আরাকান ও রোহিঙ্গা মুসলমান

thঅধ্যাপক সরোজ বড়ুয়া :: মায়ানমারের আরাকান প্রদেশের মুসলমান জাতি গোষ্ঠী রোহিঙ্গারা বাংলাদেশসহ বিশ্ব সমাজের জন্য বিগত কয়েক দশক যাবৎ এক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেখানে বারবার সহিংস ঘটনা ঘটে। বারংবারের সহিংসতায় সেখানে গণ-মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। প্রত্যেকবার হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে পূর্ব-পুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে, শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় গ্রহণ করতে হয়। প্রতিবারের সহিংসতার পরপর হাজার হাজার রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ যেকোন সুযোগে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের আশায় নৌকায় নাফ নদীতে ভাসতে থাকে।

বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী অতীতে অনেকবার বাংলাদেশ সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবশে বাধা না দিলেও, সম্প্রতি বাংলাদেশের সরকারী সিদ্ধান্তের পরিবর্তন ঘটেছে। এখন বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড চূড়ান্ত সর্তক অবস্থায় থাকে রোহিঙ্গাদের অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকানোর জন্য। বাংলাদেশ সরকার এখন মনে করে, মায়ানমার সরকারের ইচ্ছাকৃত এই উসৃঙ্খলতাকে আর প্রশ্রয় দেয়া যায় না। তাছাড়া বাংলাদেশের মতো একটি দূর্বল অর্থনীতির দেশের পক্ষে তার প্রতিবেশী দেশের একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য আশ্রয় দেয়ার সুযোগও সীমিত। তাই বাংলাদেশ বিশ্ব সমাজের কাছে রোহিঙ্গা সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেয়ার জন্য আহ্বান জানিয়ে আসছে।

মায়নমারের সর্বমোট ভৌগোলিক এলাকার ষাট শতাংশে বাস করে ১৪০টির মতো নৃতাত্ত্বিক জাতি-গোষ্ঠী। ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতা এই যে, রোহিঙ্গারা এই ১৪০টি নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর একটি। অথচ, মায়ানমারের সরকারী নথিপত্রে প্রাপ্ত নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর তালিকা হতে রোহিঙ্গাদের নাম সু-কৌশলে বাদ দেয়া হয়েছে। কিন্ত ১৯৬২ পূর্ববর্তী তালিকায় রোহিঙ্গাদের পাওয়া যায়। মায়নমারের পঞ্চাশ মিলিয়ন মানুষের মধ্যে প্রায় আট মিলিয়ন হলো মুসলমান। এই আট মিলিয়ন মুসলমানের মধ্যে সাড়ে তিন মিলিয়ন হলো আরাকানে বসবাসকারী রোহিঙ্গা। দেখা যাচ্ছে যে, মায়নমারের সর্বমোট জনগোষ্ঠীর বিচারে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা তাদেরকে তালিকা থেকে বাদ দেয়ার সরকারী সিদ্ধান্তকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ফলে, এই সিদ্ধান্তটিকে একটি রাষ্ট্রীয় দূরভিসন্ধি বললে অত্যুক্তি হয় না। তবে মানতে হবে যে, মায়নমার সরকারের অব্যাহত অত্যাচারে আরাকানের অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরব সহ বিভিন্ন দেশে বৈধ-অবৈধভাবে  চলে গেছে; ফলে এখন মায়নামারে রোহিঙ্গা সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে।

বৃটিশ শাসনামলের আরাকানের জনসংখ্যার প্রকৃত অবস্থা পর্যালোচনা করলে এই অঞ্চলে মুসলমানদের অস্তিত্বের প্রাচীনত্ব প্রমানিত হয়। ১৭৫৭ সনে ইংরেজদের হাতে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার পতনের পর খুব অল্প সময়ের মধ্যে অর্থাৎ ১৭৬০ সনে চট্টগ্রাম ইংরেজদের দখলে চলে আসে। এরপর চট্টগ্রামের ইংরেজ এবং বর্মী রাজের মধ্যে বেশ কয়েকবার সীমান্ত সংঘর্ষ ঘটে। অবশেষে ১৮২৫ সনের ইংরেজ-বর্মী যুদ্ধের মাধ্যমে আরাকান ইংরেজদের অধীনে আসে। ইংরেজ প্রশাসন চট্টগ্রামের তদানীন্তন ম্যাজিষ্ট্রেট মি. রবাটসনকে আরাকানের প্রথম বেসামরিক শাসক নিয়োগ করেন। তিনি ভারতের গর্ভনর জেনারেলকে সেই সময়ের আরাকানের জনসংখ্যা সম্পর্কে যে প্রতিবেদন পাঠান তাতে দেখা যায় যে, ঐ সময়ে সেখানে ৬০ হাজার মগ, ৩০ হাজার মুসলিম এবং ১০ হাজার বর্মী ছিল। অর্থাৎ বৃটিশ শাসনের প্রারম্ভেই আরাকানে মোট জনগোষ্ঠির ৩০ শতাংশ মুসলমান ছিল। ১৯১১ সনের আদমশুমারীতেও আরাকান প্রদেশে ৩৩% মুসলমানের অস্তিত্ব স্বীকার করা হয়।

