফা বুলবুল লাকীও আমার নামের অনেক বিশেষণ যোগ করেছে ‘ঝর্না’র মতো।

প্রশ্ন: কী হতে চেয়েছিলেন আর কী হলেন?
দীপালী ভট্টাচার্য: কী হতে চেয়েছিলাম বলা মুশকিল। কারণ আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি সবকিছুই নির্ধারণ করেন পরম করুণাময়, মঙ্গলময়, দয়াময়, সৃষ্টিকর্তা। জীবনে যা কিছু পেয়েছি সবই সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা। তবে একথা বলতে পারি, মনেপ্রাণে আমি একজন সত্যিকার ভালো মানুষ হতে চেয়েছি এবং এখনো তাই চাই। মানুষের জীবনে সবচাইতে বড় পাওয়া হচ্ছে একজন ভালো মানুষ হওয়া, সত্যিকারের মানুষ হওয়া। যদিও দুঃখ হয় নারী জন্ম নিয়েছি বলে বলতে হয় সুযোগ চাই মানুষ হবো।

প্রশ্ন: সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে কখনো কি কোনো প্রতিবন্ধকতায় পড়েছেন, কিংবা কারো অনুপ্রেরণা, যা স্মরণীয়?
দীপালী ভট্টাচার্য: ঘরে বসে বসে বিছানার উপর রাত জেগে জেগে পাতার পর পাতা খাতার পর খাতা লিখি। অবস্থা ও পরিস্থিতির কারণে মাঝে মাঝে কেন লিখি এজন্য কষ্ট পাই, কিন্তু না লিখে যে থাকা যায় না। অনুপ্রেরণার কথা বলছেন, ছোটবেলায় আমার বাবা, বিয়ের পরে স্বামী সুধীর কান্তি চৌধুরীর সন্তানরা এবং অতপর আমার সুপ্রিয় পাঠক বন্ধুরা যারা একটু প্রশংসা করলেই নিজেকে ধন্য মনে হয়। তবে এটাও ঠিক আমার লেখা কোন এক শ্রেণির বিশেষ পাঠকের উদ্দেশ্যে নয়, লিখি সমাজ, মানুষ, রাষ্ট্র ও মানবতার কল্যাণের জন্য। যদি লেখা পড়ে কিছু কেউ খুঁজে পান, কারো কোন উপকারে লাগে এ আশায়।

প্রশ্ন: আপনার পারিবারিক জীবন সম্পর্কে বলুন?
দীপালী ভট্টাচার্য: আমার বাবা ছিলেন বৃটিশ আমলের অ্যাডভোকেট। কিন্তু তাই বলে আমাদের আর্থিক প্রাচুর্য বলতে যা বুঝায়- বাড়ি, গাড়ি ছিল না। বাবা প্রয়াত বগলা চরণ ভট্টাচার্য, মা প্রয়াত নিরূপমা দেবী। আমরা চার ভাই ছয় বোন। সবাই স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। বাবার আদর্শ ছিল, সিম্পল লিভিং হাই থিংকিং। এই আদর্শ তার সন্তানদের ভেতরেও শিকড় গজিয়েছে। বাবা সবসময় বলতেন আমার সন্তানেরাই আমার সম্পদ আর স্বর্গসুখ। শ্বশুর শাশুড়িও খুব আদর করে আমাকে পুত্রবধূ বিয়ে করে ঘরে তুলেন। কিশোরী, সংসার ধর্ম বুঝি না। আমার শাশুড়ি মা পরম মমতায় আমাকে সব শিখিয়েছেন। খুব গর্ব ভরে বলতেন, আমার বৌমার মতো বৌ কজনের আছে, এমন বৌমা লাখে একটা। এক দেবর ও পাঁচ ননদ। ওরাও যার যার জায়গায় প্রতিষ্ঠিত। দুঃখের বিষয় মা-বাবা, দুই ভাই, একবোন ও শ্বশুর-শাশুড়ি প্রয়াত হয়েছেন। আমার একমাত্র ছেলে উৎপল চৌধুরী ও বৌমা ডালিয়া চৌধুরী আমেরিকায় প্রবাসী।

