মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ, আগামী নির্বাচন, মুক্তিযোদ্ধাদের ভাবনা

মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ, আগামী নির্বাচন, মুক্তিযোদ্ধাদের ভাবনা
গেরিলাযোদ্ধা ফজল আহমদ
১৯৭১ এ বাঙ্গালী জাতি দীর্ঘ নয় মাস পাকিস্তানী বাহিনীর বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের ভেতর দিয়ে স্বাধীন স্বার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে। বাঙ্গালী জাতির মুক্তির জন্য রক্ত দেয়ার ইতিহাস অনেক দীর্ঘ, ১৯৭১ এ শেষ লড়াইয়ে বীরের জাতি বাঙ্গালী যুদ্ধে জয় লাভ করে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে। যার মূল নেতা জাতির জনক বঙ্গঁবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। বাঙ্গালী জাতির আশা ভরসার একমাত্র যাদুকরি শক্তি ছিল জাতির জনকের। দীর্ঘ নয় মাস পাকিস্তানের কারাগারে থেকে পরিশেষে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে বঙ্গঁবন্ধু মুজিবকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছিল, পাকিস্তানী সামরিক জান্তা।
সে মাহেন্দ্রক্ষণ, ১০ জানুয়ারী-৭১, বিধ্বস্ত বাংলাদেশে ফিরে এলেন বাঙ্গালী জাতির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান জাতির জনক বঙ্গঁবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা, গেরিলা যোদ্ধা জীবন দিয়েছে। পাকিস্তানী বাহিনী নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করেছে প্রিয় স্বদেশ ভূমির ৩০ লক্ষ বাঙালীকে, লাখো লাখো মা বোনের ইজ্জত দিতে হয়েছে। কোটি মানুষকে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিতে হয়েছে। এমনি পরিস্থিতিতে জাতির জনকের স্বদেশ ফেরা এক ঐতিহাসিক হৃদয় বিদারক, আবেগ তাড়িত দিন, জাতি তাদের আশা-ভরসার মানুষকে ফিরে পেয়ে এত ত্যাগ, কষ্টের দিনগুলোকে বুকে ধারণ করে, মুজিবকে সামনে নিয়ে এগিয়ে যাবার শপথ নেয়।
বঙ্গঁবন্ধু মুজিব সোনার বাংলার শশানের উপর দাড়িয়ে স্বাধীনতার ১০ মাসের মাথায় জাতির জন্যে উপহার দেয় বিশ্বের সেরা সংবিধান। সংবিধানে ছিলো মূল চারনীতি বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, পাকিস্তান ৪৭ সানে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে স্বাধীনতা পেয়ে সংবিধান পেতে সময় লাগছিল নয় বছর, কিন্তু বাংলাদেশে সংবিধানের আলোকে জাতির প্রথম নির্বাচন হলো ’৭৩-এ। জাতির জনক মুজিব ও তার দল আওয়ামী লীগকে নিরঙ্কুশভাবে ভোট দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে শাসন, পুনর্গঠনসহ সর্বময় ক্ষমতা দেয়া হয়। জাতি আশা করেছিল মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ সংবিধানের আলোকের চার মূলনীতির ভিত্তিতে দেশ এগিয়ে যাবে, ইতিমধ্যে বঙ্গবন্ধুর আহবানে দেশের বীর মুক্তিযোদ্ধারা বঙ্গবন্ধু মুজিবের হাতে অস্ত্রসমর্পণ করে রেসকোর্স ময়দানে, কিন্তু পরিতাপের বিষয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করলেও তাদের এ দেশীয় দোসর জামাত ইসলামী, নেজামে ইসলামী, হেফাজতে ইসলামী, মুসলিম লীগের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী তাদের সশস্ত্র দলগুলো আলবদর বাহিনী, আলশামস বাহিনী, মিলিশিয়া বাহিনীর, মুজাহিদ বাহিনী, রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা আত্মসমর্পণ করেনি এবং তাদের বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র গোলাবারুদ সরকারের কাছে জমা দেয়নি। যা মুক্তিযোদ্ধারা জমা দিয়েছে। জাতির অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে পরাজিত শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করে। স্বাধীনতার পর পরই দেশে মুসলিম বাংলা স্লোগান দিয়ে দেশের পরাজিত শক্তি এক হতে শুরু করে। অন্যদিকে সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টি, জাসদের গণবাহিনী, পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি নামধারী দেশবিরোধী শক্তিগুলো মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে নতুন ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি করে। বঙ্গবন্ধু প্রশাসনকে অকার্যকর করে বঙ্গবন্ধু সরকারকে উৎখাত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। যার ফলশ্রুতিতে ’৭৫-এ জাতির জনক নিমর্মভাবে স্ব-পরিবারে হত্যা হয়।
