দাফন-কাফন মতিনের ভাগ্যে জুটেনি

দাফন-কাফন মতিনের ভাগ্যে জুটেনি
——বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আনোয়ার হোসেন সিকদার

মোঃ মহসিন হোসাইনঃ

ঐতিহাসিক রঘুনাথপুর বাজার চাঁদপুর জেলার কচুয়া উপজেলার ৮নং কাদলা ইউনিয়নে অবস্থিত। ডাকাতিয়া নদীর নৌ-যান চলাচলের মহাসংযোগ প্রবাহিত বিশাল বোয়ালজুরী খালের তীরে রঘুনাথপুর বাজার ছিলো ক্রেতা-বিক্রেতার জন্যে সুবিধাজনক স্থান।
তৎকালীন কচুয়া, হাজীগঞ্জ এবং মতলব থানার মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যে এ এলাকাটি ছিল মুক্তাঞ্চল হিসেবে পরিচিত। নৌকা বা নৌযান ছাড়া এই অঞ্চলে যাতায়াতের বিকল্প কোনো ব্যবস্থা ছিলো না। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার রঘুনাথপুরে যুদ্ধ ও গণহত্যা দিবস ৮ সেপ্টেম্বর। বর্ষাকাল চারদিকে নৌকা আর পানিতে চলছে ক্রয়-বিক্রয়ের মিলন মেলা। রঘুনাথপুর বাজার হতে হাজীগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযুদ্ধকালীন এফএফ কমান্ডার ও বর্তমান উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মজিবুর রহমান মজুমদার অস্থায়ী ক্যাম্প কিছু সহযোদ্ধা সদস্য মুক্তাঞ্চল ভেবে কোনো প্রকার ডিফেন্স ছাড়াই অস্ত্র সাথে নিয়ে বাজারে ঢুকে পড়ে। তারা কেউ চুল কাটায় কেউ ছবি উঠানো নিয়ে ব্যস্ত ছিল। তাদের এই আগমন বার্তা রাজাকার এবং খাঁন সেনাদের দালালের মাধ্যমে শত্রু বাহিনীর নিকট দ্রুত পৌঁছে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যে রাজাকার বাহিনী বিপরীত দিক হতে বাজারে ঢুকে ঘেরাও করে গুলি চালাতে শুরু করে দেয়। এ অবস্থায় মুক্তিযোদ্ধারা বিচ্ছিন্নভাবে পজিশনে গেলেও আত্মরক্ষায় গুলি চালিয়ে পিছু হঠতে বাধ্য হয়। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা মতিন পজিশনে থাকা অবস্থায় আটকা পড়ে এবং তার গুলি ফুরিয়ে যায়। শত্রু বাহিনীর ব্রাশফায়ারে মতিনের জীবন প্রদীপ চিরতরে নিভে যায়। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! দাফন-কাফন মতিনের ভাগ্যে জুটেনি। পাক-বাহিনীর দোসররা মতিনের লাশটি টেনে হেঁচড়ে নিয়ে যায়। রাজাকারদের এই আক্রমণের ক্ষিপ্ততা হিংসা এবং বর্বরতায় অজানা, অচেনা নিরস্ত্র, নিরীহ বহু লাশের রক্তে লালে লাল হয়ে যায়।
ভয়ে এবং আতঙ্কে অসহায় সাধারণ মানুষ দিশেহারা। চারদিকে আত্মচিৎকার আর কান্নার আওয়াজ। বুলেটবিদ্ধ অগণিত আহত লোক যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। পাক-হানাদার বাহিনী লুটপাট আর তছনছ করে দেয় সবকিছু। কে নিবে কার খোঁজ, কে কাকে পানির পিপাসা নিবারণ করে জীবন বাঁচাবে। কে কাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে? অগণিত লাশের মধ্যে যে ক’জনের নাম জানা গেল তাদের মধ্যে অন্যতম ১। শহীদ মোঃ শামছুল হক ২। শহীদ জুনাব আলী ৩। শহীদ নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া ৪। শহীদ মোয়াজ্জেম হোসেন ৫। শহীদ আবু মিয়া ৬। শহীদ আনছর আলী মিস্ত্রি ৮। শহীদ শামছুল হক-২ এবং ৮। স্বর্গীয় গিরিশ চন্দ্র সরকার।
কচুয়া, হাজীগঞ্জ এবং মতলব এই তিন উপজেলার অগণিত ক্রেতা ও বিক্রেতার সমাবেশ ছাড়াও প্রতিদিনে যাতায়াতে শ’ শ’ মালবাহী ও যাত্রীবাহী নৌকার পাল উড়িয়ে দাঁড় এবং বৈঠা টানার মাঝিমাল্লাদের গানের কলতানে মুখরিত করে রাখতো বোয়ালজুড়ী খাল এবং রঘুনাথপুরকে।
রঘুনাথপুর হতে দুই কিলোমিটার দূরে বোয়ালজুরীর পশ্চিম তীরে শাসনখোলা গ্রাম। সেখানে অস্থায়ী মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের দায়িত্বে নিয়োজিত বিএলএফ কমান্ডার ওয়াহিদুর রহমান, এফএফ কমান্ডার আঃ রশিদ পাঠান এবং বিএলএফ ডেপুটি কমান্ডার (অপারেশন) জাবের মিয়া পর্যায়ক্রমে তাদের বাহিনী পরিচালনা দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন।
চাঁদপুর-১ কচুয়া আসনের সাংসদ সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর এমপি, কচুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নীলিমা আফরোজ, সহকারী কমিশনার (ভূমি) রুমন দে, চাঁদপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ডার যুদ্ধাহত এমএ ওয়াদুদ, কচুয়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আঃ মবিন, ডেপুটি কমান্ডার জাবের মিয়া দিবসটি সম্পর্কে সকলকে অনুপ্রেরিত করতে সর্বদা তৎপর।
দিবসটি আরও ব্যাপক আয়োজনে পালিত হোক এটাই সচেতন জনগণের প্রত্যাশা।

লেখক পরিচিতি:
মোঃ আনোয়ার হোসেন সিকদার। বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সভাপতি বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কচুয়া থানা (১৯৭২-১৯৭৪)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*