প্রশ্ন: আপনার জীবনে কী প্রেম এসেছিল?
দীপালী ভট্টাচার্য: প্রেম শব্দটা শুনলে খুব দুঃখ হয়, প্রেম একবার এসেছিল নিরবে। প্রায়ই ছেলেরা প্রেম প্রেম ভাব নিয়ে কাছে আসতে চাইতো; কিন্তু প্রেম শব্দটা শুনলেই আতঙ্কে ভুগতাম পাছে লোকে কিছু বলে। শেষ পর্যন্ত প্রেমে পড়লাম আপনার দাদাবাবুর। না পড়ে আর উপায় কী বলুন, তোমার হৃদয় যা আমার হৃদয়ও তা বলে হাতের উপর হাত দিয়ে অগ্নি-দেবতা সাক্ষী রেখে যে গাঁটছড়া বেঁধেছি। মাঝে মাঝে বড় জানতে ইচ্ছে করে প্রেম ভালো না বিয়ে ভালো। কোনটা কেমন করে? আমরা তো পরজন্ম বিশ্বাস করি। এ জন্মে বিয়ে হলো যদি সম্ভব হয় পরজন্মে প্রেম করে দেখবো। প্রেমের মরা জলে ডুবাতে পারি কিনা।

প্রশ্ন: এই সময়ের সাহিত্যকর্ম এবং সাহিত্যকর্মী সম্পর্কে বলুন।
দীপালী ভট্টাচার্য: এই প্রশ্নটা যত সোজা উত্তরটা সরল অংকের মতই বিশাল এবং জটিল। সাহিত্য হচ্ছে মাথার ভিতরে কোন এক বোধ যা কাজ করে অথবা কেউ কেউ খুঁড়ে খুঁড়ে বেদনা জাগায়। সাহিত্য জীবনের আনন্দ, জীবন পথের আলো, বাসবে সবাই ভালো। সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র তার বিষবৃক্ষ উপন্যাসের শেষ লাইনটা লিখেছিলেনÑ বিষবৃক্ষ শেষ করিলাম, আশা করি ঘরে ঘরে অমৃত ফলিবে। সাহিত্যকর্ম হবে সুন্দরের পূজারী। প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও প্রকাশের ভাষা। সাহিত্যকর্মী হবে নির্মোহ, নির্লোভ, নির্ভেজাল, নিরন্তর একজন সুন্দর ও ভালো মনের মানুষ। সত্যিকারের সাহিত্য কেবল যমুনা পাড়ের তাজমহল দেখেই দেখা শেষ করতে পারেন না। তাকে বুঝতে হবে মমতাজ মহলের প্রতি সম্রাট শাহজাহানের ভালোবাসার গভীরতা। সাহিত্যচর্চার প্রথম শর্তই হচ্ছে দেখো-বুঝো-লেখো, দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে চলো।
অস্থির হলে সাধনা ব্যাহত হবে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো বলতে হবে, যা পেয়েছি যা দেখেছি তুলনা তার নাই। লেখা থাকলে অবশ্যই পৌঁছে যাবে তাই।

প্রশ্ন: আপনি কী মনে করেন একজন কবি, সাহিত্যিক বা লেখক কোন একটা দল-জাতি বা দেশের?
দীপালী ভট্টাচার্য: সাহিত্যিক সবসময় নিরপেক্ষ, স্বাধীন এবং কল্যাণমুখী চিন্তা করবেন। কবি সাহিত্যিক অবশ্যই দল, দেশ অথবা জাতিকে ভালোবাসতে পারেন বলা বাহুল্য সেখানেও পক্ষপাতিত্ব করা ঠিক নয়। আমি আমার দেশকে ভালোবাসব এটাই স্বাভাবিক; কিন্তু তাই বলে অন্যের দেশটাকে, জাতিটাকে কিংবা দলটাকে ছোট করে ভাবার কোন অবকাশ নেই। পক্ষপাতমূলক সাহিত্য গোষ্ঠীগত পাঠক সৃষ্টি করতে পারে; কিন্তু তা সাধারণ জনগণের হৃদয়ের ভিত্তিমূল পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবে কিনা সন্দেহ আছে। সাহিত্য হবে সকলের কল্যাণ-মঙ্গল-আলোকে নিবেদিত। সাহিত্যে আমার বলে কিছু থাকে না, থাকবে আমাদের চিন্তা-চেতনা ও মনন বোধ। সাহিত্যচর্চা কোন প্রেমপত্র লেখা নয় প্রেমিকের পত্র। যা রচিত হবে দেশকালপাত্রের ঊর্ধ্বে সবার জন্য সকলের জন্য এবং সব সময়ের জন্য।

লেখক: সভাপতি, চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্র।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*