কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলি মাদকের স্বর্গরাজ্যে পরিণত

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলি মাদকের স্বর্গরাজ্যে পরিণত
আবদুর রাজ্জাক,কক্সবাজার জেলা প্রতিনিধি ।। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে মাদকের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে।ফলে ক্যাম্পগুলি যেন একেকটি মাদকের স্বর্গরাজ্যে পরিনত হয়েছে। এসব ক্যাম্পে প্রকাশ্যে ইয়াবাসহ মাদক বিক্রি চলছে। ৩০/৩৫ টি রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে ইয়াবাসহ মাদক বিক্রির চিহ্নিত আখড়া আছে পাঁচ শর বেশি। শরণার্থী শিবিরের বাইরেও রোহিঙ্গারা ইয়াবা বহন করছে। দুই দেশের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক এদের নিয়ন্ত্রণ করছে বলে জানা গেছে। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের একাংশ মাদক ব্যবসা, পরিবহন ও শিবিরের ঘরগুলোতে এসব মজুত রাখছে। জেলা গোয়েন্দা পুলিশের তৈরি করা ইয়াবা ব্যবসায়ী ও চালানকারীদের যে তালিকা রয়েছে, তাতে ১৩ জন নেতৃস্থানীয় রোহিঙ্গা শরণার্থীরও নাম রয়েছে। শরণার্থীশিবিরের এই পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন স্থানীয় অধিবাসীরা উখিয়ার নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে গত ৩০ জুলাই প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছেন। তাতে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের শিবিরের বাইরে চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা, বাইরে থেকে শিবিরের ভেতরে যাতায়াত পর্যবেক্ষণ, ইয়াবার বিস্তার বন্ধ করার জন্য প্রশাসনিক উদ্যোগ জোরদার করাসহ ২১ দফা দাবি জানানো হয়। সংশ্লিষ্ট আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সূত্র জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ৭ মাসে শুধু টেকনাফে ১ কোটি ৭৭ লাখ ৫৮ হাজার ১২১টি ইয়াবা উদ্ধার করেছেন বিজিবি, পুলিশ, র‍্যাব, কোস্টগার্ড ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সদস্যরা। আগস্টের ২০ তারিখ পর্যন্ত উদ্ধার করা হয় আরও ১৩ লাখ ৮৭ হাজার। কক্সবাজার জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর আগস্টের শেষ দিকে রোহিঙ্গা শরণার্থী আসা শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত উখিয়া ও টেকনাফ থানায় রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিরুদ্ধে মাদক-সংক্রান্ত মামলা হয়েছে ৭৯টি। উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা শিবিরের এফ-ব্লকের কয়েকজন নারী ইয়াবা বিক্রেতা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। মাঝেমধ্যে তাঁদের প্রকাশ্যেও ইয়াবা বিক্রি করতে দেখা যায়। স্হানীয়রা বলেন, রোহিঙ্গা শরণার্থীরা ইয়াবার ব্যবসায় নেমেছে স্থানীয় ইয়াবা কারবারিদের সহায়তায়। শিবিরগুলোর মধ্যেকার পানের দোকান, ফার্মেসি, শাকসবজির দোকান এবং ঝুপড়িঘরে লুকিয়ে ইয়াবা বিক্রি হয়। আর ইয়াবা বিক্রির টাকা ও কমিশন ভাগাভাগি নিয়ে শিবিরগুলোতে প্রতিদিনই কোনো না-কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে। জেলা পুলিশের তথ্যমতে, গত এক বছরে পুলিশ, বিজিবি ও র‍্যাব রোহিঙ্গা শিবিরগুলো থেকে প্রায় সাড়ে তিন লাখ ইয়াবাসহ ১১১ জন রোহিঙ্গাকে গ্রেপ্তার করেছে। কিন্তু শিবিরের মধ্যেকার মাদকের আখড়াগুলো উচ্ছেদ করা যাচ্ছে না প্রয়োজনীয় ফোর্সের অভাবে। ৩০টি শিবিরের প্রায় ১১ লাখ ১৮ হাজার ৫৭৬ রোহিঙ্গার শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালনের জন্য নিয়োজিত পুলিশের সংখ্যা ১ হাজারেরও কম। মাদক ব্যবসার বিরোধ নিয়ে রোহিঙ্গা শিবিরে অনেকগুলো খুনের ঘটনাও ঘটেছে। ১৩ জুলাই টেকনাফের লেদা রোহিঙ্গা শিবিরের পাশের একটি পাহাড়ি ছড়া থেকে শামসুল হুদা ও রহিম উল্লাহ নামে দুই ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এর মধ্যে রহিম উল্লাহ লেদা আশ্রয় শিবিরের বি-ব্লকের শরণার্থী রশিদ আহমদের ছেলে। টেকনাফ মডেল থানার ওসি রনজিত কুমার বড়ুয়া বলেন, ইয়াবা-সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এই শিবিরে ইয়াবা বিক্রির কয়েকটি সিন্ডিকেট আছে। কক্সবাজার, উখিয়া ও টেকনাফের কয়েকটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, মিয়ানমার সরকারের শীর্ষস্থানীয় কতিপয় ব্যক্তির পরিবারের সদস্যরা ইয়াবা উৎপাদন ও চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত। তাঁদের সঙ্গে যুক্ত আছেন বাংলাদেশের কতিপয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, যাঁদের দৃশ্যমান পরিচয় রাজনীতিক ও ব্যবসায়ী হিসেবে। কারও আবার বিশেষ কোনো পেশা-পরিচয় নেই। উখিয়া ও টেকনাফে রোহিঙ্গাদের নেতা হিসেবে গণ্য কয়েকজন বলেন, বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের এলাকায় ইয়াবার করখানা আছে ৪০টি। এর মধ্যে ‘ইউনাইটেড ওয়া স্টে-ইট আর্মি’ নামে আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারী সংগঠনেরও চারটি কারখানা রয়েছে। অন্যগুলোর মালিক মিয়ানমারের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। ওই কারখানাগুলোতে তৈরি ইয়াবা মিয়ানমারভিত্তিক ১০ জন ডিলার বাংলাদেশের এজেন্টদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ কে এম ইকবাল হোসেন বলেন, ইয়াবা পাচারের সঙ্গে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার দুই দেশেরই কতিপয় প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত। আর সে কারণে এটা বন্ধ হচ্ছে না। টেকনাফ-২ বিজিবির অধিনায়ক লে. ক. মো. আছাদুদ জামান চৌধুরী বলেন, এটা বন্ধ করতে হলে দরকার মিয়ানমারের আন্তরিকতা। তা না হলে ইয়াবা চোরাচালান বন্ধ করা খুব কঠিন হবে। কক্সবাজারের র‍্যাব-৭-এর অধিনায়ক মেজর মো. মেহেদী হাসান বলেন, রোহিঙ্গারা ধীরে ধীরে সবার জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাদের হাতে হাতে এখন ইয়াবা ছাড়াও অবৈধ অস্ত্রও পাওয়া যাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*