২৭ বছর ধরে বাঁশি বিক্রি করে নওগাঁর গফুরের জীবিকা নির্বাহ!

২৭ বছর ধরে বাঁশি বিক্রি করে নওগাঁর গফুরের জীবিকা নির্বাহ!

মাহবুবুজ্জামান সেতু,নওগাঁ প্রতিনিধি: হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা‬র মতো কাঁধে ঝোলা আর মূখে আঞ্চলিক গানের অকৃত্রিম সুর বাঁশিতে তুলে অবিরত ২৭ বছর ধরে হাঁটছেন ক্লান্তিহীন পথিকের বেশে। দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে হ্যামিলনের বাঁশিওলার মতো কাঁধে ঝোলা আর মূখে আঞ্চলিক গানের অকৃত্রিম সুর বাঁশিতে তুলে অবিরত হাঁটছেন বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার পথে প্রান্তরে । “প্রাণ সখিরে ওই শোন কদম্ব তলায় বংশী বাজায় কে” এমনি পাগল করা সুর যিনি বাশিঁতে তোলেন তাকে আমরা সাধারনত বলে থাকি বাঁশিওয়ালা। তার বয়স ৫৫ এর কাছাকাছি। এভাবে বাঁশি বিক্রির আয় দিয়ে চার সদস্যের সংসার চালাচ্ছেন অাব্দুল গফুর কাজী। নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার দাউদপুর গ্রামে তার বাড়ি। শিশুকাল থেকেই গফুর কাজী ছিলেন ভবঘুরে। বিভিন্ন মেলা- খেলা এবং হাট- বাজারে যেতেন বাবার সাথে। বাবা মৃত পরেশ কাজীও ছিলেন পেশায় একজন বাঁশি বিক্রেতা। গফুর কাজী গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য বাবার নিজ হাতে বাঁশি তৈরী এবং ব্যাবসায়ীক পেশা ধরে রেখেছেন অাজও। বর্তমানে মুলিবাঁশের বাঁশি তৈরী করে সেসব বাঁশি বিক্রিয়ের লাভের টাকা দিয়ে চলছে গফুরের সংসার। সংসার চালতে গিয়ে নিত্য দিনের চাহিদা মেটাতে বেকায়দায় পড়েন তিনি। নিজের বাঁশি বাজানোর বিদ্যাটুকু কাজে লাগিয়ে খুঁজে নেন চলার শক্তি। আর এভাবে দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে এ বাঁশির ভ্রাম্যমাণ ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। মান্দার সতীহাটে সাজেদা গার্মেন্টসে অাব্দুল গফুরের সাথে অাকস্মিকভাবে দেখা হওয়ায় আলাপকালে তিনি জানান, অন্য কাজ করতে পারি না তাই; সুদূর ফেনী জেলার বারীর হাটে পাহাড়িয়া চাকমারা মুলিবাঁশ বিক্রয় করতে অাসে সেখানে বাস অথবা ট্রেন যোগে গিয়ে বাঁশ কিনে অানতে হয়। একসাথে ৫০০থেকে ৬০০ টি বাঁশ কিনে অানেন বলে জানান, গফুর। বাঁশগুলো অনেক চিকন এবং বাঁশের গিরা বা পোড় গুলো ১ থেকে দেড় হাত পরপর হওয়ায় অনেক সময় ৫০০/ ৬০০ টি কাঁচা বাঁশের মধ্যে প্রায় শতাধিক বাঁশ ফেটে যায়। অার বাঁশ গুলো কিনে অানার পর প্রথমে বাঁশির মাফ অনুযায়ী বাঁশগুলো কেটে নিতে হয়। পরবর্তিতে পর্যায়ক্রমে বাঁশগুলো রোদে শুকিয়ে নিতে হয়। তারপর বাঁশগুলোতে বাঁশি তৈরীর উপকরণ যেমন- হাপরের অাগুনে বাঁশগুলো পুড়িয়ে নিয়ে এবং রজন, স্প্রিট,চাচ দিয়ে শিরিশ মারার পর গড়ম লোহার রড দিয়ে বাঁশের বাঁশিগুলো ফুটো করতে হয়। প্রথমে চিকন রড তারপর মিডিয়াম তারপর মোটা রড দিয়ে বাঁশিগুলো ফুটো করতে হয়। এক্ষেত্রে মোটা চিকন সবমিলে ৫টি রড লাগে। অাঁড় বাঁশিতে সাধারণতো ৩থেকে ৪টি অথবা ৫/৭টি ফুটো থাকে। বাঁশিগুলোকে কয়েকটি শেণীতে বিভক্ত করা যায়।তন্মধ্যে এ,বি,সি,ডি এবং এফ কোয়ালিটির বাঁশিগুলো বেশ জনপ্রিয়। প্রতিটি বাঁশি তৈরীতে খরচ হয় ৫ থেকে ৭ টাকা। অার প্রতিটি বাঁশি বিক্রি হয় ২০/৩০/৫০ থেকে সর্বোচ্চ ১০০ টাকায়। বাঁশিগুলো কিনে বেশিরভাগ অাদিবাসিরা। জমাজমি নেই,কি অার করার। ৩শতক জমির উপর কোনোমতে বাড়ি করে অাছি। বৈবাহিক জীবনে ৩ ছেলে মেয়ে নেই। বড়ছেলে বিবাহিত, তবে পৃথক। ২য় ছেলে এবারের এস এসসি পরীক্ষা দিয়েছে। অার ছোট ছেলেটা দ্বিতীয় শ্রেনীতে লেখাপড়া করে। প্রতি সপ্তাহে বাঁশি তৈরী এবং সাংসারিক কাজ করার জন্য দু- একদিন বাড়িতে থাকতে হয় অার বাঁকিদিনগুলোতে বাঁশি বিক্রয়ের জন্য বিভিন্ন এলাকার হাট-বাজার এবং দর্শনীয় স্থানগুলোতে বাস,ট্রেনযোগে অথবা পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়াই। এতে প্রতিদিন ২থেকে ৩শত টাকা আয় হয়। এ দিয়ে ২ ছেলের লেখা পড়ার খরচ যোগান দিয়ে স্ত্রীকে নিয়ে কোন রকম সংসার চলে। জীবন জীবিকার তাগিতে অনেক সময় বদলগাছীর “বৌরুপী ছনের ঘর” নামের সংগঠনে সাপ্তাহিক বাউল গানের অাসরে বাঁশি বাজান বলেও জানান তিনি। বাঁশি সর্ম্পকে তিনি আরো বলেন,বাঁশি বিক্রি হয়। কিন্তু বাশিঁর সুর কখনো বিক্রি হয় না। এটি আমার আত্মার খোরাক। তাই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সংস্কৃতিক অঙ্গনে পরিবেশনের সুযোগ পেলে নিজেকে ধন্য মনে করতাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*