মেলান্দহে ২৫ ইটভাটার প্রভাবে কৃষি ও প্রকৃতি বিপর্যয়

মেলান্দহে ২৫ ইটভাটার প্রভাবে কৃষি ও প্রকৃতি বিপর্যয়
রোকনুজ্জামান সবুজ , জামালপুর প্রতিনিধি : জামালপুরের মেলান্দহে গড়ে ওঠেছে ২৫ টি ইটভাটা এরমধ্যে পৌরসভায় হাসপাতাল ও সরকারি কলেজ-মৎস্য খামার সংলগ্ন ১টি, উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন ১টি,জালালপুর প্রাইমারী স্কুল সংলগ্ন ১টি ,এবং ফুলছেন্না কৃষি-বসতি জমিতে ১টিসহ ৪টি ইটভাটা গড়েওঠেছে। এ ছাড়াও নয়ানগর ইউনিয়নেই ১১টি ইটভাটা গড়েওঠেছে। বুরুঙ্গাতে কমিউনিটি ক্লিনিকের চার দিকে ঘিরে রেখেছে ৪টি ইটভাটা। একই ইউনিয়নের মেঘারবাড়িতে ২টি, বজরদ্দিপাড়ায় ৪টি এবং মালঞ্চ কাচারীপাড়ায় ১টিসহ ১১টি ইটভাটা গড়েওঠেছে।
এ ছাড়াও মহিরামকুলে পল্লীউন্নয়ন একাডেমীর পাশে ১টি, দেবেরছড়াতে ১টি, মাহমুদপুরে ১টি, চারাইলদারে ১টি, দুরমুঠ হাতিজায় ১টি, ভালুকা রোডের পাশে ১টি, ফুলকোচা ইউনিয়নে ১টিসহ সর্বমোট ২৫টি ইটভাটা গড়েওঠেছে। একই এলাকায় ফসলি জমি-বসতি-সদর রাস্তার পাশে-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান-হাসপাতাল-কমিউনিটি ক্লিনিকের পাশেই গড়ে ওঠেছে ইটভাটা। এ সব ইটভাটার দুষণে পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্থ এসব এলাকায় ফসলাদিসহ গাছের ফলনও বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। শ^াসকষ্ট জনিত রোগসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বিশেষ করে শিশুরা। ইটভাটার মালিকরা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কৃষককে ফাঁদে ফেলে আগে ফসলি জমির টপ সয়েল উজাড় করতো। এখন উচু জমিকে জলাশয়ে পরিণত করছে। একদিকে ইটভাটার মালিকরা প্রভাবশালী, অপরদিকে স্থানীয় প্রশাসনসহ পরিবেশ অধিদপ্তরের অসৎ কর্মকর্তাদের যোগসাজসে কৃষি ও পরিবেশের আইন লঙ্গন করে যত্রতত্র ইট পোড়ানো হচ্ছে। কোন কোন সময় প্রভাবশালীদের রাজনৈতিক চাপেও প্রশাসন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। কৃষিবিদ ও সচেতন মহল মনে করছেন, ইটভাটায় এভাবে মাটি সাবাড় হতে থাকলে আবাদযোগ্য ১০ শতাংশ জমিও থাকবে না। এতে পরিবেশ বিপর্যয় ও খাদ্য সংকটের আশংকা করা হচ্ছে।
নবাব ব্রিক্সের ২টি ইটভাটা ও এস এস এস ব্রিক্সের ২টি ইটভাটা এবং বুরঙ্গা গ্রামে বাদশা ব্রিক্সের ২টি ইটভাট ও কে এম এম ব্রিক্সের ২টি ইটভাটার বিষাক্ত ধোয়ায় পরিবেশ বিপর্যয়ে ইটভাটার প্রভাব পড়েছে বজরদ্দি পাড়া, নয়াপাড়া, উদনা পাড়া, বানি পাকুরিয়া, বুরঙ্গা, গাঙপাড়া, মালঞ্চ, ছেন্না, ফুলছেন্না, লক্ষিপুর, মামা ভাগিনা ও বেতমারী।
সরেজমিনে বজরদ্দিপাড়া, উদনা পাড়া ও বুরুঙ্গা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বসতি ও ফসলি জমিতে ইটভাটা স্থাপনের নিয়ম না থাকলেও নিয়মনীতির তোয়াক্কা করে ৮টি ইটভাটায় ফসলি জমির মাঝখানে স্থাপন করেছে ইটভাটার চারপাশ থেকে টপ সয়েল ছাড়াও মাটি কেটে জলাশয়ে পরিণত করে চলেছে। পাশাপাশি ইটভাটার কালো ধুয়ার প্রভাবে কমে গেছে ক্ষেতের ফসল। আম গাছে আম ধরছেনা। যৎসামান্য যাও ধরে ছোট থাকতেই বোটা পচেঁ পড়ে যায়। গাছে ধরা সুপারির ভিতর কালো দাগ হয়ে অজানা রোগে আক্রান্ত। আগের মতো গাছগুলোতে নারকেল ধরছেনা, যাও ধরছে নারিকেলে পানি থাকেনা বললেন বজরদ্দি পাড়া গ্রামের কৃষক বাবুল মন্ডল।