’৭৫ এর ১৫ই আগস্ট হতে সংবিধান বিরোধী, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শবিরোধী শক্তি পাকিস্তান-চীনের আশীর্বাদ নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে। ’৭৫ এর পর হতে দেশ উল্টো পথে চলতে শুরু করে। ২১ বছর একনাগাড়ে দেশবিরোধী, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শবিরোধী, সংবিধানবিরোধী শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকায় দেশবাসী মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বাংলাদেশ দেখতে পায়নি।
ইতিমধ্যে সংবিধান ১৭ বার সংশোধন করা হয়েছে। সংবিধানের মূল চারনীতি পরিবর্তন করা হয়েছে। দীর্ঘদিন যাবৎ প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ সংগঠন, বীর মুক্তিযোদ্ধারা সংগ্রাম করেও ’৭২ সালের সংবিধান ফিরে পায়নি, সামরিক শাসক এরশাদ অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম” করে, আমরা অসাম্প্রদায়িকতার কথা মুখে বল্লেও দেশে সাম্প্রদায়িক ধারা অব্যাহত আছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রায় ৪৮ বৎসর অতিবাহিত হতে চলছে। দেশে দশবার সংসদ নির্বাচন হয়েছে, আজও দেশকে ’৭২ এর সাংবিধানিক ধারা ফিরাতে পারেনি। শাসকদল সমূহ নিজেদের ইচ্ছামত শাসন কার্য পরিচালনার জন্য বার বার সংবিধান পরিবর্তন করেছে।
এমন পরিস্থিতিতে দেশে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তোড়জোর শুরু হয়েছে। এ অবস্থায় দেশের জন্মদাতা বীর মুক্তিযোদ্ধারা তাদের অসম্মানের জায়গা থেকে সম্মানের জায়গায় ফিরে আসতে চায়, বীর মুক্তিযোদ্ধারা বিগত ৪৮ বছরেও সাংবিধানিক স্বীকৃতি পায়নি।
মুক্তিযোদ্ধাদের ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সী দেয়া হয়নি। জাতীয় পরিচয়পত্রে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নামের আগে বীর মুক্তিযোদ্ধা লেখা হয় না। জাতীয় পাসপোর্টে নামের আগে বীর মুক্তিযোদ্ধা লেখা হয় না। নারীদের জন্য জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী কোটা থাকলে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সংসদে কোন কোটা সংরক্ষণ করা হয়নি। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য জাতির জনক কর্তৃক প্রদত্ত ৩০% কোটা বাতিল করে দিয়ে ৩য়Ñ৪র্থ শ্রেণির নাগরিক পরিণত করা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে ফিরে পেতে মুক্তিযোদ্ধারা চায় ৭২ এর সংবিধান পূর্ণাঙ্গ ফিরে পেতে, চার মূলনীতি অবিকলভাবে ফিরে পেতে, মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ নিরাপদ করার জন্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ অব্যাহত রাখতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী কোন দল, শক্তি নির্বাচনে আসতে পারবে না। জামাতে ইসলাম, নেজামে ইসলাম, মুসলিম লীগসহ সকল মুক্তিযুদ্ধের আদর্শবিরোধী রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করতে হবে। রাজাকার, আলবদরসহ সকল মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী সংগঠনের সশস্ত্র যোদ্ধাদের তালিকা করে গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী দল সমূহ ব্যক্তি সমূহকে আগামী নির্বাচনের আগে অযোগ্য ঘোষণা করতে হবে। মুক্তিযোদ্ধাদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের ৩০% চাকুরীর কোটা পুনর্বহাল করতে হবে। জাতীয় সংসদের ৩০% মুক্তিযোদ্ধা কোটা সংরক্ষিত রাখতে হবে। জাতীয় নির্বাচনে ৬০%^ সংসদস সদস্য মুক্তিযোদ্ধাদের আসন দিতে হবে।
হেফাজত ইসলামীর ১৩ দফা প্রত্যাখ্যান করে শিক্ষা ব্যাবস্থাকে অসাম্প্রদায়িক ধারায় ফিরে আনতে হবে। সকল স্কুল, কলেজ, বিশ্ব বিদ্যালয়ের সামনে জাতির জনকের ম্যূরাল স্থাপন করতে হবে। সরকারে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের দল এবং সংসদে বিরোধী দল হবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আগামী নির্বাচনে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী রাজনৈতিক দল ও শক্তিকে ক্ষমতায় আনার জন্য সক্রিয়ভাবে মাঠে থাকতে হবে। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আগামী একাদশ নির্বাচন দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

লেখক- প্রাবন্ধিক ও মুক্তিযোদ্ধা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*