১৯৮১ সনে মায়ানমারের সামরিক সরকার স্বৈরাচারী মেজাজে আরাকানের সব মুসলমানকে এক তরফাভাবে বিদেশী বলে ঘোষণা করে। তারা আরাকানের মুসলমানদের একটি অতি ক্ষুদ্র, তথা নগন্য জাতি গোষ্টি দেখানোর জন্য তাদের সংখ্যা বারবার দুই লক্ষ বা তারও কম করে দেখানোর চেষ্টা করেছে। শুধু তাই নয় ১৯৮২ সনে মায়ানমারের জান্তা সরকার শুধুমাত্র রোহিঙ্গা মুসলমানদের নিজভুমি হতে উৎখাতের হীন উদ্দেশ্যে এক নিবর্তন মূলক নাগরিকত্ব আইন জারি করে। এই আইনে মায়নমারে বসবাসকারী জনগনকে তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়। প্রথম শ্রেণীকে বলা হলো জাতীয় নাগরিক, কারণ তারা সেই দেশে বৃটিশ অধিগ্রহনের পূর্ব হতে বসবাস করে আসছে। আবার বৃটিশ শাসনামলে বা তৎ পরবর্তী সময়ে যারা মায়ানমারে প্রবেশ করেছে তাদেরকে এই আইনে অন্য দুটি পৃথক শ্রেণীতে ভাগ করা হয়।

প্রথম শ্রেণীতে যারা থাকল তাদেরকে বলা হলো সহযোগী নাগরিক। এরা বৃটিশ শাসনের সময় মায়ানমারে প্রবেশ করলেও, এরা ১৯৪৮ সনের নাগরিকত্ব আইনের অধীনে নাগরিকত্বের জন্য সরকার বারাবরে আবেদন করেছে। আর যারা বৃটিশ শাসনামলে মায়নমারে প্রবেশ করলেও ১৯৪৮ এর নাগরিকত্ব আইনে নাগরিকত্ব লাভের জন্য আবেদন করেনি তাদেরকে তৃতীয় ভাগে ফেলা হলো। শেষ দুই শ্রেণীর নাগরিকের জন্য ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জন এবং রাজনীতিতে অংশগ্রহন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো। যেহেতু রোহিঙ্গারা মায়ানমারে হাজার বছর ধরে বাস করে আসছে, সেহেতু তারা ১৯৪৮ সনের নাগরিকত্ব আইনে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করার প্রয়োজন অনুভব করেনি। কারণ রোহিঙ্গারা সুস্পষ্টভাবে জানে যে, আরাকানে তার আগমন হাজার বছর আগে।কিন্তু রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতে তারা বৃটিশ আমলেই আরাকান তথা মায়ানমারে এসেছিল। এইভাবে রোহিঙ্গারা মায়ানমারের জান্তা সরকারের এক অদ্ভুদ আইনের ফাঁদে পরে নিজ দেশের নাগরিকত্ব লাভে বঞ্চিত হলো।

