লক্ষাধিক মানবসন্তানের জীবনের বিনিময়ে অর্জিত ::  মহান বিজয় দিবস

লক্ষাধিক মানবসন্তানের জীবনের বিনিময়ে অর্জিত ::  মহান বিজয় দিবস
—মোঃ মহসিন হোসাইন
বিশ্বের বেশির ভাগ দেশেই স্বাধীনতা অথবা জাতীয় দিবস আছে। বাংলাদেশে স্বাধীনতা দিবস তো আছেই তার সাথে আছে একটি বিজয় দিবস, যা অন্য কোনো দেশের আছে বলে জানা নেই। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা এবং এটা একান্ত নিজস্ব। যে কোনো বিষয়ে বিজয় ছিনিয়ে আনতে হলে পরিশ্রম, ত্যাগ স্বীকার আর দীর্ঘ প্রস্তুতি নিতে হয়। এসবের সাথে বাংলাদেশের এই বিজয় ছিনিয়ে আনতে দেশের ত্রিশ লাখ মানুষকে নিজের জীবন উৎসর্গ করতে হয়েছে, আড়াই লাখ মা-বোনকে নিজের ইজ্জত দিতে হয়েছে। এ বিজয়টা দেশের বিজয়, এ বিজয়টা দেশকে দখলদার পাকিস্তানি সেনা সদস্যদের হাত হতে মুক্ত করার বিজয়, এই বিজয় দেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের বিজয়। ২০১৮ সালে বাংলাদেশের মানুষ এই বিজয়ের ৪৮ বছর পূর্তি উদযাপন করবে। বিগত কয়েক বছরের মতো এবারও যখন দেশ এই বিজয় দিবস উদযাপন করবে তখন যে দলটির নেতৃত্বে দেশের মানুষ একাত্তরে দেশকে মুক্ত করতে যুদ্ধে গিয়েছিল সেই দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র ক্ষমতায়। এই কয়েক বছর এটি অনেকটা বাংলাদেশের মানুষের বাড়তি পাওনা, কারণ ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে ছিল। এই দীর্ঘ সময়ে নিয়মমাফিক স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবস পালন করা হয়েছে ঠিক কিন্তু তাতে এ দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিনের মূল অনুভূতি বা স্পিরিট উপস্থিত ছিল না। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর জেনারেল জিয়া ক্ষমতা দখল করে প্রথমে যে কাজটি করেন তা হচ্ছে আমাদের পবিত্র সংবিধানের মূল ভিত্তি বলে যাকে স্বীকার করা হয় সেই সংবিধানের প্রস্তাবনাকেই পাল্টে ফেলেছিলেন। ১৯৭২-এর সংবিধানের প্রস্তাবনায় শুরুতেই লেখা ছিল ‘আমরা বাংলাদেশের জনগণ, ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসের ২৬ তারিখে স্বাধীনতা ঘোষণা করিয়া জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করিয়াছি।’ জিয়া ১৯৭৮ সালে এক আদেশ বলে ‘জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের’ পরিবর্তে ‘জাতীয় স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধের’ শব্দ কয়টি প্রতিস্থাপন করেন। ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থে সংবিধানের সেই যে ব্যবচ্ছেদের শুরু তা জিয়ার শেষ দিন পর্যন্ত চলেছে। তার মৃত্যুর পর এরশাদও তা মোটামুটি বজায় রাখেন। জিয়ার এই ব্যবচ্ছেদের একমাত্র কারণ ছিল বাঙালির দীর্ঘদিনের ‘মুক্তির জন্য সংগ্রামকে’ অস্বীকার করা এবং এটি স্থাপিত করা যে বাঙালির ইতিহাসের শুরু একাত্তরে ২৭ মার্চ যখন তিনি বঙ্গবন্ধুর পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেছিলেন। তিনি স্বজ্ঞানে বাঙালির দীর্ঘ ২৩ বছরের সংগ্রামের ইতিহাসকে অস্বীকার করার অপচেষ্টা করেছিলেন। ইতিহাস পাল্টানোর চেষ্টা এক ধরনের চরম মূর্খতা ।
