মোবাইল নেটওয়ার্কে বিপর্যয়

images0সিটিজি পোস্ট ডেস্ক :: বর্তমানে দেশে মোবাইল নেটওয়ার্কে বিপর্যয় নেমে এসেছে। অসহ্য কল ড্রপ, কথা বোঝা না যাওয়া এবং ইন্টারনেটে ধীরগতির কারণে বিরক্তিতে ভুগছেন গ্রাহকরা। মোবাইল নেটওয়ার্ক নিয়ে অধিকাংশ গ্রাহকেরই একই অভিযোগ। ঢাকার ভেতরে নেটওয়ার্ক কিছুটা ভালো পাওয়া গেলেও বাইরে সব অপারেটরের নেটওয়ার্কই ভালো পাওয়া যায় না। একজন গ্রাহক হিসেবে ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম নিজেও বিষয়টি স্বীকার করেছেন। যদিও বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী এ মুহূর্তে দেশের প্রায় ৯৯ শতাংশ এলাকাতেই নেটওয়ার্কের বিস্তৃতি রয়েছে। মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোও একই ধরনের দাবি করে আসছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নেটওয়ার্কের বিস্তৃতি হয়তো একশ’ ভাগ জায়গায়ই আছে। কিন্তু প্রায় ১৩ কোটি মোবাইল গ্রাহককে সেবা দেওয়ার জন্য যে ধরনের নেটওয়ার্ক সক্ষমতা তৈরি করা প্রয়োজন, তা নিশ্চিত হয়নি। যদিও বিটিআরসির সচিব সারওয়ার আলম জানান, মোবাইল ফোন সেবার মান নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে বিটিআরসি। গ্রাহকের অভিযোগ অনুযায়ী ব্যবস্থাও নিচ্ছে সংস্থাটি। সম্প্রতি মোবাইল-ইন্টারনেটের গতি নিয়ে একটি জরিপও হয়েছে।

অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটবের সাধারণ সম্পাদক টি আই এম নুরুল কবীর বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে বিদ্যমান অবকাঠামোর পরিপ্রেক্ষিতে মোবাইল ফোন সেবার মান গ্রহণযোগ্য পর্যায়েই রয়েছে। প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম সাক্ষাৎকারে বলেন, মোবাইল ফোন সেবার মান বাড়াতে কী কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, তা সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে বসে ঠিক করা হচ্ছে। গ্রাহকস্বার্থ রক্ষা ও অপারেটরদের বাণিজ্যিক স্বার্থ দুই-ই যেন রক্ষা হয়, সেভাবেই পদক্ষেপ নেওয়া হবে। দু’পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করা গেলেই কার্যকরভাবে ‘কোয়ালিটি অব সার্ভিস’ নিশ্চিত করা যাবে।

কল ড্রপের যন্ত্রণা বাড়ছেই :মোবাইল কোম্পানির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কয়েকটি কারণে কল ড্রপ হচ্ছে।

প্রথমত, অপারেটরদের গ্রাহকসেবার ক্ষেত্রে প্রধান যন্ত্র বেস ট্রান্সভিসার স্টেশনের (বিটিএস) নির্ধারিত ক্ষমতার চেয়ে বেশি ভয়েস কল প্রতিমুহূর্তে আদান-প্রদান করতে হচ্ছে। যেখানে সক্ষমতা একসঙ্গে ৮০ থেকে ১০০ কল আদান-প্রদানের, সেখানে একসঙ্গে এক হাজারের বেশি কল আসছে। এ অবস্থায় কল ড্রপ কিংবা নেটওয়ার্ক পেতে সমস্যা হচ্ছে। নেটওয়ার্ক পাওয়া গেলেও দুর্বলতার কারণে কথা ভেঙে যাচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, ঢাকার ভেতরে বহুতল ভবনের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। বহুতল ভবনের ভেতরে নেটওয়ার্ক সক্ষমতা বাড়ানোর জন্যও কারিগরি পদক্ষেপ নেওয়া যাচ্ছে না প্রতিকূল বাস্তবতার কারণে। বিশেষ করে নতুন বিটিএস বসানোর জন্য উপযুক্ত ভবন বা জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না। বহুতল ভবন পাওয়া গেলেও হয় মালিকরা ভাড়া দিতে চান না, নয়তো আকাশচুম্বী ভাড়া দাবি করেন। যেমন ঢাকায় খিলক্ষেতের লেকসিটি কনকর্ড আবাসিক এলাকা একটা বড় উদাহরণ।