বর্তমানে ক্ষমতাসীন মায়ানমার সরকারের বিবেচনায় মুসলমান রোহিঙ্গারা সেদেশের বৈধ নাগরিক নয়; কারণ তারা বৃটিশ আমলে মায়নমারে প্রবেশ করলেও নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেনি। ফলে মায়ানমার শাসিত আরাকানে তাদের থাকার কোন বৈধ অধিকার নেই। অথচ মায়নমারের পার্লামেন্টেও ১৯৬২ সনের সামরিক উত্থানের পূর্বে রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল। সেই সময় কোন কোন রোহিঙ্গা সাংসদকে সরকারের মন্ত্রিও করা হয়েছিল। মায়নমার সামরিক শাসনের অধীনে আসার পর হতে, রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকারও দ্রুত সঙ্কোচিত হতে থাকে। প্রথমে সামরিক শাসকেরা তাদের রাজনৈতিক অধিকারকে অস্বীকার করে। আসলে, ১৯৮২ সনে প্রণীত বৈষম্যমূলক এবং ঐতিহাসিক সত্য বির্বজিত নাগরিকত্ব আইনের  মাধ্যমেই রোহিঙ্গাদের “অ-নাগরিক” বা “বিদেশী অভিবাসী” হিসেবে সনাক্ত করা হয়। কিন্তু মজার বিষয় এই যে, ১৯৯০ সনে অনুষ্ঠিত বহুদলীয় নির্বাচনে রোহিঙ্গাদের অংশগ্রহনে জান্তা সরকার কোনরূপ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেনি। তবে ঐ নির্বাচনের ফলাফল কখনোই সামরিক সরকার বাস্তবায়ন করেনি।
মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের সেই দেশের নাগরিক হিসেবে মেনে নিচ্ছে না; সেই সাথে তারা এটাও স্পষ্ট করেনা যে, এরা কোন দেশের নাগরিক।

কিন্তু দেখা যায় যে, কিছু সময় পর পর রাষ্ট্রীয় মদদে রোহিঙ্গাদের কোন একটি অযুহাতে বাংলাদেশে পুস ইন করা হয়। রোহিঙ্গারাও কোন উপায় না দেখে ১৬৭ মাইলের ভূমি ও সমুদ্র সীমান্ত ধরে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালায়। ইতিপূর্বে ১৯৭৮ সনে প্রথম বার এবং ১৯৯১ সনে দ্বিতীয়বার আরাকানের রোহিঙ্গারা নিজেদের ভিটে-মাটি ছেড়ে বাংলাদেশে এসে প্রাণ রক্ষা করেছে। কিন্তু ২০১২ সন হতে বাংলাদেশ সরকার এই বিষয়ে একটি যৌক্তিক অবস্থান গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ মনে করে, রোহিঙ্গা ইস্যুটি মায়নমারের একটি অভ্যন্তরীন ব্যাপার। ফলে বাংলাদেশের এটি এড়িয়ে চলার চেষ্টা করাই উত্তম।

মায়নমার সরকার রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার কেড়ে নেয়ার জন্য তাদেরকে বৃটিশ আমলে মায়নমারে অনুপ্রবেশকারী জনগোষ্ঠী হিসাবে ঘোষণা দিলেও, ইতিহাস স্বাক্ষ্য দেয় যে, রোহিঙ্গা মুসলমানেরা হাজার বছর ধরে আরাকানে বাস করে আসছে। অবশ্য আরাকানে একসাথে রোহিঙ্গাদের বসতি স্থাপন শুরু হয়নি, বরং কয়েক ধাপে তারা এই অঞ্চলে স্থায়ী বসতি গড়ে তোলে, যার সর্বশেষ ধাপটিও মায়নমার বৃটিশ শাসনাধীনে আসার বহুপূর্বে সম্পন্ন হয়েছিল। তাই যেই যুক্তিতে রোহিঙ্গাদের “অ-নাগরিক” ঘোষণা করা হলো, তা প্রচন্ড অযৌক্তিক।

আরাকানের প্রথম মুসলিম বসতিকারীরা ছিল মূলত আরব বণিক যারা ব্যবসার উদ্দেশ্যে জলপথে এই দেশে এসেছিল। আসলে ১৭ শতকে এই অঞ্চলে ইউরোপীয় বণিকদের আগমনের পূর্ব পর্যন্ত আরব বণিকদের এই অঞ্চলে আসা অব্যাহত থাকে। ইউরোপীয়রা যখন অতি আধুনিক জাহাজ, বিপুল বিনিয়োগ এবং আকর্ষণীয় পণ্য নিয়ে আসতে শুরু করল, সেই সময় হতেই মূলতঃ আরব বণিকেরা এই অঞ্চলের উপর বাণিজ্যিক শ্রেষ্টত্ব এবং সেইসাথে কর্তৃত্ব  হারালো। কিন্তু এরি মধ্যে আরাকান অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে স্থায়ীভাবে বাস করতে শুরু করেছিল বিপুল সংখ্যক মুসলমান।