১৯৭১ সালে বাঙালির জাতীয় মুক্তির জন্য যুদ্ধের চূড়ান্ত পর্ব শুরু হলেও তার সূত্রপাত ১৯৪৮ সালে যখন ঢাকায় এসে নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা করছিলেন পাকিস্তানের মাত্র ৬ ভাগ মানুষের ভাষা উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। জিন্নাহর ধারণা ছিল উর্দু হচ্ছে মুসলমানদের ভাষা এবং তার বহু জাতিভিত্তিক পাকিস্তানকে এক রাখতে হলে একটি তথাকথিত মুসলমানি ভাষার প্রয়োজন এবং তা হচ্ছে উর্দু আর জিন্নাহর পাকিস্তান তো সৃষ্টিই হয়েছিল মুসলমানদের পৃথক আবাসভূমি হিসেবে। জিন্নাহ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ভুল রাজনীতির ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছিলেন। জিন্নাহর দ্বি-জাতিতত্ত্বের উদ্ভট ধারণার কারণে পাকিস্তান ও ভারত সীমান্তের উভয় পার হতে লক্ষ লক্ষ মানুষ বাপ-দাদার ভিটেমাটি হতে উচ্ছেদ হয়েছিলেন, প্রাণ হারিয়েছিলেন আরও লক্ষাধিক মানবসন্তান। শেখ মুজিব (তখনও তিনি বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠেন নি) তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে’ লিখেছেন তিনি পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই বুঝেছিলেন যে পাকিস্তানের জন্য তিনি নিজেও একজন কর্মী হিসেবে আন্দোলন করেছেন আসলে সেই পাকিস্তানে বাঙালির মুক্তি আসবে না। বাঙালির মুক্তির জন্য বাঙালির নিজেকেই নিজের ভাগ্য নিয়ন্ত্রক হতে হবে। তা করতে হলে চাই একটি রাজনৈতিক সংগঠন। প্রথমে তিনি গড়ে তুলেছিলেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। বস্তুতপক্ষে ছাত্রলীগই ছিল পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারকে চ্যালেঞ্জ করার মতো প্রথম সংগঠন। ছাত্রলীগের প্রথম আহ্বায়ক ছিলেন নইমুদ্দিন আহমেদ। আর ছিলেন বিভিন্ন জেলা হতে ১৪ জন সদস্য, যাদের মধ্যে আবদুর রহমান চৌধুরী, শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, শেখ আবদুল আজিজ, খালেক নেওয়াজ অন্যতম। যদিও নামের সাথে মুসলিম শব্দটি ব্যবহার করা হয় কিন্তু বাস্তবে ছাত্রলীগ সব সময় অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিল। ১৯৫৩ সালে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে ছাত্র সংগঠনটির নামকরণ করা হয় শুধু ‘ছাত্রলীগ’। বর্তমান ছাত্রলীগের কজন এই ইতিহাস জানে? ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনে যে কটি সংগঠন সামনের কাতারে থেকে নেতৃত্ব দেয় তার মধ্যে মুসলিম ছাত্রলীগ ছাড়া আরও ছিল তমুদ্দিন মজলিস। ভাষা আন্দোলনের মূল দাবিই ছিল উর্দুর সাথে সাথে বাংলাকেও পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করতে হবে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ছিল বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রথম আন্দোলন যা জিয়া অস্বীকার করার জন্য সংবিধানের প্রস্তাবনায় সংশোধনী এনেছিলেন।
১৯৪৯ সালে জন্ম হয় অবিভক্ত পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী দল, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম আওয়ামী লীগ। এই দল গঠনের পিছনেও অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বাঙালিদের প্রতি পাকিস্তানি শাসক দল মুসলিম লীগের এক চোখা নীতিকে চ্যালেঞ্জ করার। আওয়ামী লীগের প্রথম কান্ডারি ছিলেন সভাপতি মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, আতাউর রহমান খান, আবদুস সালাম খান, শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, ইয়ার মুহাম্মদ খান প্রমুখ। শুরুতেই আওয়ামী লীগ জনগণের মুক্তির জন্য ১২-দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে যার প্রারম্ভে বলা হয়েছিল ‘পাকিস্তানের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হবে জনগণ।’ অবিভক্ত পাকিস্তানের ২৩ বছরের ইতিহাসে জনগণ কখনও দেশটির ক্ষমতার মালিক হন নি। এই ২৩ বছরে ১৯৭০ সাল ছাড়া পাকিস্তানে কখনও একটি জাতীয় নির্বাচন করা সম্ভব হয় নি। ১৯৫৬ সালে একটি সংবিধান প্রণীত হয়েছিল কিন্তু তাকে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক দল কখনও কার্যকর করতে দেয় নি। তার আগেই আইউব খানের নেতৃত্বে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী দেশটির ক্ষমতা দখল করেছিল। সেই থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে পাকিস্তান তাদের সেনাবাহিনী দ্বারা শাসিত হয়েছে। সেই সেনাশাসনের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ লাগাতার আন্দোলন করেছে। সেই আন্দোলনের একপর্যায়ে ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিব বাঙলির মুক্তি সনদ ৬-দফা ঘোষণা করেন। এই ৬-দফার বিরুদ্ধে দলের ভিতরে অনেক বিরোধিতা ছিল। ১৯৬৭ সালে শেখ মুজিবকে একজন রাজবন্দি হিসেবে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৬৮ সালে তার বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র নামক একটি রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা সাজিয়ে তাকে জেলগেট হতে ফের গ্রেফতার করা হয়। এসব ঐতিহাসিক সত্য জিয়া বা তার উত্তরসূরিরা স্বীকার করেন না। ১৯৬৯-এর ছাত্র জনতার গণ-আন্দোলনের তোড়ে ভেসে যায় স্বয়ং আইউব খান আর তার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। শেখ মুজিব হয়ে ওঠেন বঙ্গবন্ধু, বাঙলির অবিসংবাদিত নেতা। আইউব খানের পতনের পর ক্ষমতায় আসেন আর এক সেনাশাসক ইয়াহিয়া খান। তার দেওয়া সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এক ধস নামানো বিজয় অর্জন করে। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী বাঙালির হাতে ক্ষমতা ছাড়বেন কেন? শুরু হয় নতুন ষড়যন্ত্র। তখন মুক্তিযুদ্ধ হয়ে উঠে অনিবার্য যার পরিসমাপ্তি হয় একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর, যেটি আমাদের বিজয় দিবস।
১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ পর্যন্ত বাঙালির এই দীর্ঘ পথচলাকে অস্বীকার করতে চেয়েছেন পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট পরবর্তীকালের সকল শাসক। ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা প্রথমবার ক্ষমতায় এলে দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদা সহকারে পালন শুরু হয়। ১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগের পুনরায় ক্ষমতায় ফিরাটাও ছিল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। ২১ বছর পর ক্ষমতায় ফেরার এমন দৃষ্টান্ত শুধু উপমহাদেশেই নয় খুব কম দেশেই পাওয়া যাবে। বিজয় দিবস শুধু একটি দিন নয়। এদিনটি আমাদের পিছনে ফিরে তাকানোর দিন। আজ থেকে ৪৪ বছর আগে বাঙালি কেন যুদ্ধে গিয়েছিল সেই প্রশ্নের জবাব খোঁজার দিন। এটি বাঙালির জাতিসত্তার পুনঃআবিষ্কারের দিন। এটি অতীত ভুল-ভ্রান্তি হতে শিক্ষা নেওয়ার দিন। এটি ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের ঋণের কথা স্বীকার করার দিন। ২০১৮ সালের বিজয় দিবসের প্রাক্কালে সকল শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক পরিচিতিঃ
কবি,লেখক,কলামিষ্ট ও সাংবাদিক
সাংগঠনিক সম্পাদকঃ স্বপ্নীলকন্ঠ সাহিত্য সাংস্কৃতিক পরিষদ,কচুয়া উপজেলা শাখা, চাঁদপুর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*