দারকি বেঁচে জীবন চলেনা, আয় চলে যায় দাদনের সুদে

দারকি বেঁচে জীবন চলেনা, আয় চলে যায় দাদনের সুদে
রোকনুজ্জামান সবুজ , জামালপুর প্রতিনিধিঃ দারকি বিক্রি করে জীবন চলে দারকি তৈরী কারিগরদের। দারকির বুননে বুননে মিশে রয়েছে তাদের কষ্টগাঁথা জীবন। শত কষ্টের মাঝে ধারদেনায় পুঁজি খাটিয়ে বাপ দাদার পেশাটি আঁকড়ে ধরে আছে দারকি কারিগররা। গ্রামের নাম বীর হাতিজা। গ্রামটির মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে জামালপুরের মেলান্দহ-ইসলামপুর উপজেলার সিমান্ত। বসবাস করেন ২৫০টি পরিবারে ৭ শতাধিক মানুষ। এ গ্রামের অধিকাংশই বংশ পরম্পরা ক্ষুদ্র কুটির শিল্প মাছধরার দারকি তৈরী পেশার সাথে জড়িত। গ্রামটি দারকি গ্রাম নামে পরিচিতি পেয়েছে। গ্রামের প্রত্যেকটা বাড়ী যেন দারকি তৈরীর ক্ষুদ্র কুটির শিল্প কারখানা। পরিবারের শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সারাদিন দারকি তৈরীতে ব্যস্ত সময় কাটে তাদের। বাশেঁর তৈরী এ পণ্যটি কোথাও বলে দারকি,কোথাও আবার কোন স্থানে চাঁই। একেক এলাকায় মাছ ধরার দারকি একেক নামে পরিচিত। ক্ষুদ্র এই কুটির শিল্পটি গার্মেন্টস শিল্পের মতো। দারকি তৈরীর নারী কারিগর মনোয়ারা বেগম (৫৫) বলেন, পুরো দারকি একজনে তৈরী করেনা। একেকজন একেকটা তৈরী করে। প্রথমে বাঁশ কেটে কাঠি তৈরী, তারপর শলা,পা দিয়ে ডলা,গুনন,বুনন,গাঁথুনী,ফিটিং সবশেষে কর্ণার বেঁধে দারকির পুর্ণ রুপ দেয় কারিগররা। প্রতিটি দারকি তৈরীতে খরচ হয় ১২০ টাকা তা বাজারে বিক্রি করি ২’শ টাকায়। অগ্রহায়ণ,পৌষ,মাঘ ও ফাল্গুন মাসে মাছ ধরার মৌসুমে পণ্যটির ব্যাপক চাহিদা। এখানকার তৈরী দারকি ঢাকার বিক্রমপুর,কলিগঞ্জ,টঙ্গি ও জয়দেবপুরসহ দেশের বিভিন্নস্থানে বিক্রি হয়ে থাকে।৬৫ বছর বয়সি বৃদ্ধ ময়নাল হোসেন বলেন, প্রত্যেক পরিবারের প্রতিটি সদস্য দারকি কারিগর। জন্মের পর থেকে মা’বাবার দারকি তৈরী দেখে ৪/৫ বছর বয়সে দারকি কারিগর হয়ে উঠে এখানকার শিশুরা। আমিও ৫ বছর বয়সে বাবা মা’র কাছে দারকি বানানো শিখেছি। ৬০ বছর ধরে দারকি তৈরী করে আসছি। খরচ বাদ দিয়ে যে কয়টাকা লাভ হয় তা দিয়ে সংসার চলেনা। কি করমো,অন্য কিছুতো শিখিনাই। শত অভাবের পরও বাপ দাদার পেশাটি আঁকড়ে ধরে আছি।কথা হয় বাচ্চু শেখ (৬২) নামে দারকি কারিগরের সাথে। তিনি বলেন, ৪ মাস আগে বন্যা হওয়ার কথা ছিল । সুদে ঋণ নিয়ে পুঁজি খাটিয়ে নিজে ও কারিগর দিয়ে দারকি তৈরী করেছি। বন্যার পানি খাল বিলে না আসায় দারকি বিক্রি হয়নি। বিক্রি না হওয়া তৈরীকৃত দারকি ঘরে স্তুপ আকারে পড়ে আছে। বিক্রি করে লাভের মুখ না দেখলেও সুদের টাকা গুণতে হচ্ছে। একদিকে সুদের টাকার চাপ অন্যদিকে সংসার চালানো নিয়ে খুবই হিমশিমের মধ্যে আছি। বন্যার খবরে আশায় বুক বেঁধেছিলাম আটকে পড়া দারকি বিক্রি করে ধারদেনা পরিশোধ করতে পারবো। এবারও তেমন বন্যা না হওয়ায় খালবিলে পানি আসেনি।ছমিরন বেগম (৪৫) বলেন, ঘরে প্রচুর দারকি মজুদ রয়েছে। দাদন ব্যবসায়ীর সুদের টাকা পরিশোধ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। বাঁশজাত এ শিল্পটি পুজিঁর অভাবে ঋনের ফাঁদে পড়ে লাভের অংশ দাদনের সুদ গুনতে হয়। মাস শেষে কানাকড়িও হাতে থাকেনা। সরকারী পৃষ্টপোষকতার অভাবে অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে ক্ষুদ্র কুটির শিল্পটি।বাংলাদেশ কুটির শিল্প করপোরেশন(বিসিক) জামালপুরের ভারপ্রাপ্ত সহকারী ব্যবস্থাপক স¤্রাট আকবর বলেন, পুঁজির অভাবে সংকটের মুখে ক্ষুদ্র কুটির শিল্প দারকী তৈরীর কারিগরদের সহজ শর্তে ঋন প্রকল্পের প্রস্তাবনা উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। আশাকরি ঋণ প্রস্তাবনা পাশ হলে ক্ষুদ্র কুটির শিল্পটি আরো সমৃদ্ধ হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*