রোহিঙ্গারা যে বহু শতক ধরে মায়নমারের নাগরিক তা প্রমানের জন্য আরো একটি ঐতিহাসিক তথ্য এখানে উপস্থাপন করা যায়। আসলে রোহিঙ্গা মুসলমানেরা বানিজ্যিক উদ্দেশ্যের পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কারণেও আরাকানে আসে। ১৫ শতকের প্রারম্ভে বর্মী রাজার কাছে রাজ্য হারানো আরাকান রাজ মিন-স-মুন বাংলার রাজার কাছে সামরিক সাহায্য প্রার্থনা করে। বাংলার রাজাও সসৈন্যে রাজ্যহারা আরাকান রাজকে সাহায্য করে। এই সময়ে বাংলা থেকে প্রচুর মুসলমান ধর্মাবলম্বী সৈন্য আরাকানে প্রবেশ করে। এই সামরিক সহযোগীতা পরবর্তী সময়েও বাংলা-আরাকান সম্প্রীতির আওতায় অনেক উচ্চ মাপের প্রশাসক, কর্মকর্তা ও বুদ্ধিজীবীও বাংলা হতে আরাকানে যায়।

অত:পর মুসলমান কারিগর শ্রেনীর আগমন ঘটে আরাকানে। এইভাবে ১৫ শতক জুরে আরাকানে মুসলমানদের অভিবাসন চলতে  থাকে, এবং ক্রমশ: সেখানে তারা নিজস্ব কৃষ্টি-সংস্কৃতি নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ জাতি গোষ্ঠি হিসাবে আত্ম-প্রকাশ ঘটাতে থাকে।

উল্লেখ্য যে, এইভাবেই পৃথিবীর প্রতিটি দেশেই অভিবাসী মানুষেরা সেই দেশের জাতিয়তাবোধ নির্মাণে নিয়ামকের ভূমিকা রেখেছে, কিন্তু মায়নমার ছাড়া পৃথিবীর আর কোন দেশে প্রায় হাজার বছর পূর্বে অভিবাসিত কোন জনগোষ্ঠীকে অ-নাগরিক ঘোষণা করার নজির নেই।

অন্যভাবেও আরাকানে মুসলমানদের অনুপ্রবেশ ঘটে। বাংলার সমুদ্র উপকুলবর্তী মুসলমানদের অনেককে অপহরণ করে দাস হিসাবে মগ ও পর্তুগীজ জলদস্যুরা এইসব অঞ্চলে বিক্রয় করে দেয়। এই সব অপহৃত মুসলমানদের বল প্রয়োগে এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করতে এবং সেখানে কৃষিকাজে নিয়োজিত থাকতে  বাধ্য করা হয়। এইভাবে আরাকানে মুসলমান জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। আবার যখন প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে মুঘল সম্রাট শাহজাহানের পুত্র শাহ সুজা তার পরিবার এবং বিপুল সংখ্যক সহচরদের নিয়ে আরাকানে আশ্রয় গ্রহন করে, তখনও এই অঞ্চলে একটি বড় মাপের মুসলমান অভিবাসনের ঘটনা ঘটে।

অতএব দেখা যাচ্ছে যে, আরাকানে বৃটিশ শাসন শুরু হওয়ার অনেক পূর্ব হতে মুসলমানরা বসবাস করে আসছে। এবং ইতিহাসের ক্রম অগ্রগতির বিভিন্ন পর্যায়ে এই অঞ্চলে বিবিধ কারনে মুসলিম অভিবাসন ঘটে। যেকোন জাতি গোষ্ঠী কোন দেশকে যেভাবে মাতৃভূমি ভেবে সেখানে স্থায়ীভাবে বাস করতে থাকে, ঠিক সেই ভাবেই মুসলমানেরা আরাকানে বেশ কয়েক শতক ধরে বসবাস করে আসছে। তাই রাষ্ট্র বিজ্ঞানের যে কোন সংজ্ঞাতেই তারা সেই দেশের বৈধ নাগরিক। তাই তাদেরকে নিজস্ব ভিটে-মাটি থেকে উচ্ছেদ করা একটি ঘৃণ্য অমানবিক প্রচেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়।

