সালাম হে বীর! বীর চট্টলার মাহথির

সালাম হে বীর! বীর চট্টলার মাহথির
— সাফাত বিন ছানাউল্লাহ্

” এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী” নামেই যার পরিচিতি চট্টলা পেড়িয়ে বহির্বিশ্বে। তিনি একজন তিনবারের মেয়র, সফল নগরপিতা, কারো কাছে রাজনৈতিক গুরু, কারো অভিভাবক পিতৃতুল্য। এত বিশেষণে বিশেষিত যিনি তিনি হলেন ইতিহাসের সূতিকাগারের বীর।
যার ত্যাগ, অবদান কোনদিন ভোলার নয় তার তুলনা তিনি নিজেই। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ বিনির্মাণের অন্যতম কারিগর ও তিনি। সমগ্র চট্টল বাসীর কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ছিলেন মহিউদ্দিন চৌধুরী।
১৯৯১ এর প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী সময়ে তার মানবসেবার কথা সমগ্র চট্টল বাসী মনে রাখবে আজীবন।
ছাত্রজীবন থেকে অত্যন্ত মেধাবী চৌধুরী শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের সাথে জড়িত ছিলেন প্রথমদিকে, তখন থেকেই গণমানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন তিনি। পর্যায়ক্রমে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে তিনি আওয়ামীলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হন। জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু তাকে খুবই স্নেহ করতেন, জাতীর পিতা যখনই চট্টগ্রাম আসতেন ট্রেন থেকে নেমে প্রথমে জিজ্ঞেস করতেন -” আমার মহিউদ্দিন কোথায়”। ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে একজন বীর যোদ্ধা হিসেবে তার কৃতিত্বপূর্ণ অবদান আজো কৃতজ্ঞচিত্তে স্বরণ করেন মুক্তিযোদ্ধারা। ১৯৯৪ সাল থেকে তিনি রেকর্ড তিনবার বীর চট্টগ্রামের নগরপিতা নির্বাচিত হন। মেয়র হিসেবে চট্টগ্রামে উন্নয়নে তিনি দেখান অভাবনীয় সাফল্য, তার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সারা দেশে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়। নির্বাচনের সময় যে স্লোগানগুলো উচ্চারিত হতো জনতার মুখে মুখে ” সুখের দিন দুঃখের দিন, মহিউদ্দিন মহিউদ্দিন, সুখে দুঃখে যাকে পাই সে আমাদের মহিউদ্দিন ভাই “।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে কোনদিন আপোষ করেননি তিনি, নিজ দলের নেতা এমপি- মন্ত্রীকেও ছাড়েননি অন্যায় কাজের জন্য। এজন্য অনেকের বিরাগভাজন হলেও দল মত নির্বিশেষে সকলের আপন হতে পেরেছিলেন চট্টল বীর।
স্বাধীনতা বিরোধী ও ঈমান আকিদা ধংসকারীর বিরুদ্ধে তার অবস্থান ছিল অত্যন্ত কঠোর। চট্টগ্রামের অনেক মসজিদে জামায়াত- ওয়াহাবি মুক্ত রাখতে তিনি রেখেছিলেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বাংলাদেশের অন্যতম জাতীয় মসজিদ জমিয়তুল ফালাহতে সুন্নী খতিব নিয়োগে রোগাক্রান্ত বৃদ্ধ বয়সে তার অবর্ণনীয় ত্যাগ অতুলনীয়।
তিনি আজীবন অসহায় মানুষজনেরর পাশে থেকেছেন, দুঃখি মানুষের তিনি ছিলেন শেষ আশ্রয়স্থল।
আমি (লেখক) একজন রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। বড় আব্বু বীর মুক্তিযোদ্ধা বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ মরহুম হাবিবউল্লাহ জাহিদ (মিঞা) চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামীলীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে থাকাকালীন এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সাথে ছিল গভীর সুসম্পর্ক। মরহুম বাবা ছানাউল্লাহ্ আওয়ামী বিদ্যুৎ শ্রমিকলীগ বাকলিয়া জোন কার্যকরী সভাপতি ছিলেন। বাবার সাথে চৌধুরী