ইটভাটা স্থাপনের দুই গ্রামের মধ্যবর্তী গ্রামের নাম উদনা পাড়া। ১২টি গ্রামের মধ্যে এই গ্রামটি সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ। উদনা পাড়া গ্রামের ক্ষতিগ্রস্থ কৃষক আব্দুর রহিম(৫৫) বলেন আমার বাড়ী থেকে ৮টি ইটভাটায় খুব কাছাকাছি। বাড়ী ও ক্ষেতের জায়গা পড়ছে মাঝখানে। আগের চেয়ে ধান উৎপাদন কমে গেছে। অনেক নারিকেল গাছই খালি পড়ে আছে,নারিকেল ধরছেনা। দু’একটি গাছে যাও ধরছে, নারিকেল পারার পর দেখা যায় ভিতরে পানি নাই। ভাটার কালো ধুয়ায় আমরা চরম ক্ষতির মুখে পড়েছি। এই ক্ষতির কথা কাকে বলমো,বলার জায়গা নাই। উদনা পাড়ার সেলিনা বেগমসহ একাধিক কৃষকের সাথে কথা বলে একই অভিযোগ পাওয়া গেছে।
উদনা পাড়া ঢুকতেই চোখে পড়লো কৃষককে ফাঁদে ফেলে ফসলি জমির টপ সয়েল মাটি কেটে নেয়ার ভয়াবহ চিত্র। উদনা পাড়ার দুই পাশে বজরদ্দি পাড়া ও বুরুঙ্গা পাড়ায় স্থাপিত ইটভাটার মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে উদনা পাড়া থেকে। মাটি কাটার জন্য বসিয়েছে বৃহৎ কাটার মেশিন। দিনরাত কাটার মেশিন দিয়ে কাটছে ফসলি জমির টপ সয়েল মাটি। স্তুপকৃত মাটি সারিবদ্ধ ট্রাকটারে মাটি ভর্তি করে নিয়ে যাচ্ছে ইটভাটা গুলোতে।
কথা হয় উদনা গ্রামের ৪৯ বছর বয়সি কৃষক গুনু মিয়ার সাথে। তিনি বলেন ফসল উৎপাদন কম হবে জেনেও মাটি বিক্রি করা ছাড়া আমার উপায় ছিলনা। ফাঁদে পড়ে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছি। পাশের ক্ষেতের মালিক মাটি দেওয়ায় আমার ক্ষেতে পানি উঠেনা। ক্ষেত থেকে বোরো ধানের ক্ষেতের পানি নেমে যায়। ক্ষেতের আইল ভেঙ্গে সীমানা হেরফের হয়ে যায়। এখন আমার ক্ষেত বাচাঁতে টপসয়েল মাটি বিক্রি করেছি। প্রথম ফাঁদে পড়েন একই গ্রামের কৃষক জহুরুল হক(৪৬) তারপর একে একে ফাঁদে পড়ে ওয়াদুদ (৪৫) ও আব্দুল্লাহ (৬০)সহ অনেকেই। আব্দুল্লাহ(৬০) বলেন, ইটভাটা মালিক ১ হাজার সেপটি মাটির দাম দিয়েছে ১৫ হাজার টাকা। এই ধরে সকলেই বিক্রি করায় আমিও বিক্রি করেছি। এভাবেই ফাঁদে পড়ে মাটি বিক্রির অভিযোগ অন্যন্য গ্রামের জমির মালিকদেরও।
ইতোমধ্যেই যত্রতত্র বসতবাড়ি-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান-হাসপাতাল-সদর রাস্তার পাশে এবং কৃষি জমি বিনষ্ট করে ইটভাটা স্থাপনের বিষয়ে একজন ইটভাটার মালিককে শোকজ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ইনভাইরনমেন্ট ল-এসোসিয়েশন অব সুপ্রীম কোর্ট (বেলা)। ১০ অক্টোবর বেলার পক্ষে সুপ্রীম কোর্টের এডভোকেট সাঈদ আহমেদ কবির স্বাক্ষরিত শোকজ প্রেরণ করেন। ভূমি ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সচিব, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, জামালপুরের ডিসি-এসপি, ময়মনসিংহ বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক, মেলান্দহ উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউএনও, কৃষি অফিসার, সহকারি কমিশনার (ভূমি), অফিসার ইনচার্জ এবং ইটভাটার মালিক মোতালেব খানকে শোকজের জবাব চাওয়া হয়েছে।
এ ব্যপারে মেলান্দহ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তামিম আল ইয়ামীন জানান-বেলার প্রেরিত শোকজ প্রাপ্তির সত্যতা স্বীকার করে বলেন-২৩ মে/১৮ জেলা প্রশাসন ইটভাটার স্থাপনের বিষয়ে তদন্ত করেছেন। ১২ জুলাই একটি ইটভাটা বন্ধের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়াও ১৬ অক্টোবর মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে পল্লী উন্নয়ন একাডেমী এবং জালালপুর স্কুলের সংলগ্ন ইটভাটাসহ অভিযুক্ত মোতালেব খানের ইটভাটা নির্মাণের কার্যক্রম স্থগিত করতে বলা হয়েছে। বাকি ২০টি ইটভাটার স্থাপনের বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া হবে কি না? এমন প্রশ্নে ইউএনও সদুত্তর দেন নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*