বর্তমানে আরাকানে বসবাসকারী রোহিঙ্গা মুসলমানদের অধিকাংশের দীন-হীন সামাজিক ও আর্থিক অবস্থা তাদের অতীত ঐতিহ্যের যথার্থ পরিচয় বহন করে না। অর্থাৎ মুসলমানরা আরাকানে শুধুমাত্র নিম্নশ্রেনীর প্রজা হিসাবে বাস করছিল ভাবলে ভুল হবে। ইতিহাস হতে জানা যায় যে, আরাকান রাজ্য পরিচালনায়ও তারা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিল।

আমরা দেখি যে, ১৫ শতক হতে শুরু করে পরবর্তী তিনশত বৎসরে আরাকানের কম পক্ষে তিন জন প্রধান মন্ত্রী এবং তিন জন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ছিল মুসলমান। লস্কর উজির বুরহানদ্দিন, লস্কর উজির আশরাফ খান, লস্কর উজির বড় ঠাকুর, প্রধান মন্ত্রি মাগন ঠাকুর, প্রধান মন্ত্রি সৈয়দ মুসা, প্রধান মন্ত্রি নবরাজ মজলিস -ইত্যাদি নাম আরাকানের রাষ্ট্র পরিচালনায় মুসলমানদের অংশীদারিত্বকে প্রমান করে।

আরাকানের সাহিত্য জগতেও মুসলমান কবি সহিত্যিকদের আধিপত্য ছিল প্রনিধানযোগ্য। ‘সতী ময়না লোর চন্দ্রাণী’গ্রন্থের লেখক কাজী দৌলত, ‘পদ্মাবতী’, ‘সাইফুল মুলুক বদিয়োজ্জামান’ ও ‘হপ্ত পয়কর’  গ্রন্থের লেখক আলাওল, ‘চন্দ্রাবতী’ গ্রন্থের লেখক কুরাশী মাগন ঠাকুর মধ্য যুগে আরাকানের রাজ দরবারের পৃষ্টপোষকতায় সাহিত্য অঙ্গনকে সুশোভিত করেছেন। অতএব এটা বলা যায় যে, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্র পরিচালনায় আরাকানে মুসলমানেরা বহুদিন ধরে একটি বিশেষ উচ্চতায় অবস্থান করে আসছে। কিন্তু মায়ানমার সরকারের মুসলমান বিরোধী অবস্থানের কারনে সেখানকার রোহিঙ্গারা বর্তমানে নিজদেশে পরবাসীর ভাগ্য বরণ করতে বাধ্য হচ্ছে।

যেমনটি পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, আরাকান হতে রাষ্ট্রীয় মদদে বড় মাত্রায় রোহিঙ্গা উচ্ছেদের প্রচেষ্টা চলে  সর্বপ্রথম ১৯৭৮-৭৯ সনে। এই সময়ে প্রায় তিন লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশের কক্সবাজার এলাকায় এসে শরণার্থী হিসাবে আশ্রয় গ্রহন করে। বাংলাদেশ সরকার তখন মানবিক দৃষ্টিতে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছিল। বাংলাদেশ  যখন কূটনৈতিক পথে মায়ানমার সরকারকে তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নেয়ার জন্য চাপ দিল, মায়ানমার সরকার তাদের বৈধ নাগরিকদের স্ব-ভূমি থেকে উচ্ছেদের কথা অস্বীকার করল। তাদের মতে চলমান আদম-শুমারীতে অবৈধ হিসাবে সনাক্ত হওয়ার ভয়ে আরাকানে অবৈধভাবে অভিবাসনকারী কিছু বাংলাদেশী পূর্নবার বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহন করে থাকতে পারে। অবশ্য শেষে  আর্ন্তজাতিক মহলের চাপে মায়ানমার সরকার তাদের ফেরৎ নিতে বাধ্য হয়েছিল । এই সময়ে জাতি সংঘের শরণার্থী বিষয়ক কমিশন জোড়ালো ভুমিকা রেখেছিল। দু:খজনক সত্য এই যে, আরাকানে  প্রত্যাবর্তনের পূর্বে বাংলাদেশে অবস্থানকালে অনেক রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ক্ষুধা ও বিভিন্ন ধরনের রোগে মারা যায়। দুই লক্ষ রোহিঙ্গা সেবার নিজ দেশে ফেরৎ যেতে পেরেছিল। কিছু রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবৈধভাবে থেকে যায়। অবশিষ্ট রোহিঙ্গা ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও মালায়শিয়ায় পারি জমায়।

