দালাল ঠেকাতে লেবাননে বাংলাদেশি শ্রমিক পাঠানো বন্ধ

দালাল ঠেকাতে লেবাননে বাংলাদেশি শ্রমিক পাঠানো বন্ধ

হেলাল আহমদ, স্টাফ রিপোর্টার : দালালদের দৌরাত্ম্য ঠেকাতে অবশেষে লেবাননে কর্মী পাঠানো সাময়িক স্থগিত রাখার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। লেবাননে বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সিলর ও দূতালয় প্রধান সায়েম আহমেদ স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়। পরবর্তী আদেশ না আসা পর্যন্ত দূতাবাস আর কোনো চাকরির চুক্তিপত্র সত্যায়ন করবে না উল্লেখ করে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘ইতিমধ্যে বাংলাদেশ সরকার লেবাননে কর্মী পাঠানোর ব্যাপারে নতুন নীতিমালা তৈরি করছে। সেটি চূড়ান্ত হলে সংশ্লিষ্ট সব এজেন্সিকে তা বিতরণ করা হবে।’ এ ছাড়া দূতাবাসের ফেসবুক পেজে বলা হয়েছে, ‘দালাল কর্তৃক সৃষ্ট বিভিন্ন সমস্যার কারণে সরকার আপাতত বাংলাদেশ থেকে লেবাননে শ্রমিক পাঠানো বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’ এ ব্যাপারে বৈরুতে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত আবদুল মোতালেব সরকার ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘দালালদের প্রতারণায় প্রবাসীরা কাজ ও আবাসিক কার্ড (আকামা) না পেয়ে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। দুই দেশের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে লেবাননে আসা কর্মী পিছু আড়াই থেকে তিন হাজার ডলাররে বেশি খরচ হওয়ার কথা নয়, কিন্তু দালাল চক্র তিন-চার হাত বদলে নিচ্ছে ৬-৭ হাজার ডলার। এখানে আসা শ্রমিকের সঙ্গে দালালদের কথা ও কাজের কোনো মিল নেই। আমরা বিভিন্ন সভায় অনুরোধ করেছিলাম, তারা যেন সঠিক তথ্য দিয়ে বাংলাদেশ থেকে লেবাননে শ্রমিক আনেন। কিন্তু অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় বাংলাদেশ সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে লেবাননের সব ধরনের ভিসা কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।’ পরবর্তী সময়ে কীভাবে লেবাননে শ্রমিক পাঠানো হবে তার প্রক্রিয়া সম্পর্কে একটা ধারণা দেন রাষ্ট্রদূত আবদুল মোতালেব। তিনি বলেন, ‘লেবাননে যেসব রিক্রুটিং এজেন্সি বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক আনবে, তাদের প্রথমে দূতাবাসে আবেদন করতে হবে। দূতাবাস সরজমিন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যদি মনে করে, এসব কোম্পানির শ্রমিক নিয়োগের সামর্থ্য আছে, তাহলে শ্রমিক আনার অনুমতি দেওয়া হবে। অনুমতি পাওয়ার পর তারা লেবাননের শ্রম মন্ত্রণালয়ে আবেদনের মাধ্যমে ভিসা সংগ্রহ করে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক আনতে পারবে।’ এই পদ্ধতিতে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক আনা হলে একজন শ্রমিকের নিয়োগ বা ভিসার ক্ষেত্রে বর্তমানে যেসব সমস্যা আছে, তা অনেকটা দূর হবে বলে দূতাবাস মনে করে। তিনি বলেন, নতুন পদ্ধতি নিয়ে বাংলাদেশের প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও বৈরুতে বাংলাদেশ দূতাবাস কাজ করছে। দূতাবাসে নতুন জনবল নিয়োগ দেওয়ার পর খুব শিগগির এই ব্যবস্থা চালু হবে। তবে এ জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা এখনই বলা যাচ্ছে না। এ পদ্ধতি চালু হতে হয়তো ১৫ দিন বা এক মাস এমনকি ছয় মাসও লাগতে পারে জানান রাষ্ট্রদূত। যারা ইতিমধ্যে লেবাননের শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে অনুমতির মাধ্যমে ভিসা হাতে পেয়ে এখনো বাংলাদেশ থেকে লেবাননে প্রবেশ করতে পারেননি, তাদের বেলায়ও এই ব্যবস্থা প্রযোজ্য হবে। নতুন পদ্ধতি চালু হওয়ার পর দূতাবাসের যাচাই-বাছাইয়ের পর যদি প্রমাণ হয় যে, কোম্পানিগুলোর শ্রমিক নিয়োগে তাদের সামর্থ্য নেই, সে ক্ষেত্রে দূতাবাস ভিসা বাতিল করবে। জানা গেছে, দালালদের দৌরাত্ম্যে লেবাননে বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় শ্রমবাজার প্রায় ধ্বংস হতে বসেছে। দালালদের খপ্পরে পড়ে বাংলাদেশি কর্মীরা নিঃস্ব হয়ে বিভিন্ন অনৈতিক ও অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ছেন। এতে বাংলাদেশি কর্মীদের সম্পর্কে নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হচ্ছে। শুধু তাই নয়, দালালদের দৌরাত্ম্যের কারণে দূতাবাসও অসহায় হয়ে পড়েছিল। দালালচক্র বাংলাদেশের অভিবাসী-প্রত্যাশী শ্রমিকদের কাছ থেকে পাঁচ-সাত লাখ টাকা নিয়ে মাত্র তিন মাসের ভিসায় তাদের লেবাননে এনে বেচাকেনা করে। এরপর কর্মীরা কাজের অনুমতি চাইলেও তা পান না। পরিস্থিতি সামাল দিতে লেবাননে অবৈধভাবে অবস্থানরত বাংলাদেশি কর্মীদের দূতাবাসের উদ্যোগে নিয়মিত ফেরতও পাঠানো হচ্ছে। সরকারের জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে জুলাই পর্যন্ত চার হাজার ৪৩৯ জন কর্মী লেবাননে আসেন। গত বছর লেবাননে আসা কর্মীর সংখ্যা ছিল আট হাজার ৩২৭। তবে এর আগের বছর ১৫ হাজারের বেশি বাংলাদেশি কর্মী লেবাননে এসেছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*