মান্দার গনেশপুরে শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে হিন্দু -মুসলমান সম্প্রদায়ের লোকজনের মিলনমেলা!

মান্দার গনেশপুরে শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে হিন্দু -মুসলমান সম্প্রদায়ের লোকজনের মিলনমেলা!

মাহবুবুজ্জামান সেতু, নওগাঁ প্রতিনিধি: নওগাঁর মান্দায় এই প্রথম হিন্দু সম্প্রদায়ের শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে মুসলমান সম্প্রদায়ের প্রায় ১ হাজার লোকজনকে নিমন্ত্রণ করা হয়েছে। জানামতে, মান্দার গনেশপুরে এখন পর্যন্ত শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে হিন্দু এবং মুসলমান সম্প্রদায়ের লোকজনের মিলনমেলা কখোনো হয় নাই। জানাগেছে,গনেশপুর গ্রামের একসময়ের প্রতাপশালী এবং সম্পদশালী লোকছিলেন মৃত শ্রীমন্ত প্রামানিক। তিনি বৈবাহিক জীবনে গোষ্ট বালা দেব্যাকে বিবাহ করেন। দীর্ঘদিন সংসার জীবন অতিবাহিত করেন।কিন্তু দাম্পত্য জীবনে গোষ্ট বালা কখনোই মা হতে পারে নাই। পরবর্তিতে সন্তান লাভের অাশায় ওই গোষ্ট বালারই অাপন ছোটবোনের সাথে বিবাহ বন্ধনে অাবদ্ধ হন। এরই মধ্যে গোষ্টবালা কোন সন্তান জন্মদিতে না পারার কারনে বাধ্য হয়ে একসময় শ্রীমন্ত অন্যের কাছ থেকে ধিরা নামের এক শিশু সন্তানকে দত্তক গ্রহন করে নিজের সন্তানের মতোই লালন পালন করতে থাকে। মজার ব্যাপার হলেও সত্য যে, গোষ্ট বালার সন্তান জন্মদানে অক্ষমতার কারনে শ্রীমন্ত প্রামানিকের দ্বিতীয় বিয়ের মাঝে দত্তক হিসেবে অন্যের সন্তান গ্রহন এবং লালন পালনের এক পর্যায়ে দ্বিতীয় স্ত্রীর পক্ষের বেশ কয়েকটি ছেলে এবং মেয়ে হয়। পুত্রসন্তানদের মধ্যে তাদেরই একজন মৃত বিরা প্রাং, বিমল প্রাং, অমল প্রাং, পরি প্রাং। অার কন্য সন্তান জোৎস্না। শ্রীমন্তের পূর্বের স্ত্রীর নিজের সন্তান নেই তাতে কি হয়েছে? তারই ছোট বোন (সতীন) এর সন্তান অাছে। অার ছোটবোনের সন্তানদের ছোটথেকে বড় হওয়া পর্যন্ত লালন পালন করতে যতোসব ঝামেলা পোহাতে হতো ওই গোষ্ট বালা কেই। শ্রীমন্তের স্থানীয় প্রতিবেশিরা জানায়, বড় স্ত্রীর সন্তান নেই বা তারা যে সহোদর দুবোন একই পরিবারে এতোটা বছর কাটিয়েছে জীবনে কখোনো তাদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা লক্ষ্য করা যায় নি। খুব শান্ত প্রিয় তারা। অার গোষ্টবালার ছোটবোনের পক্ষের সন্তানেরা কখনোই তাকে মায়ের চেয়ে কম ভালোবাসেন নাই। নিজের মায়ের চেয়ে বেশি ভক্তি ছিলো তার প্রতি। এমন কথাও জানান অনেকে যে, শ্রীমন্তের বড় স্ত্রীর হাতে কি জানি ঘা ছিলো। রান্না-বান্না সব ছোট স্ত্রী করতো। অার বড় স্ত্রী ছোট বোনের (সতীন) সন্তানদেরকে খাইয়ে দিতেন,গোসল করিয়ে দিতেন। এজন্য না কি নিজের মায়ের চেয়ে মাসি,বড়-মা,সৎ মা যাই বলা হোক না কেনো? গোষ্টবালার প্রতি ছিলো ছোট বোনের পক্ষের ছেলেমেয়েদের অগাধ ভালোবাসা। তারা তাকে কখোনোই মা ছাড়া ডাকতো না। জনশ্রুতি অাছে, মৃত শ্রীমন্ত প্রামানিক নাকি কোনো এক সময় বলিহার রাজার রাজবাড়ি কিনতে গেছিলেন। বার্ধক্য জনিত কারনে সেপ্টেম্বর মাসের ২ তারিখ মৃত্যবরন করেন গোষ্টবালা (৯৫)। হিন্দু সম্প্রদায়ের নিয়মনীতি উপেক্ষা করে সর্বসম্মতিক্রমে অাধুনিক সংস্কৃতির প্রাধান্য স্বরুপ তাকে চিতার অাগুনে না পুরিয়ে মাটির নিচে -(মুসলমানদের মতো) রাখেন। মান্দার গনেশপুর ইইউনিয়নের কয়েকবার নির্বাচিত অবিবাহিত সফল মেম্বার চিরোকুমার বিমল প্রামানিকের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এবং তাদের পারিবারিকভাবে সার্বিক সহোযোগীতায় বড় মায়ের শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানের অায়োজন করেন শনিবারে । দিনব্যাপী এ অায়োজনে গনেশপুর, গোপালকৃষ্ণপুর,কৃষ্ণগোপালপুর, শ্রীরামপুর, কচুকুড়ি এবং পবাতৈর গ্রামের অাত্মীয় স্বজনসহ পার্শ্ববর্তী গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের ১৪’শ জন এবং মুসলমান সম্প্রদায়ের ১হাজার সর্বোমোট ২৪’শ জন বা তারো বেশি অামন্ত্রিত এবং নিমন্ত্রিত মেহমান উপস্থিত ছিলেন। শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে হিন্দু -মুসলমান সম্প্রদায়ের জন্য ছিলো অালাদা খাবার এবং বসার ব্যাবস্থ। শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে ডেকোরেশনসহ ভি অাইপি অাসন মাটির উপর চট এবং চেয়ারে বসার ব্যাবস্থা ছিলো । কেনোনা, বর্তমানে গ্রামাঞ্চলে এসব অনুষ্ঠানে কলার পাতার খুব অভাব। অার তাই খাবার ছিলো ওয়ান টাইম প্লেটে ভাত, মাছ,অালুর ঘাটি, দই, মিষ্টি ইত্যাদি। ঝড়বৃষ্টি, কাঁদাপানি উপেক্ষা করে নিমন্ত্রিত মেহমানেরা অংশগ্রহন করেন। তাদের মধ্যে গনেশপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম চৌধুরী বাবুল, সাবেক ইউপি সদস্য অাশরাফুল ইসলাম, লয়েজ উদ্দিন, অাব্দুল করিম, জাহাঙ্গীর এবং অাজাদ মেম্বার, অালহাজ্ব কায়েম উদ্দিনসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে অাগত নিকট অাত্মীয় স্বজন। শেষে মৃতের অাত্মার শান্তি কামনায় অাশির্বাদ করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*