এদিকে ১৯৯১ সনে আবারও ১৯৭৮ সনের পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয় এবং এবারও তিন লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে ঘর ছাড়া করা হয়। এইবারও এই ঘরহারা-রাষ্ট্রহারা রোহিঙ্গারা নাফ নদী পার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেই। বাংলাদেশ সরকার এবারও প্রতিবেশী দেশ মায়ানমার সরকারের সহিংস ও অনৈতিক কর্মকান্ডের ফলে বাস্তুহারা রোহিঙ্গাদের মানবিক বিবেচনায় আশ্রয় দেয়। এবারও মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে; তবে এই প্রক্রিয়া এখনো চলমান এবং এখনো সবাই ফেরত যেতে পারেনি। এবারও জাতি সংঘ মধ্যস্থতার ভূমিকা নিলেও এক উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে থেকে যেতে বাধ্য হয়েছে।

এই পর্যন্ত আলোচিত ঐতিহাসিক তথ্যাবলী প্রমান করে যে, আরাকানের রোহিঙ্গা মুসলমানেরা সেই দেশে সুপ্রাচীন কাল হতে বাস করে আসা এক জনগোষ্ঠী। তাই তাদেরকে অসংগত নাগরিকত্ব আইনের মধ্যে ফেলে বাস্তুচ্যুত করা যাবেনা। আর যখনই তারা সেখানে অত্যাচারিত হবে, তখনই তাদেরকে বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়া মানবিক ও আবেগিক দিক থেকে গ্রহণীয় মনে হলেও, এই উদ্যোগ সমস্যাটির স্থায়ী সমাধানের প্রক্রিয়াকে আড়াল করে দিবে। তাই বিষয়টির একটি সর্বজনগ্রাহ্য সমাধান বের করার এখন উপযুক্ত সময় এসেছে । আর্ন্তজাতিক মহল, মায়ানমার সরকার এবং বাংলাদেশ সরকার- এই তিন পক্ষকে আলোচনার টেবিলে বসে এই সমস্যার উদ্যোগ নিতে হবে। এই ক্ষেত্রে জাতিসংঘের ভূমিকা অতীতে প্রোজ্জ্বল হলেও এখন এই আর্ন্তজাতিক প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ সরকারকে রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত খোলে দেয়ার অনুরোধ ছাড়া এই পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য তেমন কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।

পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনার সাপেক্ষে যুক্তরাষ্ট্র উচ্চকন্ঠ হলেও রোহিঙ্গা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা প্রায় ক্ষেত্রে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা প্রকাশেই সীমাবব্ধ থাকে। আর্ন্তজাতিক রাজনৈতিক  বিশ্লেষকদের কারো কারো ধারণা যুক্তরাষ্ট্র-চীন বৈরী সম্পর্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্রই চীনের অনুগ্রহ প্রাপ্ত দেশ মায়নমারে যে কোন সময় সামরিক উপস্থিতির অযুহাত সৃষ্টি করার জন্য রোহিঙ্গা সমস্যাকে জিয়েয়ে রেখেছে। কিন্তু পৃথিবীর অগুনিত মানবতাবাদী ও শুভ বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ রোহিঙ্গা সমস্যার আশু সমাধান চায়। এইখানে একটি বিষয় উল্লেখ করতে হয় যে, ২০১৫ সনের ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে আর্ন্তজাতিক চাপেই হয়তো এক ধরণের “সাদা কার্ড” ধারী রোহিঙ্গাদের সামনের নির্বাচনে ভোটাধিকার দিয়ে একটি বিল পাস করা হয়। কিন্তু ঠিক দুই দিন পর রাষ্ট্রপতির দপ্তর হতে ইস্যুকৃত অন্য একটি প্রজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই “সাদা কার্ডে” র আয়ুষ্কাল নির্ধারণ করা হয় ২০১৫ সনের মার্চের শেষ পর্যন্ত। অর্থাৎ, নির্বাচনের পূর্বেই সরকার কর্তৃক প্রদত্ত তথাকথিত ভোটাধিকারের অধিকার রোহিঙ্গারা হারালো। রোহিঙ্গাদের বৈধ অধিকার নিয়ে এইরূপ ছেলেখেলার সত্ত্বর অবসান হউক- এটিই অগুনিত বিবেকবান মানুষের কামনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*