দুই ঘাতকের মৃত্যুদণ্ড

Pic-28অনেক সন্দেহ, সংশয়, অবিশ্বাসকে পেছনে ফেলে শেষ পর্যন্ত কার্যকর করা হলো দুই শীর্ষ স্বাধীনতাবিরোধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধকারীর মৃত্যুদণ্ড। জাতি আজ অনেকটাই কলঙ্কমুক্ত। সংগত কারণেই দেশে আজ এক আনন্দময় পরিবেশ বিরাজ করছে। অথচ স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুই যুগেরও বেশি সময় তারা প্রবল প্রতাপে বিরাজ করেছে। তারা মন্ত্রী হয়েছে। ৩০ লাখ শহীদের রক্তে রঞ্জিত পতাকা উড়েছে তাদের গাড়িতে। শুধু তা-ই নয়, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে, মুক্তিযুদ্ধের অর্জন নিয়ে, এমনকি ৩০ লাখ শহীদকে নিয়ে কত ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ, দম্ভোক্তিই না করেছে এই প্রতাপশালী ঘাতকরা। আর তাদের রাজনীতিতে পুনর্বাসন করে একই রকম নিষ্ঠুর তামাশা করা হয়েছে এ দেশের রাজনীতির অঙ্গনে। আজ এই বিচারের মধ্য দিয়ে সব দম্ভ, সব জিঘাংসার অবসান হয়েছে। আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

কে এই সাকা চৌধুরী? কে এই মুজাহিদ? তাদের একটিই পরিচয়, দুজনই ১৯৭১ সালের নরঘাতক। সাকা চৌধুরীর নেতৃত্বে তখন চট্টগ্রাম শহরে পরিচালিত হয়েছে একাধিক নির‌্যতনকেন্দ্র। মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতাকামী মানুষকে ধরে এনে এসব কেন্দ্রে নির‌্যতনের পর হত্যা করা হতো। রাউজানে থাকা কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের মালিক নূতনচন্দ্র সিংহ, সুলতানপুর ও ঊনসত্তরপাড়ার হিন্দু বসতিতে গণহত্যা ও হাটহাজারীর আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজাফফর ও তাঁর ছেলে শেখ আলমগীরকে হত্যার দায় সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় সাকা চৌধুরীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

অথচ এই ব্যক্তি এরশাদ সরকারের আমলে মন্ত্রী ও পরবর্তীকালে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উপদেষ্টা নিযুক্ত হয়। আর আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ একাত্তরে ছিল জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের পূর্ব পাকিস্তান শাখার সভাপতি এবং কুখ্যাত আলবদর বাহিনীর প্রধান। বাংলা না জানা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সাংবাদিক, শিক্ষকসহ বুদ্ধিজীবীদের ধরে আনা ছিল প্রায় অসম্ভব।

মুজাহিদের নেতৃত্বে বুদ্ধিজীবী হত্যার সেই নীলনকশা বাস্তবায়ন করেছিল এই আলবদর বাহিনী। উদ্দেশ্য ছিল স্বাধীন হতে চলা দেশটির অপূরণীয় ক্ষতি করা। জাতিকে মেধাশূন্য করা। সেই সঙ্গে গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ তথা কোনো অপরাধই বাদ দেয়নি এই বাহিনী। তাই মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ড শহীদ বুদ্ধিজীবীদের পরিবারের সদস্যদেরও একটি প্রধান দাবি ছিল। তার মৃত্যুদণ্ড সারা দেশের মানুষের পাশাপাশি তার নিজ জেলা ফরিদপুরের মানুষকেও আনন্দিত করেছে। সেখানে উল্লাস হয়েছে, মিষ্টি বিতরণ করা হয়েছে। এই মুজাহিদও বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সমাজকল্যাণমন্ত্রী নিযুক্ত হয়েছিল।

দুই ঘাতকের বিচারে সারা দেশ খুশি হলেও খুশি হতে পারেনি বিএনপি ও জামায়াত। বিএনপি বলেছে ন্যয়বিচার হয়নি। জামায়াত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার প্রতিবাদে আজ হরতাল ডেকেছে। অথচ এই বিচার আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। সব আইনি প্রক্রিয়ার সুযোগ নেওয়ার পরও জামায়াতের এ ধরনের হরতাল ডাকাকে দেশের মানুষ ঔদ্ধত্য হিসেবেই দেখছে, ধিক্কার জানাচ্ছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে চলুক-এটাই আজ দেশবাসীর প্রত্যাশা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*