সাহেবের ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, সেই সুবাদে ওনি প্রায়ই চশমাহিলে যেতেন এবং রাজনৈতিক, সামাজিক বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ করতেন, তাছাড়া বাবা মহিউদ্দিন চৌধুরীর ভক্ত ছিলেন এবং ওনার চট্টল বীরের বেশ কয়েকটি ভাষণ হুবুহু মুখস্থ ছিল। নানাভাই অবিভক্ত বীর চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামীলীগের সাবেক প্রচার ও দপ্তর সম্পাদক, মহান মুক্তিযুদ্ধ চট্টগ্রাম অঞ্চলের অন্যতম সংঘটক, জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী, লেখক ও কলামিস্ট মরহুম মিঞা আবু মোহাম্মদ ফারুকীর রাজনৈতিক সহকর্মী ছিলেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। জবাব চৌধুরী অনেকবার আমার নানাবাড়ি পটিয়ার ফারুকী পাড়াতেও এসেছিলেন। জীবনের শেষ সময়গুলোতে শয্যাশায়ী নানাভাইকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতালে দেখতে এসেছিলেন একাদিকবার, চিকিৎসার খোজখবর ও নিয়েছেন নিয়মিত।
চট্টল বীরের সাথে আমার (লেখকের) একবার দেখা ও আলাপ হয়- আজ থেকে পাঁচ বছর আগে চট্টলার রাজনীতির আরেক কৃতি পুরুষ মরহুম আখতারুজ্জামান চৌধুরী (বাবু) র গ্রামের বাড়ী আনোয়ারা হাইলধরের নামাজে জানাযায়। এখনো মনে পরে সেই স্বৃতি।
শহীদ বশরুজ্জামান উচ্চ বিদ্যালয়ের (আখতারুজ্জান চৌধুরীর বড় ভাই – মহান মুক্তিযুদ্ধের চট্টগ্রামের প্রথম শহীদ) সম্মুখে দুটি চেয়ার নিয়ে বসেছিলেন মহিউদ্দিন চৌধুরী ও তৎকালিন চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সভাপতি বর্তমানে রূপালি ব্যাংকের পরিচালক আবু সুফিয়ান। হাজার হাজার জনতার ভিড় সামলে আমি সাহস করে দুজনের সামনে গিয়ে সালাম করলাম এবং আমার পরিচয় দিলাম মিঞা ফারুকীর নাতী। পরিচয় পেয়েই মহিউদ্দিন চৌধুরী আবু সুফিয়ান সাহেবের দিকে ফিরে নানাভাইয়ের বিভিন্ন প্রশংসা করতে লাগলেন, এক পর্যায়ে আমাকে কাছে ডেকে স্নেহের আলিঙ্গন করলেন। বাড়ী কোথায়, কোন ক্লাসে পড়ি, পরিবারে কে কে আছে? ইত্যাদি প্রশ্ন করলেন। সেদিন আমি মন্ত্রমুগ্ধের মত দেখছিলাম প্রথম দেখাতে একজন অপরিচিত ছেলের সাথে ওনার সৌহার্দপূর্ণ আচরন।
তিনি এমনই! আজ সেই মানুষটি আমাদের মাঝে নেই। হয়ে গেলেন অন্য এক পৃথিবীর বাসিন্দা। ১৫ ই আগষ্ট বঙ্গবন্ধু শাহাদত বরণ করেছিলেন, ১৫ই ডিসেম্বর চলে গেলেন চট্টল বন্ধু। মাস আর সালটা ভিন্ন হলেও কাকতালীয় ভাবে সময়টাও প্রায় একই।
১৫ ডিসেম্বর ২০১৬ বৃহস্পতিবার গভীর উৎকণ্ঠা নিয়ে নির্ঘুম রজনী পার করেছি। রাত যত বাড়ছে গুজবও ছড়িয়েছে অনেকবার, অবশেষে ভোররাতে মাথায় ওই বড় আকাশটা ভেঙ্গে পড়ার মত খবরটা শুনে দুচোখে অশ্রু আর বাঁধ মানেনি প্রিয় ব্যক্তিত্বের জন্য। তিনি গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় সিঙ্গাপুর গিয়ে সুস্থ হয়ে ফিরে এসে প্রিয় চট্টলার বুকেই গভীর নিদ্রায় শুয়ে রইলেন। আজীবন পরোপকারী মানুষটির অন্তিম যাত্রা ও সৃষ্টিকর্তা মহাপবিত্র মাস রবিউল আওয়ালের জুমাবারে দান করলেন।
চট্টল বীরের স্বরণকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নামাজে জানাযায় তার দীর্ঘসংগ্রামের ঐতিহাসিক লালদিঘী ময়দানে সব দলের নেতা- কর্মী, দেশবরেণ্য ওলামায়ে কেরাম সহ লক্ষ লক্ষ জনতার গগনবিদারী আহাজারি এটাই প্রমাণ করে গণমানুষের হৃদয়ে তিনি কতটুকু জায়গা জুড়ে আছেন। পরপারেও তিনি ভাল থাকবেন।
সালাম হে চট্টলবীর! বীর চট্টলার মাহথির ।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*