প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার মধ্যেও সোমবার ফের এপারে এসেছে রোহিঙ্গা পরিবার

প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার মধ্যেও সোমবার ফের এপারে এসেছে রোহিঙ্গা পরিবার
উখিয়া(কক্সবাজার)প্রতিনিধি : এপারে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে প্রত্যাবাসন (নভেম্বর) মাঝামাঝি সময়েই শুরু করার কথা দিলেও ফের রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে।সোমবার উখিয়ার কুতুপালং টিভি রিলে কেন্দ্র সংলগ্ন ট্রানজিট ক্যাম্পে এসেছে ৪ পরিবারের ১১জন নারী, পুরুষ ও শিশু। অনুপ্রবেশকারী এসব রোহিঙ্গা জানিয়েছেন মিয়ানমারে এখনো সেনা নির্যাতন অব্যাহত থাকায় তারা বাংলাদেশে চলে আসতে বাধ্য হয়েছে।সোমবার সকালে ট্রানজিট ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়া মংডু হারিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মো. ইউনূছ (৪৫) জানান, গত বছরের ২৫ আগস্টের পর থেকে মিয়ানমার জাতিগত নিধন অব্যাহত রাখলেও তারা অনেক কষ্টের মধ্যে সপরিবারে মিয়ানমার অবস্থান করছিলেন। কিন্তু সহায়-সম্বল শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশে চলে আসতে বাধ্য হয়েছেন। স্ত্রী আনোয়ারা বেগম (৪০) ছেলে মো. খাঁন (১৬) এবং মেয়ে হান্না বিবিকে (১৫) নিয়ে গত রোববার নৌকায় করে টেকনাফের নাফ নদী পার হয়ে শাহপরীরদ্বীপ ওঠেন। সেখান থেকে গাড়িতে করে উখিয়ায় আসেন।ছেলে মো. খাঁন বলেন, গত বছরের ২৫ আগস্টের পর তাকে মিয়ানমার সেনাবাহিনী আটক করে জেলে নিয়ে যায়। ১০মাস পর জেল থেকে মুক্ত হয়ে পিতা-মাতা ও বোনসহ বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন।খাঁন আরও জানান, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের এক প্রকার বন্দি করে রেখেছে দেশটির সেনাবাহিনী। রাখাইনে এখনো বেশকিছু রোহিঙ্গা রয়েছে। তাদেরকে স্থানীয় বাজারগুলোতেও যেতে দেয়া হচ্ছে না। ফলে ওই রোহিঙ্গারা খাবার সংকটে ভুগছে। এখন মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর কৌশলগতভাবে নির্যাতন করছে। ফলে তাদের ওপর নৃশংসতার ঘটনাগুলো সামনে আসছে না। এমন নির্যাতন চলতে থাকলে রাখাইনের সব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসবে।
তাদের সঙ্গে এসেছে মিয়ানমারের বুচিডং লাউওর পাড়া এলাকার বাসিন্দা মৃত-রশিদ আহমদের ছেলে মো. হোছন (২৫) ও তার স্ত্রী আমেনা বেগম (২০)। তারাও জানান, রাতের বেলায় পাহাড়ে-জঙ্গলে অবস্থান করে দিনের বেলায় বাড়িতে ফেরতে হয়। এভাবে দীর্ঘ ১২ মাস মিয়ানমারে ছিলেন। প্রকাশ্যে কোনো প্রকার কাজকর্ম করতে না পারায় আর্থিক সংকটে পড়ে এ দেশে চলে এসেছেন।
মিয়ানমারের বুচিডং মিনজি গ্রামের থেকে এসেছে ছেনুয়ারা বেগম (২২)। ১৭ মাসের শিশু সন্তান মো. হাবিবকে বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ট্রানজিট ক্যাম্পে। তার সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, গত ১০ মাস আগে তার স্বামী ফায়জুল করিমকে (২৮) সেদেশের সেনাবাহিনী হত্যা করেছে। সেই থেকে বাংলাদেশে চলে আসার জন্য বহুবার চেষ্টা করলেও কোনো সঙ্গীয় লোকজন না পাওয়া এত দিন কষ্ট করে শিশুসন্তান নিয়ে মিয়ানমারে অবস্থান করছিলেন।একই ভাবে মিয়ানমারের শাহাব বাজার এলাকার বাসিন্দা মো. হোবাইর (২৪) ও তার স্ত্রী শাহজান বেগম (১৮) তারাও মিয়ানমার থেকে এসেছে গত দু’দিন আগে।
অনুপ্রবেশকারী এসব রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গাদের ওপর এখনও নির্যাতন চলছে। তাদের অনেককেই দাস বানিয়ে রাখা হয়েছে। শোষণের হাত থেকে বাঁচতে তারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসার চেষ্টা করছেন। যারা সুযোগ পাচ্ছে তারা পালিয়ে আসছে।এদিকে গত মঙ্গলবার উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিব মিন্ট থোয়ে বলেন, ৮হাজার ৩০জনের তালিকা হতে যাছাই-বাছাই করে ৫ হাজার রোহিঙ্গা শনাক্ত করা হয়েছে। তারমধ্য থেকে নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে প্রথম ধাপে ২ হাজার রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে ফেরত নেয়া হবে। পরবর্তী বাদ বাকিদের ফেরত নেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন মিন্ট থোয়ে।তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরার বিষয়ে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়েছি। ‘আমরা শুধু নিরাপত্তা নয়, আনুষঙ্গিক বিষয় মাথায় রেখেই একটা পদক্ষেপ নিয়েছি।
রোহিঙ্গা নেতা দিল মোহাম্মদ জানান, মিয়ানমারের কথায় আর কাজে মিল নেই। তারা একদিকে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় অপরদিকে রাখাইনে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে চলে আসতে বাধ্য করছে।
এব্যাপারে কক্সবাজার ৩৪ বিজিবি উপ-অধিনায়ক মেজর ইকবাল আহমেদ জানান, সম্প্রতি রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের কোনো খবর তাদের কাছে নেই। তবে বিজিবির চোঁখ ফাঁকি দিয়ে সাগরের মাছ ধরার ট্টলারে করে রোহিঙ্গা আসলে আসতেও পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
উল্লেখ্য, গত বছরের ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দমন-পীড়ন শুরু হলে ৭ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এর আগ থেকেই ৪ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছিল। সব মিলিয়ে উখিয়া-টেকনাফে বর্তমানে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*