তৃতীয়ত, প্রায়ই ইন্টার-কানেকশন এক্সচেঞ্জের (আইসিএক্স) সমস্যার কারণে আন্তঃসংযোগ পেতে সমস্যা হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে পাওয়া যাচ্ছে না। কল ড্রপও হচ্ছে। আইসিএক্সের ওপর অপারেটরদের নিয়ন্ত্রণ নেই, কিন্তু অভিযোগের দায় অপারেটরদেরই নিতে হচ্ছে। চতুর্থত, ঢাকার বাইরে অনেক জেলায় ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক যথেষ্ট উপযোগী নয়। ফলে অপারেটরের কারিগরি সক্ষমতা থাকলেও ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্কের দুর্বলতার কারণে গ্রাহককে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। এ ছাড়া টেলিকম শিল্প খাতে অপরিকল্পিত করের বোঝা ও সিমকার্ড প্রতিস্থাপন কর নিয়ে জটিলতার কারণে নেটওয়ার্ক উন্নয়ন খাতে নতুন বিনিয়োগও পর্যাপ্ত পরিমাণে হচ্ছে না বলে জানান তিনি।

ঢাকার বাইরে দূরত্ব ও গ্রাহক ঘনত্ব অনুযায়ী মোবাইল ফোন অপারেটরদের পূর্ণ কারিগরি সক্ষমতা বা পর্যাপ্ত বিটিএস এখন পর্যন্ত নেই বলে জানায় সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র। সূত্র জানায়, বর্তমানে গ্রামীণফোনের নয় হাজার ৫০০টি, বাংলালিংকের নয় হাজার ১০০, রবির আট হাজার ৫০০, এয়ারটেলের চার হাজার ৮০০ ও টেলিটকের তিন হাজার ৮০০টি বিটিএস রয়েছে।

ইন্টারনেটে ধীরগতি, বিরক্ত গ্রাহকরা :বিজ্ঞাপনের ভাষায় কেউ ইন্টারনেট চ্যাম্পিয়ন, কেউ সবচেয়ে ফার্স্ট, কেউ স্বপ্ন দেখায় বহুদূর যাওয়ার। কিন্তু বাস্তবে প্রায় সব অপারেটরের মোবাইল ইন্টারনেটের গ্রাহকরা নিম্নগতির সমস্যায় প্রচণ্ড বিরক্ত। দেখা যায়, থ্রিজি ইন্টারনেট সেবায় এক এমবিপিএস গতির কথা বলা হলেও বাস্তবে কারও গতিই ১০০ কেবিপিএসের বেশি নয়।

বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ বিটিআরসির দিকে :প্রযুক্তিবিদ মোস্তাফা জব্বার বলেন, প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশে ‘সাব-স্ট্যান্ডার্ড’ বা সাধারণ মানের চেয়ে নিম্নমানের সেবা পাচ্ছেন মোবাইল ফোন গ্রাহকরা। তিনি বলেন, গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষা এবং অপারেটরদের কাছ থেকে কোয়ালিটি অব সার্ভিস বুঝে নেওয়ার দায়িত্ব বিটিআরসির। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনে বিটিআরসিকে সক্রিয় দেখা যাচ্ছে না; বরং তারা প্রায়ই নানা ধরনের পর্যবেক্ষণ কমিটি করে বলে শোনা যায়। কিন্তু সেসব কমিটি কী কাজ করে, কার স্বার্থে কাজ করে তা বোঝা যায় না। কারণ, কমিটির তৎপরতায় গ্রাহকের সেবার মানের উন্নয়ন দেখা যায় না।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান লার্ন এশিয়ার সিনিয়র ফেলো আবু সাঈদ খান বলেন, প্রকৃতপক্ষে সরকারের বিদ্যমান নীতিই গ্রাহকস্বার্থের পক্ষে নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*